দেহঘড়িকে বাধা দিতে নেই
ঘড়ির প্রতি আমাদের বিরক্তি আসাটা খুব স্বাভাবিক। এর অবিরাম টিকটিক শব্দ আমাদের ঘুম ভাঙায়, দেরি হলে অপরাধবোধে ভোগায়। ঘড়ি যেন প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়—জীবনের প্রতিটি আনন্দময় মুহূর্ত ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু পৃথিবীর সব সময় মাপার যন্ত্র ধ্বংস করে মাটির নিচে পুঁতে ফেললেও ঘড়ির হাত থেকে আমাদের নিস্তার নেই। কারণ আমাদের শরীরের ভেতরেই রয়েছে এক অবিরাম ঘড়ি। কারণ আমরা এবং আমাদের দেহঘড়ি আসলে একই সত্তা।
আমাদের শরীরের ভেতরে যে ২৪ ঘণ্টার একটি চক্র বা 'সার্কেডিয়ান রিদম' কাজ করে, তা বোঝার জন্য জটিল বিজ্ঞান পড়ার দরকার নেই। আমরা এমনিতেই জানি, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের খুব খিদে পায়, বিকেল হলে ক্লান্তি ভর করে, আবার ভোর ৪টা পর্যন্ত পার্টি করলে পরদিন টানা আট ঘণ্টা ঘুমিয়েও শরীর ঝরঝরে লাগে না। কারণ, আমাদের দেহঘড়ির কোনো হ্যাংওভার নেই।
আমরা দিনের ১৬-১৭ ঘণ্টা জেগে থাকি। জীববিজ্ঞানের ভাষায়, এই পুরো সময়টাতে আমাদের পরিবর্তন থামে না। সারে ইউনিভার্সিটির ক্রোনোবায়োলজির অধ্যাপক ডেব্রা স্কিন বলেন, 'প্রতি মিনিটে আমাদের শরীর বদলে যায়।' তিনি শুধু শারীরিক গঠন বা শক্তির মাত্রার কথা বলছেন না; বরং আমাদের আচরণ, মেজাজ এবং সতর্কতার কথাও বলছেন। তার মতে, দিনের প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের শরীরের ছন্দ কখনো ওপরের দিকে ওঠে, কখনো নিচে নামে। এটি একটি গতিশীল ব্যবস্থা।
আমাদের কেউ ভোরে উঠতে পছন্দ করেন (লার্ক), কেউ বা রাতজাগা পাখি (আউল)। এর কারণ আমাদের প্রত্যেকের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি আলাদা। একে বলা হয় 'ক্রোনোটাইপ', যা একটি স্বাভাবিক জিনগত বৈচিত্র্য। কারও ঘড়ি একটু দ্রুত চলে, কারও একটু ধীর। যদি কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকত, তবে কেউ সময়ের চেয়ে এগিয়ে যেত, কেউ পিছিয়ে পড়ত।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিনের আলো এবং অন্ধকারের চক্র আমাদের সবাইকে ২৪ ঘণ্টার একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে বেঁধে রাখে। আলো-অন্ধকারের এই চক্রই আমাদের দেহঘড়িকে পৃথিবীর সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সাহায্য করে। আর সে কারণেই রাতে অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এটি আমাদের সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করে, ঠিক যেমনটি পরিযায়ী পাখি বা কচ্ছপের ছানাদের ক্ষেত্রে ঘটে।
আলোর চক্র আমাদের সবাইকে ২৪ ঘণ্টার নিয়মে বেঁধে রাখলেও, ভিন্ন ভিন্ন ক্রোনোটাইপের কারণে কেউ আগে উঠতে পছন্দ করেন, কেউ পরে। গবেষকরা দেখেছেন, একজন রাতজাগা মানুষ যদি কঠোর নিয়ম মেনে খাওয়া ও ঘুমের সময় এগিয়ে এনে নিজের দেহঘড়িকে দুই ঘণ্টা আগে নিয়ে আসেন, তবুও সেই নিয়ম ভাঙলেই তিনি আবার তাঁর পুরোনো স্বভাবে ফিরে যান। কারণ তাঁর অভ্যন্তরীণ ঘড়ি তাঁকে সেদিকেই টানে।
সার্কেডিয়ান ঘড়ি মূলত আমাদের টিকে থাকার বা সার্ভাইভালের জন্য কাজ করে। এটি শুধু ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানায় না, বরং আগে থেকেই শরীরকে প্রস্তুত করে। এটি আপনার ঘুম ভাঙার জন্য অপেক্ষা করে না; বরং ঘুম ভাঙার এক-দুই ঘণ্টা আগে থেকেই শরীরকে জাগিয়ে তোলার প্রস্তুতি নেয়। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের মাস্টার ক্লক দ্বারা চালিত হয়ে আপনার কর্টিসল হরমোন বাড়তে শুরু করে। তাই যখন আপনি ঘুম থেকে ওঠেন, তখন এটি প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। আপনার এই কর্টিসল প্রয়োজন কারণ এটি গ্লুকোজ সরবরাহ করে এবং পৃথিবীকে মোকাবিলা করার সাহস জোগায়।
ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির বায়োলজিক্যাল টাইমিং সেন্টারের পরিচালক রবার্ট লুকাস বলেন, দিনজুড়ে আপনার আচরণের যেকোনো মৌলিক পরিবর্তনের জন্য শরীরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। ধরুন, দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে আপনার খুব খিদে পায়। এটি মস্তিষ্কের একটি পরিবর্তন, কিন্তু সেই খাবার হজম করার জন্য আপনার পরিপাকতন্ত্র এবং লিভারকেও আগে থেকে প্রস্তুত থাকতে হয়।
আপনার জৈবিক ঘড়িই এই সময়ের হিসাব রাখে এবং নিশ্চিত করে যে সবকিছু যথাসময়ে ঘটবে। যদি আপনি বারবার রুটিন বদলান, তবে এই সমন্বয় ভেঙে পড়ে এবং শরীরের পূর্বাভাসের ক্ষমতা ঠিকমতো কাজ করে না। ঘড়ির সময় বদলালে (ডে লাইট সেভিং) আমরা এটি কিছুটা অনুভব করি, তবে জেট ল্যাগের ক্ষেত্রে এটি তীব্র হয়। স্কিনের গবেষক দল দেখেছে, মাঝরাতে খাবার খেলে তা দুপুরের মতো হজম হয় না, ফলে রক্তে চর্বির (ট্রাইগ্লিসারাইড) মাত্রা বেড়ে যায়।
সতর্কতার বা অ্যালার্টনেসের বিষয়টিতেও একটি পুরো ব্যবস্থা কাজ করে। আমরা যত বেশিক্ষণ জেগে থাকি, এই সতর্কতা বজায় রাখা তত কঠিন হয়। ভালো ঘুমের পরও, বালুঘড়ির মতো কিছু একটা আপনার জেগে থাকার সময় গুনতে থাকে। সারা দিন ঘুমের চাপ বাড়তে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ দিন পার করার জন্য বিকেলের শেষ ভাগে বা সন্ধ্যার শুরুতে আমাদের শক্তি ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতায় একটি দ্বিতীয় জোয়ার আসে। এটি আমাদের ঘুমানোর আগ পর্যন্ত জেগে থাকতে সাহায্য করে।
আলো যদি আমাদের দেহঘড়ি নিয়ন্ত্রণ করে, তবে ঋতুভেদে দিনের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তনের প্রভাব কি আমাদের আচরণে পড়ে? হরিণ বা ভেড়ার মতো প্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা, গায়ের রং এবং ওজন ঋতুভেদে বদলায়। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এটি বোঝা কঠিন। কারণ আমরা কৃত্রিম আলো আর হিটারের মাধ্যমে নিজেদের এমন এক পরিবেশে রাখি যে শরীর বুঝতেই পারে না বাইরে শীত না গ্রীষ্ম। ফলে আমাদের ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনের ক্ষমতা থাকলেও আধুনিক জীবনযাত্রায় তা শনাক্ত করা কঠিন।
জীববিজ্ঞানীরা আমাদের শরীরকে যত গভীরভাবে বুঝছেন, আমাদের দেহঘড়ির জটিলতা সম্পর্কে তত নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে। যেমন, আমাদের অন্ত্রের জীবাণুদের নিজস্ব সার্কেডিয়ান রিদম আছে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষকদের মতে, আমাদের কোষের শক্তিঘর বা মাইটোকন্ড্রিয়ারও নিজস্ব ঘড়ি আছে।
২০১৯ সালে প্রকাশিত 'অ্যা ডে ইন দ্য লাইফ অব মাইটোকন্ড্রিয়া' গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, সকালবেলা এগুলো খুব সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইউসিএল-এর স্নায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক গ্লেন জেফারি বলেন, 'আমরা ঘুমিয়ে থাকলেও তারা জানে ভোর হচ্ছে।' তখন তারা শক্তি উৎপাদন শুরু করে। 'এটি সম্ভবত আমাদের বিবর্তনের ফল—আদিমকালে সকালে উঠেই মানুষকে সতর্ক থাকতে হতো, কারণ রাতে হয়তো কোনো বিপদ ওত পেতে ছিল।'
মাইটোকন্ড্রিয়া আমাদের শরীরের ব্যাটারির মতো। এরা সূর্যের আলো দিয়ে চার্জ হয়। সকালে আমাদের মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া খুব দ্রুত থাকে, কারণ তখন এটিপি নামের শক্তি উৎপাদিত হয়। কারণ প্রতিদিন আপনি আপনার শরীরের ওজনের সমপরিমাণ এটিপি তৈরি করেন। এটিপি ছাড়া আপনি কিছুই করতে পারবেন না।
দুপুরের পর মাইটোকন্ড্রিয়া ধীর হতে থাকে এবং সন্ধ্যায় অনেক কম সক্রিয় থাকে। এ কারণেই সন্ধ্যায় ব্যায়াম করলে পেশিতে বেশি ব্যথা হতে পারে। রাতে এটিপি কমে গেলে শরীর 'গ্লাইকোলাইসিস' নামের একটি অদক্ষ প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন করে। তিনি বলেন, 'গ্লাইকোলাইসিস হলো পুরোনো ফোর্ড গাড়ির মতো—এটি চলে ঠিকই, কিন্তু প্রচুর বর্জ্য উৎপাদন করে।' এই বর্জ্য হলো প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদান।
আমাদের দেহঘড়ির মতো মাইটোকন্ড্রিয়াও সূর্যের আলো দ্বারা চালিত হয়। এরা সবসময় আলোর দিকে নজর রাখে এবং একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পায়ের আঙুলের মাইটোকন্ড্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন হলে পরদিন সকালের মধ্যে পুরো শরীরের মাইটোকন্ড্রিয়া তা জেনে যায়।
আর্কটিকে কাজ করার সময় গবেষক দল লক্ষ্য করেছিলেন, সেখানে সারাদিন অন্ধকার থাকলেও তাদের সহকর্মীরা আগুন জ্বালাতে পছন্দ করতেন। আগুনের আলো সূর্যের আলোর মতোই তরঙ্গদৈর্ঘ্য তৈরি করে। আসলে মাইটোকন্ড্রিয়া হলো ব্যাটারির মতো। চার্জ কমে গেলে এরা কোষের মৃত্যুসংকেত দেয়। সূর্যালোক এই ব্যাটারি চার্জ করতে সাহায্য করে।
অধ্যাপক জেফারির গবেষণা বলছে, মেঘলা দিনেও সূর্যের আলো আমাদের শরীরের জন্য উপকারী। সূর্যের দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো আমাদের কোষের কার্যকারিতা বাড়ায়।
ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে রবার্ট লুকাসের একটি দল দিনের আলোর গুরুত্ব নিয়ে গবেষণা করছে। তিনি বলেন, 'সন্ধ্যা বা রাতে আলো ক্ষতিকর, এটা আমরা জানি। কিন্তু বৈদ্যুতিক আলোর কারণে আমরা এখন দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরের ভেতরেই থাকি, ফলে বিবর্তনের ইতিহাসে আমরা যে উজ্জ্বল দিনের আলো পেতাম, তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।' মানুষকে সন্ধ্যায় ফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখার চেয়ে দিনের বেলা বাইরে হাঁটতে বলাটা অনেক বেশি সহজ এবং কার্যকর হতে পারে।
সবার দেহঘড়ি এক নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রুটিন বদলাতেও পারে। যেমন, কিশোর বয়সে হয়তো আপনি দেরি করে উঠতেন, কিন্তু এখন ভোরেই ঘুম ভেঙে যায়। তবে মূল কথা হলো—আমাদের সবার শরীরেই একটি ছন্দ আছে। খিদে পাওয়া, ঘুম পাওয়া বা চনমনে লাগা—সবই সেই অদৃশ্য ঘড়ির কারসাজি। তাই শরীরের এই সংকেতগুলোকে উপেক্ষা না করে বরং সেগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র। দেহঘড়ির কাঁটায় অনর্থক বাধা না দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
