১২ দিনে জ্বালানি নিয়ে এসেছে ১৬টি জাহাজ, আরও তিনটি আসছে
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যানুসারে, মার্চের প্রথম ১২ দিনে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানিপণ্য নিয়ে ১৬টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরও তিনটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে যখন বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, সেই মুহূর্তে এসব জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্বের তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের একটি বড় অংশ সম্পন্ন হয়।
মার্চের প্রথম ১০ দিনে তিনটি এলএনজিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ১ লাখ ৮০ হাজার টনেরও বেশি জ্বালানি খালাস করেছে।
শুরুতে আসা চালানে এলএনজির প্রাধান্য
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, এই সময়ে আসা জ্বালানি চালানের একটি বড় অংশ ছিল এলএনজি।
৩ থেকে ১০ মার্চের মধ্যে কাতার থেকে আসা তিনটি এলএনজিবাহী জাহাজ—আল জুর, আল জাসাসিয়া ও লুসাইল—ইতিমধ্যে তাদের মালামাল খালাস শেষ করেছে।
জাহাজগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধি ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের তথ্যমতে, প্রতিটি জাহাজ প্রায় ৬২ হাজার টন এলএনজি নিয়ে এসেছে।
গত ১২ মার্চ আল গালায়েল নামক আরেকটি জাহাজ ২৬ হাজার ১৬৫ টন এলএনজি নিয়ে বন্দরে পৌঁছায়। বর্তমানে জাহাজটি থেকে ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে (এফএসআরইউ) জ্বালানি খালাস করা হচ্ছে। ১৪ মার্চের মধ্যে খালাসের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এলপিজিবাহী জাহাজের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি
আলোচ্য সময়ে বন্দরে আসা জাহাজের সংখ্যার দিক থেকে এলপিজিবাহী জাহাজই ছিল সবচেয়ে বেশি।
মালয়েশিয়া থেকে আসা মর্নিং জেন ও ওমান থেকে আসা জিওয়াই এমএম ইতিমধ্যে মোট ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজি খালাস সম্পন্ন করেছে।
আরও কয়েকটি এলপিজিবাহী জাহাজ থেকে এখন কার্গো খালাস করা হচ্ছে। ৮ মার্চ ওমান থেকে আসা এলপিজি সেভান ৭ হাজার ৫০০ টন এলপিজি খালাস করছে, যা ৩০ মার্চের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে, সেনা ৯ জাহাজটি ১ হাজার ৪০০ টন এলপিজি নিয়ে এসেছে; ১২ মার্চের মধ্যে এর খালাসের কাজ শেষ হওয়ার কথা।
এছাড়া মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে আসা আরও দুটি এলপিজি ট্যাঙ্কার— এপিক সান্টার ও শুমি ৭— যথাক্রমে ১ হাজার ৫০০ টন ও ১ হাজার টন এলপিজি নিয়ে এসেছে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে এসব জাহাজের খালাস প্রক্রিয়া শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিশোধিত জ্বালানি ও শিল্পকারখানার কাঁচামাল
এলএনজি ও এলপিজি ছাড়াও বেশ কিছু জাহাজ পরিশোধিত জ্বালানিপণ্য ও শিল্পকারখানার প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিয়ে এসেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা ট্যাঙ্কার বে ইয়াসু নিয়ে এসেছে মনোইথিলিন গ্লাইকল (এমইজি)। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর থেকে আসা এল্যান্ড্রা স্প্রুস ও হাফনিয়া ববক্যাট বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প বয়লারে ব্যবহৃত উচ্চ মাত্রার সালফারযুক্ত ফার্নেস অয়েল খালাস করেছে।
সিঙ্গাপুর থেকে আসা গ্যাস অয়েল ট্যাঙ্কার শিউ চি ও লিয়ান হুয়ান হু এবং মালয়েশিয়া থেকে আসা এসপিটি থেমিস ডিজেল-জাতীয় জ্বালানি নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) সূত্রমতে, এসব জাহাজ সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি বহন করে এনেছে।
পাশাপাশি ভারত থেকে আসা তেলবাহী জাহাজ অ্যাঞ্জেল ১১ লুব্রিকেন্ট উৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল বেজ অয়েল নিয়ে এসেছে প্রায় ৪ হাজার টন।
আরও জাহাজ আসছে
বন্দর কর্মকর্তারা জানান, আরও তিনটি জ্বালানিবাহী জাহাজ এখন চট্টগ্রামের পথে রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে কাতার থেকে আসা এলএনজিবাহী জাহাজ লেব্রেথা, অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা প্রাচী এবং সিঙ্গাপুর থেকে আসা গ্যাস অয়েল ট্যাঙ্কার র্যাফেলস সামুরা। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই তিনটি জাহাজই ১৪ মার্চের মধ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর কড়া নজর
মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়ছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ও বিমা খরচের ওপর। এ অবস্থায় জ্বালানি আমদানির গতিপ্রকৃতির ওপর কড়া নজর রাখছে নৌ-কর্তৃপক্ষ।
ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ রুট দিয়ে বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সম্পন্ন হয়।
স্থানীয় জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ উপসাগরীয় দেশ ও এশীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আসা এলএনজি, এলপিজি, অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে ওই অঞ্চলে সংঘাত বৃদ্ধি বা নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে দেশে আসার অপেক্ষায় থাকা জ্বালানি জাহাজের শিডিউল ও পরিবহন খরচে প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় গত আট দিন ধরে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে একটি জাহাজ সৌদি আরবের এক বন্দরে আটকে আছে।
তবে বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি মাসে এখন পর্যন্ত জাহাজ চলাচল অনেকটা স্বাভাবিক রয়েছে। নিয়মিত জাহাজ আসার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালিতে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করছেন তারা।
