শরীরের ভেতরে সময়, শরীরের ভেতরে ঘড়ি!
'মন আমার দেহঘড়ি/ সন্ধান করি কোন মিস্ত্রি বানিয়েছে'—বাংলাদেশের আবদুর রহমান বয়াতির এই গানে দেহঘড়ির ধারণা যেন অজান্তেই ঢুকে পড়ে। বয়াতি ঘড়ির মিস্ত্রির খোঁজে নেমেছিলেন, কিন্তু দেহঘড়ি কীভাবে চলে, কীভাবে থামে বা কীভাবে তাল হারায়, সেই ব্যাখ্যায় যাননি বয়াতি। বা ব্যাখ্যার খোঁজও করেননি। তবুও তার এই দেহঘড়ির উপমা আমাদের এমন এক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যার উত্তর আমরা এত দিন খুঁজতেই শিখিনি।
ঘড়ি দেখলে সময় জানা যায়। মোবাইল খুললেও জানা যায়। সূর্যের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করা যায়, এখন সকাল না বিকাল। কিন্তু এসব বিদ্যার কোনোটাই খাটিয়ে বলা যাবে না যে শরীরের ভেতরে এখন ঠিক কয়টা বাজছে।
কোষের ভেতরের ঘড়িগুলো ঠিকঠাক চলছে, নাকি এলোমেলো হয়ে গেছে, এই প্রশ্নের উত্তর এত দিন বাইরে থেকে জানার কোনো উপায় ছিল না। আমরা জানতাম না, শরীর এখন ঘুম চায় না কাজ, বিশ্রাম না খাবার, আলো না অন্ধকার।
এই কারণেই একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা থেকে কয়েকটি চুল উপড়ে নেওয়া হলো শিকড়সহ। তারপর সেগুলো ঢুকিয়ে দেওয়া হলো এক ছোট্ট শিশিতে, বিশেষ রাসায়নিক তরলে ভেজানো। সেই শিশি পাড়ি দেবে দেশ-দেশান্তর, পৌঁছাবে জার্মানির এক গবেষণাগারে। সেখানে বিশ্লেষণ করে বলা হবে, আমার শরীরের ভেতরে এখন কতটা রাত, আর কতটা সকাল। বিষয়টা শুনতে অদ্ভুত লাগলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটা আর কৌতুক নয়। বরং বহুদিন ধরেই চিকিৎসায় একটা বড় ঘাটতি ছিল—শরীরের ভেতরের সময়কে না জানা। এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সময়টাই আমাদের স্বাস্থ্যের অনেক বড় নিয়ন্ত্রক।
গত কয়েক দশকে গবেষণা দেখিয়েছে, আমাদের মন-মেজাজ, হজমশক্তি, খেলাধুলার সক্ষমতা, এমনকি শেখার ক্ষমতাও দিনে এক রকম থাকে না। ২৪ ঘণ্টার ভেতরে এসব ওঠানামা করে। আর এই ওঠানামার পেছনে আছে শরীরের ভেতরের ঘড়ি, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান ছন্দ।
এই ছন্দ ঠিকঠাক না চললে সমস্যার শেষ নেই। টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হৃদ্রোগ, এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত—সবকিছুর সঙ্গেই শরীরঘড়ির গোলমালের যোগ মিলেছে। শুধু তা-ই নয়, কোন সময় ওষুধ খেলে কাজ বেশি করবে, কোন সময় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বাড়বে, সেটাও নির্ভর করে এই দেহঘড়ির ওপর।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে ব্যবহৃত অর্ধেকেরও বেশি ওষুধ শরীরের ভেতরের সময়ের প্রভাবে কাজ করে। অর্থাৎ একই ওষুধ সকালবেলা খেলে এক রকম ফল, রাতের বেলা খেলে আরেক রকম ফল দিতে পারে। এত দিন চিকিৎসায় এই বিষয়টা প্রায় উপেক্ষিতই ছিল।
সমস্যা একটাই, শরীরের ভেতরের সময় মাপার উপায় ছিল না সহজে। যে পদ্ধতিটা ছিল, সেটা ছিল ভীষণ ঝামেলার। অন্ধকার ঘরে বসিয়ে বারবার রক্ত বা লালা সংগ্রহ করে দেখা হতো কখন শরীর মেলাটোনিন নামের হরমোন ছাড়তে শুরু করে। এই হরমোনই শরীরকে রাতের জন্য প্রস্তুত করে। কিন্তু এই পরীক্ষা করতে দিনরাত লেগে যেত।
এই জটিলতার কারণে সার্কাডিয়ান চিকিৎসা এত দিন কাগজে-কলমেই বেশি ছিল, বাস্তবে কম। অথচ এখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। লালা, রক্ত, ত্বক—এমনকি চুলের কোষ ব্যবহার করেও শরীরের ভেতরের সময় বোঝার নতুন নতুন পরীক্ষা তৈরি হচ্ছে।
এই পরীক্ষাগুলো একদিন চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কখন ওষুধ খেলে সবচেয়ে ভালো কাজ করবে, কখন অস্ত্রোপচার নিরাপদ, কখন টিকা দিলে শরীর বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, এসব সিদ্ধান্ত আর আন্দাজে নয়, শরীরের সময় দেখে নেওয়া যাবে।
লিন্ডা গেডেস নামের বিজ্ঞান সাংবাদিক থাকেন ব্রিস্টলে। জীববিজ্ঞান চিকিৎসাবিজ্ঞান আর প্রযুক্তি—এই তিন জগতের জটিল গল্প তিনি সাধারণ পাঠকের ভাষায় তুলে ধরেন। নিউ সায়েন্টিস্ট পত্রিকায় প্রায় ৯ বছর কাজ করেছেন রিপোর্টার, খবরের সম্পাদক আর ফিচার সম্পাদক হিসেবে। পরে দ্য গার্ডিয়ানে সাড়ে তিন বছর বিজ্ঞান প্রতিবেদক ছিলেন কোভিড মহামারির সময়টাও যার মধ্যে পড়ে। এখনো তিনি নিয়মিত সেখানে লেখেন। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের পডকাস্ট প্যারেন্টল্যান্ডের সহ-উপস্থাপক ছিলেন এবং বিবিসি রেডিও ফোরের জন্য করেছেন একাধিক বিজ্ঞান তথ্যচিত্র। ব্রিটিশ বিজ্ঞান লেখক সমিতির সেরা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পুরস্কারও অর্জন করেছেন লিন্ডা। তিনি দুটি বইয়ের লেখক। একটি গর্ভাবস্থা নিয়ে প্রচলিত ভুল ভাঙার বই বাম্পোলজি আর অন্যটি সূর্যের আলো কীভাবে আমাদের শরীর আর মনকে গড়ে তোলে, সেই নতুন বিজ্ঞানের গল্প চেসিং দ্য সান। লিন্ডা গেডেসের হাউ টু হারনেস ইয়োর বডি ক্লক ফর আ লঙ্গার হেলদিয়ার লাইফ শিরোনামে শরীরের ভেতরের ঘড়ি নিয়ে নিউ সায়েন্টিস্টে প্রকাশিত এই লেখাটি পড়ে আমার মনে হলো, এখানকার কিছু বিষয় আমাদের দেশের পাঠকের জন্যও বলা যেতে পারে। এই লেখাটা বদলে যাওয়ার গল্প। শরীরের ভেতরের ঘড়ি কীভাবে চলে, কেন তা আমাদের অজান্তেই জীবন নিয়ন্ত্রণ করে, আর এখন বিজ্ঞানীরা কীভাবে সেই ঘড়ির কাঁটা আমাদের হাতে তুলে দিতে চাইছেন—এসব নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ধাপে ধাপে এগোব।
এবারে ঢুকব শরীরঘড়ির ভেতরে—কোষের ভেতরের সেই লাখ লাখ ছোট ঘড়ি কীভাবে একসঙ্গে টিকটিক করে, আর কেন একটার ছন্দ নষ্ট হলে পুরো শরীর এলোমেলো হয়ে যায়।
কোষের ভেতরের ঘড়ি
আমরা সাধারণত শরীরকে একটাই মনে করি। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, শরীর আসলে এক বিশাল শহর আর সেই শহরের প্রতিটি কোষের ভেতরে আছে আলাদা আলাদা ঘড়ি। শুধু একটি নয়, লক্ষ লক্ষ ঘড়ি। তারা সবাই নিজ নিজ ছন্দে টিকটিক করে চলে।
এই ঘড়িগুলোর কাজ হলো, কখন কোন কোষ কী করবে, তার সময় ঠিক রাখা। কখন শক্তি বানাবে, কখন বিশ্রামে যাবে, কখন নিজেকে মেরামত করবে—সবকিছুই নির্ভর করে এই ভেতরের সময়ের ওপর। এই ছন্দকেই বিজ্ঞানীরা বলেন সার্কাডিয়ান ছন্দ।
এ পর্যায়ে পাওয়া গেল আরও একজনকে, শিকাগোর নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রোজমেরি ব্রাউন, তিনিও এ বিষয় নিয়ে সহজ করে কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে জিনগুলোর কাজ দিনভেদে বদলায়। সকালবেলায় যেসব জিন সক্রিয়, দুপুরে তারা হয়তো চুপচাপ। আবার রাতে অন্য জিন জেগে ওঠে। এই ওঠানামা পুরোপুরি নির্ভর করে কোষের ভেতরের ঘড়ির ওপর।
এই শরীরঘড়ির চালিকাশক্তি আসে কিছু বিশেষ 'ঘড়ি-জিন' থেকে। এরা সারা দিন চুপচাপ বসে থাকে না। বরং ঠিক সময়মতো কাজ শুরু করে। দিনে একবার তারা নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিন তৈরি করে, যেন ঘড়ির কাঁটা ঘোরানোর জন্য শক্তি জোগাচ্ছে। সেই প্রোটিনগুলো কিছুক্ষণ কাজ করে, কোষকে জানিয়ে দেয়—এখন কোন সময় চলছে। তারপর সময় ফুরোলে, সেই প্রোটিনগুলো আর দরকার থাকে না। তখন কোষ নিজেই সেগুলো ভেঙে ফেলে, সরিয়ে দেয়। আবার নতুন করে বানানো হয় নতুন প্রোটিন। এই বানানো আর ভেঙে ফেলার ছন্দেই শরীর বুঝে নেয়, কখন জাগতে হবে, কখন ঘুমোতে হবে, কখন শক্তি বাড়বে, কখন ধীরে হতে হবে।
শরীরের ঘড়িরর প্রোটিনের ওঠানামায় তৈরি আর ভাঙার এই নীরব ছন্দেই সময় গোনা হয়। এই প্রোটিনের ওঠানামাই ঠিক করে দেয়, কোন জিন কখন কাজ করবে, আর কখন বিশ্রাম নেবে।
২০১৪ সালে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন হোগেনেশের নেতৃত্বে পরিচালিত এক বড় মাপের গবেষণায় দেখা যায়, পরীক্ষাগারে থাকা ইঁদুরের প্রায় ৪৩ শতাংশ জিন দিনের নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী কাজ করে। অর্থাৎ শরীরের প্রায় অর্ধেক জিন সময় মেনে চলে। এখানেই আসে চিকিৎসার বড় প্রশ্ন। যদি শরীরের জিনগুলো সময় দেখে কাজ করে, তাহলে ওষুধ কি সময় না দেখে খাওয়া উচিত? উত্তরটা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
গবেষকেরা দেখেছেন, আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ১০০টি ওষুধের মধ্যে ৫৬টি এমন প্রোটিনকে লক্ষ্য করে বানানো, যাদের রোগ সারানোর কার্যকারিতা দিনভর এক রকম থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে, কমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি ওষুধের তালিকাতেও প্রায় একই ছবি দেখা যায়। তার মানে ওষুধ ঠিক সময়ে না খেলে সেটার রোগ সারানোর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। উল্টা দেখা দিতে পারে বেশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় এক নতুন ধারণা, ক্রোনোথেরাপি। শরীরের নিজস্ব সময়ছন্দ, অর্থাৎ দেহঘড়ির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওষুধ, থেরাপি বা চিকিৎসা দেওয়াকে ক্রোনোথেরাপি বা সময়চিকিৎসা বলা হয়।
এই ধারণার পথিকৃৎদের একজন ফ্রান্সের প্যারিস-স্যাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফ্রাঁসিস লেভি। তার আগ্রহের শুরু হয়েছিল প্রাচীন চীনা চিকিৎসাবিদ্যা থেকে, যেখানে বলা হয়, দিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে শরীরের ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ সবচেয়ে সক্রিয় থাকে।
লেভি এই ধারণাকে ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রয়োগ করার কথা ভাবেন। তার যুক্তি ছিল সহজ কিন্তু সাহসী। সুস্থ কোষ সাধারণত দিনের নির্দিষ্ট সময়ে বিভাজিত হয়। কিন্তু ক্যানসার কোষের কোনো সময়জ্ঞান নেই। এই কু-কোষগুলো সারাক্ষণই বাড়তে থাকে। তাহলে যদি কেমোথেরাপির ওষুধ এমন সময়ে দেওয়া হয়, যখন সুস্থ কোষ 'ঘুমিয়ে', তখন কি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে?
প্রথমে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা। ফল আশাব্যঞ্জক। তারপর মানুষের ওপর ছোট পরিসরে পরীক্ষা চলল। ১৯৯০ সালে ডিম্বাশয়ের জটিল ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের ওপর চালানো হলো গবেষণা। দেখা গেল, সকাল ছয়টায় কেমোথেরাপি দিলে বমি, ক্লান্তির মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সন্ধ্যার ছয়টার তুলনায় অনেক কম হয়। এরপর বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে, বিভিন্ন ওষুধ নিয়ে একে একে আরও পরীক্ষা হয়েছে। ২০২২ সালে প্রকাশিত ১৮টি গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সময় মেনে চিকিৎসা দিলে বিষক্রিয়া কমেছে, কিন্তু ওষুধের কার্যকারিতা কমেনি।
এই ধারণা শুধু ক্যানসারে আটকে নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচার বিকেলের দিকে করলে শরীর ভালোভাবে ধকল সামলাতে পারে। আবার ফ্লু টিকা সকাল নয়টা থেকে এগারোটার মধ্যে দিলে শরীর চার গুণ বেশি অ্যান্টিবডি তৈরি করে। ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রবার্ট ডালম্যান বলেন, সময় শুধু ওষুধের লক্ষ্যবস্তু বদলায় না, ওষুধ শরীরে ঢোকে কীভাবে, বের হয় কীভাবে, সেটাও সময়ের ওপর নির্ভর করে।
তবে এখানেই এক বড় সমস্যা ধরা পড়ে। সব মানুষের শরীরঘড়ি এক রকম নয়। কারও ঘড়ি এগিয়ে, কারও পিছিয়ে। এই পার্থক্য কখনো কখনো ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ সকাল আটটা একজনের জন্য সকাল, আরেকজনের জন্য প্রায় রাত।
লেভি নিজেই বলেন, এত দিন চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে গড় মানুষের সময় ধরে। কিন্তু বাস্তবে কেউ গড় মানুষ নয়। এখানেই প্রশ্ন ওঠে, যদি প্রত্যেকের ভেতরের সময় আলাদা হয়, তাহলে চিকিৎসাও কি আলাদা হওয়া উচিত নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা এখন শরীরঘড়ি মাপার দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু সেটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। কারণ, মানুষের নিজের ভেতরের সময় জানার সহজ উপায় এত দিন ছিল না।
এবারে দেখব, এত দিন শরীরের ভেতরের সময় কীভাবে মাপা হতো, কেন সেটা এত ঝামেলার ছিল, আর নতুন প্রযুক্তি কীভাবে সেই জটিলতা এড়াতে শুরু করেছে।
শরীরের ভেতরের সময় জানার ঝামেলা
এত কিছু জানার পর স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে, যদি শরীরের ভেতরের ঘড়ি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে এত দিন আমরা সেটা মাপিনি কেন? উত্তরটা খুব সোজা নয়, আবার খুব জটিলও নয়। কারণ, শরীরের ভেতরের সময় জানার উপায়টা ছিল ভয়ানক ঝামেলার।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা যে পদ্ধতিকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করেছেন, তার নাম 'ডিম-লাইট মেলাটোনিন অনসেট'। সহজ করে বললে, শরীর ঠিক কখন রাতে ঢুকছে, সেটা ধরার চেষ্টা। শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে মেলাটোনিন নামের এক হরমোন। সাধারণত মানুষ ঘুমোতে যাওয়ার দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে এই হরমোন নিঃসরণ শুরু হয়।
এই নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের এক ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নাম, সুপ্রাকিয়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াস। এটাই শরীরের কেন্দ্রীয় ঘড়ি। এর কাজ হলো, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে থাকা লক্ষ লক্ষ ছোট ঘড়িকে একসঙ্গে মিলিয়ে রাখা। আর বাইরের দিন-রাতের সময়ের সঙ্গে তাদের তাল মেলানো।
মেলাটোনিন নিঃসরণ শুরু হওয়ার মুহূর্তটা ধরা মানে যেন শরীরের ভেতরের ঘড়িতে বারোটার ঘণ্টা বাজার শব্দ শোনা। সমস্যাটা হলো, এই শব্দ শোনা খুব সহজ নয়।
এই পরীক্ষা করতে হলে বিকেল থেকে শুরু করে প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর রক্ত বা লালার নমুনা নিতে হয়। তা-ও আবার অন্ধকার ঘরে বসিয়ে। কারণ, আলো পড়লেই মেলাটোনিনের নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায়। মানে পরীক্ষার সময় মানুষকে প্রায় রাতভর অন্ধকার ঘরে বন্দী থাকতে হয়।
তারপর সেই নমুনা পাঠাতে হয় পরীক্ষাগারে। ফল পেতে লেগে যায় কয়েক দিন, কখনো কয়েক সপ্তাহ। সাধারণ রোগী তো দূরের কথা, গবেষণার বাইরে এই পরীক্ষা ব্যবহার করাই প্রায় অসম্ভব ছিল।
এই জটিলতার কারণে সার্কাডিয়ান চিকিৎসা অনেকটাই গবেষণাপত্রে আটকে ছিল। বাস্তব চিকিৎসায় তার প্রয়োগ সীমিত ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা হাল ছাড়েননি। তারা ভাবলেন, যদি শরীরের ভেতরের সময় কোষের জিন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে কি শরীরের তরল বা কোষে এমন কিছু চিহ্ন পাওয়া যায় না, যেগুলো দেখে সময় আন্দাজ করা যাবে? এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় নতুন অনুসন্ধান—জৈবচিহ্ন খোঁজা।
জার্মানির হামবুর্গের এমএসএইচ মেডিকেল স্কুলের গবেষক আঞ্জেলা রেলোজিও এই দলের অন্যতম। তিনি এমন একটি পরীক্ষার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যেখানে শুধু লালা দিয়েই শরীরের ভেতরের সময় বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার মতে, শরীরের সময় মাপতে পারা মানেই চিকিৎসাকে ব্যক্তি উপযোগী করা।
অন্যদিকে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন হোগেনেশের দল ত্বকের কোষ নিয়ে কাজ করছেন। আবার ইংল্যান্ডের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডার্ক-ইয়ান ডাইক এবং আমেরিকার উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিস্টোফার ডেপনার রক্তভিত্তিক পরীক্ষার উন্নয়ন করছেন।
এখনো এসব পরীক্ষা পুরোপুরি সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছায়নি। তবে একটি পদ্ধতি ইতিমধ্যেই বাজারে এসেছে, জার্মানির এক প্রতিষ্ঠানের চুলভিত্তিক পরীক্ষা।
এই পরীক্ষায় মাথা থেকে কয়েকটি চুল উপড়ে নেওয়া হয় শিকড়সহ। কারণ, চুলের গোড়ার কোষে তখনকার জিনের কার্যকলাপের ছাপ থাকে। ওই কোষে কোন ঘড়ি-জিন কতটা সক্রিয়, সেটা বিশ্লেষণ করে একটি অ্যালগরিদম হিসাব করে—শরীরের ভেতরের ঘড়ি গড় মানুষের তুলনায় কতটা এগিয়ে বা পিছিয়ে।
এই পরীক্ষার ফল খুবই স্পষ্ট। কেউ লার্ক—ভোরের মানুষ। কেউ আবার আউল—রাতজাগা দলের। আবার কেউ মাঝামাঝি অবস্থানে, যাদের বলা হয় ডাভ বা কবুতর। শুধু ঘুম নয়, কখন খাওয়া ভালো আর কখন ব্যায়াম করলে শরীর সবচেয়ে ভালো সাড়া দেয়, এসব কিছুরই পরামর্শ মেলে এই হিসাব থেকে। এই ফলাফল শুনে অনেকেরই মনে হতে পারে, এ তো জানা কথা। কিন্তু পার্থক্যটা এখানেই, এবার অনুমান নয়, শরীরের তথ্য দিয়ে বলা হচ্ছে।
তবে এই প্রযুক্তিরও সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ, শরীরের ঘড়ি পাথরে খোদাই করা নয়। আলো, ঘুম, কাজের সময়—এসব বদলালে ঘড়িও এগোয়-পেছায়। আজ যে ফল পাওয়া গেল, পাঁচ সপ্তাহ পর সেটা বদলে যেতে পারে।
এই সীমাবদ্ধতাই বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। যদি ফল দেরিতে আসে, তাহলে কি তা সব পরিস্থিতিতে কাজে লাগবে? বিশেষ করে শিফটকর্মী বা নিয়মিত ভ্রমণকারীদের জন্য তা কতটা কার্যকর?
চিকিৎসা, কাজ আর আধুনিক জীবনের সঙ্গে শরীরঘড়ির সংঘাত
শরীরের ভেতরের সময় জানা শুধু কৌতূহলের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চিকিৎসা আরও কার্যকর উপায়ে কীভাবে দেওয়া যাবে, সেই বড় প্রশ্নও। এই কারণেই জৈবচিহ্নভিত্তিক পরীক্ষাগুলো নিয়ে চিকিৎসকদের এত আগ্রহ। কারণ, এগুলো শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের ছবি দেখায় না, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার ফলই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
ফ্রান্সের প্যারিস-স্যাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফ্রাঁসিস লেভি আবার ফিরে আসেন এই জায়গায়। তিনি এখন নতুন করে একটি বড়সড় পরীক্ষা শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে ফুসফুসের একধরনের ক্যানসারে ভুগছেন এমন প্রায় আড়াই'শ মানুষ অংশ নেবেন। সবাই একই সময় চিকিৎসা পাবেন না। কেউ পাবেন সকালে, কেউ বিকেলে। কিন্তু একটি ছোট দলের ক্ষেত্রে চিকিৎসার সময় ঠিক করা হবে তাদের শরীরঘড়ির তৎপরতা মাপজোখ করে।
লেভির আগের গবেষণায় দেখা গেছে, সকাল সাড়ে এগারোটার আগে চিকিৎসা দেওয়া হলে রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ হয়। তার বিশ্বাস, যদি এই সময়টা প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা আলাদা করে ঠিক করা যায়, তাহলে ফল আরও ভালো হতে পারে।
এই পরীক্ষাগুলো শুধু ক্যানসারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্য ক্ষেত্রেও সময়ের ভূমিকার কথা উঠেছে। হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচারে, টিকা দেওয়ার সময় নির্ধারণে, এমনকি সাধারণ ওষুধের ক্ষেত্রেও সময় বদলের সাথে সাথে ফলও বদলে যাচ্ছে।
কিন্তু শরীরঘড়ির বিষয়টা শুধু হাসপাতালেই আটকে নেই। আধুনিক জীবনের বড় একটা সমস্যা হলো—আমরা নিজের শরীরের সময়কে নিয়মিত অগ্রাহ্য করি। রাত জাগি, ভোরে উঠি না, কৃত্রিম আলোয় ডুবে থাকি, কখন খাচ্ছি তার ঠিক নেই। এর ফলেই শরীরের ঘড়িগুলো একে অন্যের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। তালগোল পাকিয়ে যায়।
এই অবস্থাকে বিজ্ঞানীরা বলেন 'সার্কাডিয়ান মিসঅ্যালাইনমেন্ট'। অর্থাৎ শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গের ঘড়ি একে অন্যের সঙ্গে মিলছে না। মস্তিষ্ক একসময় ধরে চলছে, কিন্তু অন্ত্র আরেক সময় ধরে। যকৃত বা লিভার এক রকম সংকেত পাচ্ছে, পেশি আরেক রকম।
আমেরিকার উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্রিস্টোফার ডেপনার বলেন, আধুনিক সমাজের বহু রোগের পেছনে এই তালছুট বা দেহঘড়ির মধ্যে অমিলের ভূমিকা খুব শক্তিশালী। মানসিক অসুস্থতা, স্নায়ুরোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হৃদ্রোগ—সবখানেই শরীরঘড়ির গোলমালের ছাপ পাওয়া যাচ্ছে।
এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় শিফটকর্মীদের মধ্যে। যারা রাতে কাজ করেন, দিনে ঘুমান, আবার হঠাৎ সময় বদলান, তাদের শরীরের ঘড়ি নিয়মিত ধাক্কা খায়। কিন্তু তাদের দেহঘড়ি ঠিক কোথায় যাচ্ছে, এত দিন সেটা বোঝার কোনো বাস্তব উপায় ছিল না।
জৈবচিহ্নভিত্তিক পরীক্ষাগুলো এই জায়গায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যদি শিফটকর্মীদের শরীরঘড়ি নিয়মিত মাপা যায়, তাহলে বোঝা যাবে—কখন তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, কখন হস্তক্ষেপ দরকার। আলো, খাবার, বিশ্রামের সময় সামান্য বদলেই হয়তো বড় ক্ষতি এড়ানো যাবে।
তবে এখানেও সীমাবদ্ধতা আছে। এখনকার পরীক্ষাগুলো তাৎক্ষণিক ফল দেয় না। নমুনা পাঠাতে হয় পরীক্ষাগারে। ফল পেতে সময় লাগে। অথচ শরীরঘড়ি খুব দ্রুত বদলাতে পারে—এক রাত খারাপ ঘুম, এক সপ্তাহ রাতের কাজ, একবার দীর্ঘ ভ্রমণেই। দেহঘড়ির সময় বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
ডার্ক-ইয়ান ডাইক, যিনি ইংল্যান্ডের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন, এক পরীক্ষায় দেখিয়েছেন, শুধু সন্ধ্যার পর কৃত্রিম আলো কমিয়ে আর দিনে প্রাকৃতিক আলো বাড়িয়েই শরীরঘড়ি দুই ঘণ্টা এগিয়ে আনা সম্ভব। অর্থাৎ আজকের ফল কাল আর সত্য না-ও হতে পারে।
এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিজ্ঞানীরা হাল ছাড়ছেন না। তাদের মতে, এখনকার পরীক্ষাগুলো প্রথম ধাপ মাত্র। এগুলো দেখাচ্ছে, শরীরের ভেতরের সময় পড়া সম্ভব। সামনে আরও উন্নত, দ্রুত পরীক্ষার পথ খুলে যাবে।
আলো, খাবার আর অভ্যাস—ঘড়ির কাঁটা ঘোরানোর উপায়
শরীরঘড়ি যে বদলানো যায়, এতক্ষণে সেটা পরিষ্কার। এবারে প্রশ্ন, কী দিয়ে বদলানো যায়? আশ্চর্যের বিষয়, এর জন্য খুব জটিল কিছু দরকার হয় না। আলো, খাবার আর সময়—এই তিনটিই শরীরের ভেতরের ঘড়ির সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক।
মস্তিষ্কের গভীরে একটি ছোট্ট অংশ আছে, যাকে বলা হয় সুপ্রাকিয়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াস। এটাই শরীরের প্রধান ঘড়ি। এর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আছে চোখের ভেতরের বিশেষ কিছু আলোক সংবেদনশীল কোষের। আলো পড়লেই তারা সংকেত পাঠায়—এখন দিন, এখন রাত।
এই কোষগুলো বিশেষভাবে সাড়া দেয় নীলচে আলোতে। দিনের আলোতে এই নীল তরঙ্গ বেশি থাকে। তাই সকালে রোদে বেরোলে শরীর ঘড়িকে বলে দেয়—দিন শুরু হয়েছে। আবার সন্ধ্যা আর রাতে যদি কৃত্রিম আলোয় ডুবে থাকি, বিশেষ করে মোবাইল বা স্ক্রিনের আলোয়, শরীর বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সে ভাবে, দিন এখনো শেষ হয়নি।
এই কারণেই রাতের আলো শরীরের ঘড়িকে পিছিয়ে দেয়। মানুষের ঘুম আসে দেরিতে, সকালে ঘুম ভাঙেও দেরিতে। উল্টো দিকে ভোরের আলো ঘড়িকে এগিয়ে আনে। যারা সকালে রোদে বেরোয়, তাদের সাধারণত তাড়াতাড়ি ঘুম পায়।
মেলাটোনিনও আসলে এই শরীরঘড়ির নিয়মেই কাজ করে। এটা শরীরের নিজের বানানো ঘুমের হরমোন, দেহের ভেতরের প্রাকৃতিক ঘুমের ওষুধ। ঠিক সময়ে নিলে দেহঘড়ি ঠিকঠাক চলে। কিন্তু সময় ভুল হলে উল্টা ফলও হতে পারে। ঘড়ি এগিয়ে যায় বা পিছিয়ে পড়ে। তাই ঘুম আর জেগে থাকার সময় ঠিক করতে মেলাটোনিন কাজে লাগতে পারে ঠিকই, কিন্তু সেটা তখনই, যখন সময়টা একদম ঠিক ধরা যাবে। নইলে উপকারের বদলে শরীরঘড়ি আরও এলোমেলো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
খাবারও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা এত দিন ভাবতাম—কী খাচ্ছি সেটাই আসল। কিন্তু এখন গবেষণা বলছে, কখন খাচ্ছি, সেটাও প্রায় সমান গুরুত্বের। বিশেষ করে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটের ক্ষেত্রে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের প্রথম ভাগে শরীর ইনসুলিনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল থাকে। মানে সকালে বা দুপুরে চিনিকে সহজে শরীর শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে। রাতে সেই ক্ষমতা কমে যায়। রাতে ভারী খাবার খেলে রক্তে চিনি বেশি সময় ধরে থাকে। শরীরের এ অবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে ডায়াবেটিস আর বিপাকজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
এ কারণেই বিজ্ঞানীরা খাবারদাবারের বিষয়ে পুরোনো প্রবাদটার দিকে আবার তাকাচ্ছেন, 'সকালে রাজা, দুপুরে রাজপুত্র, রাতে ভিখারি।' কথাটা রসিকতা নয়। শরীরঘড়ির সঙ্গেই মিলে যায়।
শুধু ওজন নয়, শরীরের ভেতরের ছন্দও খাবারের সময় ঠিক করে। দেরিতে খাওয়া মানে লিভার আর অন্ত্রের ঘড়িকে রাতের কাজ করতে বাধ্য করা। এতে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের সময়ের মধ্যে ফারাক বাড়ে।
এই গরমিলটা যদি দিনের পর দিন চলতে থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে নানা অসুখের দরজা খুলে যায়। তাই এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু খাবার বা ঘুম নয়, আলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কখন খাচ্ছি, কখন ঘুমাচ্ছি, আর কখন চোখে আলো পড়ছে—এই তিনটাকেই শরীরের ঘড়ির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। সকালে দিনের আলো দরকার, আর রাতে অযথা উজ্জ্বল আলো নয়। এই হিসাবটা না মিললে শরীরঘড়িও এলোমেলো হয়ে যায়।
তবে এখানেও সাবধানতার জায়গা আছে। শরীরঘড়ি খুব নমনীয়, আবার খুব সংবেদনশীলও। হঠাৎ বড় পরিবর্তন করলে সে ধাক্কা খায়। তাই ধীরে ধীরে বদল করাই সবচেয়ে ভালো।
এই সব কথার ভেতরে একটা বিষয় স্পষ্ট—শরীরঘড়ি কোনো রহস্যময় বস্তু নয়। সে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসেই তৈরি হয়, আবার এই অভ্যাসের গুণেই বদলায়।
সময়কে বুঝে নেওয়ার নতুন যুগ
এতক্ষণে একটা কথা পরিষ্কার—শরীরের ভেতরের সময় কোনো কল্পনার বিষয় নয়। এটা একেবারে বাস্তব, মাপা যায়, আর ঠিকভাবে ধরতে পারলে জীবনে বড় বদল আনতে পারে। এত দিন আমরা সময় দেখেছি বাইরে থেকে—ঘড়ি, ক্যালেন্ডার আর অ্যালার্মের হিসাব ধরে। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু বাইরের সময় মানলেই চলবে না। শরীর কখন কী চাইছে, কখন জাগতে চায়, কখন বিশ্রাম দরকার—এই ভেতরের সময়টাকেও বুঝতে হবে। সুস্থ থাকার চাবিকাঠি অনেকটাই লুকিয়ে আছে সেখানেই।
এই বদলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে। এত দিন রোগীকে দেখা হয়েছে গড় মানুষ হিসেবে। গড় বয়স, গড় ওজন, গড় উপসর্গ। কিন্তু শরীরঘড়ির গবেষণা বলছে, গড় মানুষ বলে আসলে কেউ নেই। একজনের সকাল আরেকজনের রাত। একজনের জন্য যে সময় ওষুধে কাজ করে, অন্যজনের জন্য সেই সময়টাই একই রোগের একই ওষুধ ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এই কারণেই ভবিষ্যতের চিকিৎসা ধীরে ধীরে ব্যক্তি-উপযোগী হওয়ার পথে এগোচ্ছে। কখন ওষুধ দেওয়া হবে, কখন অস্ত্রোপচার করা হবে, কখন টিকা দেওয়া সবচেয়ে ভালো—এসব সিদ্ধান্ত একদিন নেওয়া হবে শরীরের ভেতরের সময় দেখে। আন্দাজ নয়, অভ্যাস নয়, বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে।
এই পরিবর্তনের সুফল শুধু হাসপাতালে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কাজের সময়, স্কুলের সময়, শিফট ডিউটি—সবখানেই শরীরঘড়ির হিসাব ঢুকে পড়তে পারে। রাতজাগা মানুষকে জোর করে ভোরে কাজে বসানো যে শরীরের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বোঝা, এই কথাটা বিজ্ঞান এখন স্পষ্ট করে বলছে।
শিফটকর্মীদের কথাই ধরুন। যদি জানা যায়, কার শরীর কত দ্রুত নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেয়, তাহলে ডিউটির সময় একটু এদিক-ওদিক করেই বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। আলো, খাবার, বিশ্রাম—সবকিছু একটু বুদ্ধি করে সাজালে শরীরকে এতটা ভাঙনের মুখোমুখি হতে হয় না।
ভ্রমণকারীদের ক্ষেত্রেও একই কথা। জেটল্যাগ এত দিন ছিল মেনে নেওয়ার বিষয়। ভবিষ্যতে হয়তো ভ্রমণের পরই শরীরঘড়ি মেপে বলে দেওয়া যাবে—কখন আলো নেবে, কখন বিশ্রাম নেবে এবং কখন মেলাটোনিন নিলে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া যাবে।
তবে বিজ্ঞানীরা নিজেরাও জানেন, এখনকার প্রযুক্তি এই গল্পের প্রথম অধ্যায়মাত্র। বর্তমান পরীক্ষাগুলো সময় নেয়, ফল দেরিতে দেয়। এর মধ্যে শরীরঘড়ি বদলে যেতে পারে। তাই সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, দ্রুত, তাৎক্ষণিক, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা তৈরি করা।
আরও বড় স্বপ্ন আছে। শুধু পুরো শরীর নয়, একদিন হয়তো আলাদা করে জানা যাবে, লিভারের সময় কতটা ঠিক আছে, অন্ত্রের ঘড়ি কতটা পিছিয়েছে, পেশির ছন্দ কেমন চলছে। কারণ, শরীরের সব অঙ্গ একসঙ্গে মানিয়ে না চললে সমস্যা বাড়েই।
এই গবেষণার ভেতর দিয়ে একটা পুরোনো সত্য নতুন করে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সুস্থ জীবন মানে শুধু ভালো ওষুধ নয়, ভালো অভ্যাসও। সময় মেনে ঘুম, সময় মেনে খাওয়া, আলোকে বন্ধু বানানো। এই আপাত-সাধারণ কথাগুলোর পেছনে যে গভীর জীববিজ্ঞান কাজ করে, সেটা এখন আর উপদেশ নয়, পরিমাপযোগ্য বাস্তবতা।
এই পুরো যাত্রার শুরু হয়েছিল একগুচ্ছ চুল দিয়ে—কয়েকটি কোষ, কিছু জিনের ভেতর লুকোনো সংকেত। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে সামনে এসেছে এক অদৃশ্য সময়, যে সময় বাইরে ঝোলানো ঘড়ির কাঁটার মতো টিকটিক করে না, কিন্তু নিঃশব্দে আমাদের জীবন চালিয়ে নেয়। সেই ভেতরের সময়ই বলে দেয়, আমরা নিজের শরীরের সঙ্গে কতটা তাল মিলিয়ে চলছি, আর প্রতিদিন কতটা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি।
শেষ পর্যন্ত কথাটা খুবই সোজা। সময় আমাদের শত্রু নয়। শত্রু হলো সময়কে না বোঝা। আমরা এত দিন সময়কে দেখেছি বাইরে থেকে ঘড়ি, ক্যালেন্ডার, অ্যালার্মের চোখে। কিন্তু এখন বিজ্ঞান বলছে, সময়কে বুঝতে হবে ভেতর থেকে। কারণ, শরীরের এই ভেতরের সময়ছন্দই আমাদের মন-মেজাজ, বিপাকক্রিয়া, এমনকি চিকিৎসায় শরীর কতটা সাড়া দেবে, সবকিছু ঠিক করে দেয়। ভালো খবর হলো, এখন প্রথমবারের মতো এমন হাতিয়ার আমাদের হাতে আসছে, যার সাহায্যে এই ছন্দকে চেনা যায়, কাজে লাগানো যায়।
তাই হয়তো বয়াতির প্রশ্নটা আজ নতুন করে ফিরে আসে, দেহঘড়ি কে বানিয়েছে? উত্তরটা আর কোনো অচেনা মিস্ত্রির কাছে নেই। উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের শরীরের ভেতরেই। সেই ঘড়ির সঙ্গে যদি আমরা সামান্য হলেও তাল মেলাতে শিখি, তাহলে হয়তো শুধু জীবনটা দীর্ঘ হবে না—জীবনটা হবে আরও সহজ, আরও মানানসই, আরও মানুষের মতো।
