‘বার্ধক্য কোনো ধ্বংসাত্মক ব্যাপার নয়’: যেভাবে বয়স নিয়ে ভুল ধারণা দূর করলে মিলতে পারে দীর্ঘায়ু
গবেষণায় দেখা গেছে, বয়সের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব মানুষকে মানসিকভাবে তরুণ অনুভব করতে এবং বেশিদিন বাঁচতে সাহায্য করে। নিজের জীবনে এই বয়স বৈষম্য বা 'এজিজম'-এর বিরুদ্ধে লড়ার কিছু উপায় রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বয়স বৈষম্য নিয়ে তাদের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলেছে, 'বয়স বৈষম্য আমাদের নিজেদের দেখার ভঙ্গিটাই বদলে দিতে পারে।' একটি সমতার বিশ্ব গড়তে হলে মানুষের বয়স নিয়ে আমাদের ক্ষতিকর চিন্তাভাবনা, অনুভূতি ও আচরণ পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি।
গবেষণা বলছে, বয়স নিয়ে কুসংস্কার ভাঙার স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও অনেক। এটি মানুষকে তরুণ অনুভব করতে এবং গড় আয়ু বাড়াতে সাহায্য করে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে আসছি।
বয়স বৈষম্যের শিকার যেকোনো বয়সী মানুষই হতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া 'জেন-জি' প্রজন্মকে প্রায়ই বয়স্করা 'অলস' বলে তকমা দেন। তবে এই বৈষম্য মূলত প্রবীণদের ওপরই বেশি প্রভাব ফেলে এবং গবেষণাও তাদের নিয়েই বেশি হয়েছে।
কানাডার ম্যাকমাস্টার ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ অন এজিং-এর বৈজ্ঞানিক পরিচালক পারমিন্দার রায়না বলেন, 'এই পুরো বিষয়টির মজার দিক হলো, যিনি আজ বয়স বৈষম্য করছেন, তিনিও কিন্তু একসময় বৃদ্ধ হবেন।' ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রতি ছয়জন প্রাপ্তবয়স্কের একজন হবেন ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী। রায়না বলেন, 'বয়স বৈষম্য খুব ব্যক্তিগত একটি সমস্যা। কিন্তু মানুষ একে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে স্বীকার করতে চায় না।'
শৈশব থেকেই আমরা বয়স নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পেতে শুরু করি। বাবা-মা, মিডিয়া বা স্মৃতির মাধ্যমে তিন বছর বয়স থেকেই এই ধারণা মনে গেঁথে যায়। তাই একজন গবেষক পরামর্শ দিয়েছেন, জীবনচক্র সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে এবং নিজেদের বার্ধক্যের জন্য প্রস্তুত করতে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের এ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া উচিত।
নিজের ভবিষ্যদ্বাণী নিজেই সত্যি করা
বয়স বৈষম্যের কারণে বয়স্করা নেতিবাচক ধারণাগুলোকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করে ফেলেন এবং নিজেকে গুটিয়ে নেন। যেমন, তারা মনে করতে পারেন নতুন কিছু শেখার বয়স তাদের আর নেই, অথচ তারা চাইলেই তা পারতেন। এতে তাদের আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস কমে যায়। একে 'স্টেরিওটাইপ এমবোডিমেন্ট থিওরি' বলা হয়, যেখানে কুসংস্কারগুলো অবচেতনভাবে গেঁথে যায় এবং দৈনন্দিন কাজ ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।
সহজ কথায়, এটি নিজের আশঙ্কাই সত্যি হওয়ার মতো ঘটনা।
গবেষণায় দেখা গেছে, 'স্টেরিওটাইপ থ্রেড' বা ভীতির কারণেও আত্মবিশ্বাস কমে যায়। যেমন, কোনো কাজ করার আগে যদি মানুষকে তাদের বয়সের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়, তবে তারা সেই কাজে খারাপ করে। ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের সামাজিক ও সাংগঠনিক মনোবিজ্ঞানের রিডার হান্না সুইফট বলেন, 'এর একটি ব্যাখ্যা হলো উদ্বেগ। কেউ যদি মনে করে তার চেয়ে কম বয়সী কারো সঙ্গে তাকে বিচার করা হবে, তখন এই কুসংস্কার থেকে তৈরি প্রত্যাশার চাপে সে নার্ভাস বা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।'
রায়না বলেন, 'সব বয়স্ক মানুষই দুর্বল বা ভঙ্গুর—এটি একটি ভুল ধারণা। এবং এটি সত্য থেকে যোজন যোজন দূরে... অধিকাংশ বয়স্ক মানুষ তাদের সমাজে স্বাধীনভাবে বসবাস করেন, কাজ করেন এবং স্বেচ্ছাসেবী বা অন্য কাজের মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখেন।'
অবশ্য তিনি যোগ করেন, কিছু বয়স্ক মানুষের জটিল শারীরিক সমস্যা থাকে। 'তাদের হয়তো বড় ধরনের স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ থাকে, কিন্তু সেই সংখ্যাটা সুস্থ ও সচলভাবে বার্ধক্য কাটানো মানুষের চেয়ে অনেক কম।'
মনে রাখা দরকার, বয়স নিয়ে অনেক নেতিবাচক ধারণাই সমাজের তৈরি। যেমন, কেউ যদি বলে 'পড়াশোনার জন্য অনেক বয়স হয়ে গেছে'—তবে কে ঠিক করে দেয় কোন বয়সটা বেশি?
আসলে, মানুষের নিজের বয়স সম্পর্কে ধারণা বনাম প্রকৃত বয়স নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বয়স নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব রাখেন, তারা নিজেদের তরুণ মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ১০ বছর ধরে চলা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিজেদের মানসিকভাবে বেশি বয়স্ক ভাবেন, তাদের জীবনের সন্তুষ্টি কম থাকে।
কোনো সীমা নেই
বয়স বৈষম্য এবং নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক ধারণা শারীরিক সক্ষমতা এবং জ্ঞানীয় বা কগনিটিভ ফাংশন কমিয়ে দিতে পারে। এটি বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মতো মানসিক সমস্যার লক্ষণ তৈরি করতে পারে। এমনকি সামাজিকভাবে মেলামেশা কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে একাকীত্ব বাড়ে।
রায়না বলেন, 'আমরা গবেষণায় বারবার দেখেছি যে বয়স্কদের শরীর ও পেশি প্রশিক্ষণযোগ্য। তাদের উন্নতি সম্ভব, তারা খুব সক্রিয় জীবনযাপন করতে পারেন। মানুষের সক্ষমতার আসলে কোনো সীমা নেই।'
যারা বার্ধক্যকে ইতিবাচকভাবে দেখেন, তারা এমনকি বেশিদিন বাঁচতেও পারেন।
কানেকটিকাটের ইয়েল স্কুল অব পাবলিক হেলথের এপিডেমিওলজি ও মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং 'ব্রেকিং দ্য এজ কোড' বইয়ের লেখক বেকা লেভি দেখেছেন, যারা বয়স নিয়ে ইতিবাচক বিশ্বাস রাখেন, তারা নেতিবাচক ধারণা পোষণকারীদের চেয়ে গড়ে সাড়ে সাত বছর বেশি বাঁচেন। লেভি বলেন, 'এটি একটি বিশাল সুবিধা এবং বিভিন্ন দেশে এই গবেষণার ফলাফলের প্রমাণ মিলেছে।'
লেভি আরও দেখেছেন, ইতিবাচক মনোভাব সম্পন্নদের স্মৃতিশক্তি ভালো থাকে। তাদের মস্তিষ্কে অ্যালঝেইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত বায়োমার্কারের মাত্রা কম থাকে। তিনি বলেন, 'তাদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশটি (যা স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত) সংকুচিত হওয়ার হারও কম থাকে।'
বয়স বৈষম্য আমাদের পরিচয়ের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুইফট বলেন, বয়সীরা তাদের নিজেদের জায়গা রক্ষা করতে চায়। যেমন, ধারণা করা হয় বয়স্কদের নাইটক্লাবে যাওয়া উচিত নয়। অথবা আমাদের পোশাকের কথাই ধরুন। সুইফট বলেন, 'বয়স অনুযায়ী কী পরা উচিত আর কী উচিত নয়, তা নিয়ে অলিখিত নিয়ম আছে। কোনো বয়স্ক ব্যক্তি সেই নিয়ম ভাঙলে তাকে ট্রল বা মৌখিক আক্রমণের শিকার হতে হয়।'
যুক্তরাজ্যের জ্যাসিন্থ বাসেট 'এজইজম ইজ নেভার ইন স্টাইল' নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা ব্র্যান্ড ও অলাভজনক সংস্থাগুলোকে বয়স বৈষম্য নিয়ে কাজ করতে সাহায্য করে। ২০২৩ সালে তার 'আই লুক মাই এজ' ক্যাম্পেইনটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ৪৫ মিলিয়নের বেশি ভিউ পেয়ে ভাইরাল হয়েছিল।
বাসেট বলেন, 'এর মূল উদ্দেশ্য কোম্পানিগুলোকে প্রশ্ন করা—বৈচিত্র্যময় প্রতিনিধিত্ব কোথায়? কেন আমরা ৫০-এর বেশি বয়সীদের একরঙাভাবে দেখছি?' তিনি বলেন, শুধু ধূসর চুলের মডেল ব্যবহার করলেই হবে না, কারণ ওটাও এখন একটা গৎবাঁধা ধারণা হয়ে গেছে।
'আমার মতে, এই আন্দোলন হওয়া উচিত সব বয়সের মানুষের অন্তর্ভুক্তির জন্য,' বলেন বাসেট। প্রায় ১০ বছর আগে কোম্পানি খোলার পর থেকে তিনি উন্নতি দেখছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু বয়স্ক নারী ইনফ্লুয়েন্সার ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ফ্যাশন ও বিউটি ইন্ডাস্ট্রিতে বয়স বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ছেন।
অবশ্য বার্ধক্য নিয়ে ইতিবাচক বার্তাও আছে। বিশ্বের অনেক সংস্কৃতিতে বয়স্কদের গভীর সম্মান জানানো হয়। কনফুসীয় মূল্যবোধে প্রভাবিত কিছু এশীয় সমাজে বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধা বা 'ফিলিয়াল পাইটি' এখনো মেনে চলা হয়। জাপানে প্রতি সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সোমবার 'রেসপেক্ট ফর দ্য এজড ডে' বা বয়স্কদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দিন পালন করা হয়, যা ১৯৬৬ সাল থেকে সরকারি ছুটির দিন। সেখানে ৬০তম জন্মদিন (জীবনচক্র পূর্ণ হওয়া), এবং ৭৭, ৮৮ ও ৯৯তম জন্মদিন ঘটা করে পালন করা হয়। নেটিভ আমেরিকান সমাজে বয়স্কদের 'জীবন্ত লাইব্রেরি', জ্ঞানের রক্ষক এবং গল্পকার বলা হয়। মৌখিকভাবে ঐতিহ্য ও প্রথা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বার্ধক্য একটি বিশেষ অধিকার বা প্রিভিলেজ। রায়না বলেন, 'আধুনিক যুগে আমরা সুস্থভাবে দীর্ঘদিন বাঁচার উপহার পেয়েছি, অথচ দুশ্চিন্তা করে আমরা তা নষ্ট করছি।'
বয়স বৈষম্য কাটানোর উপায়
সুইফট বলেন, সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই কুসংস্কারগুলো ভাঙতে হবে। যেমন আমাদের পারিবারিক জীবন এবং রোল মডেলদের মাধ্যমে। ২০১৬ সালের এক গবেষণায় ৮৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছিলেন, তাদের অন্তত একজন রোল মডেল আছেন যিনি সফলভাবে বার্ধক্য কাটাচ্ছেন। এদের বেশির ভাগই তাদের পরিবারের সদস্য, যেমন বাবা-মা বা দাদা-দাদি। দেখা গেছে, যাদের এমন রোল মডেল আছে, বার্ধক্য নিয়ে তাদের নেতিবাচক ধারণা কম।
সুইফট বলেন, বিভিন্ন বয়সের মানুষের কাছে আমাদের প্রত্যাশা এবং তাদের নিয়ে গড়ে ওঠা কুসংস্কারগুলো বদলাতে হবে। 'ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন।'
গবেষণায় দেখা গেছে, আন্তঃপ্রজন্ম বা বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের মেলামেশা বয়স বৈষম্য কমাতে দারুণ কার্যকর এবং এতে খরচও কম। বিশ্বের যেসব অঞ্চলে মানুষ ১০০ বছর পর্যন্ত বাঁচে (ব্লু জোন), সেখানে বহু-প্রজন্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে এবং তাদের সামাজিক যোগাযোগ খুব শক্তিশালী। এটি একাকীত্ব কমিয়ে আয়ু বাড়াতে সাহায্য করে।
রায়না বলেন, 'আমরা বলি একটি শিশুকে বড় করতে পুরো গ্রামের প্রয়োজন হয়... তাহলে একজন বয়স্ক মানুষকে ভালো রাখতেও যে পুরো গ্রামের (সমাজের) প্রয়োজন, সেটা কেন বলি না? আমাদের সমাজকে প্রবীণ ও নবীন—উভয় প্রজন্মের সেবায় কাজ করতে হবে।'
লেভি তার বইয়ে বয়স নিয়ে ইতিবাচক বিশ্বাস বাড়াতে 'এবিসি' পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন:
সচেতনতা (Awareness): বয়স নিয়ে আমাদের বিশ্বাসগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া। লেভি বলেন, 'সচেতনতা বাড়ানোর একটা উপায় হলো এক সপ্তাহ ধরে ডায়েরিতে লিখে রাখা—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বয়স নিয়ে আপনি কী কী ভাবছেন বা শুনছেন।'
দায় (Blame): সমস্যার জন্য বার্ধক্যকে দায়ী না করা। তিনি বলেন, 'আমাদের একটা প্রবণতা হলো সমস্যার জন্য বয়স বৈষম্যের বদলে বার্ধক্যকেই দোষারোপ করা।' উদাহরণস্বরূপ, 'যদি কোনো স্বাস্থ্যকর্মী বলেন যে ''আপনার বয়স বেশি হয়ে গেছে, তাই এই চিকিৎসায় কাজ হবে না'', তবে মনে রাখবেন—সমস্যাটা আপনার বয়সের নয়, সমস্যাটা ওই স্বাস্থ্যকর্মীর দৃষ্টিভঙ্গির (এজইজম)।'
চ্যালেঞ্জ (Challenge): কুসংস্কারগুলোকে প্রশ্ন করা। যেমন—সাধারণত ভাবা হয় বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি কমবেই। কিন্তু এক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্করা যদি নতুন কিছু শেখার (যেমন সেলাই বা ডিজিটাল ফটোগ্রাফি) মধ্যে থাকেন, তবে তাদের স্মৃতিশক্তি উন্নত হয়।
পরিশেষে, বয়স বৈষম্য এমন একটি কুসংস্কার যা জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রায় সবাইকেই স্পর্শ করতে পারে। বিজ্ঞান বলছে, এর বিরুদ্ধে লড়াই করলে আমাদের সবারই মঙ্গল হবে।
