জ্বালানি সরবরাহে উন্নতি হলেও পাম্পে লম্বা লাইন কমানোর মতো বাড়েনি
ঈদযাত্রাকে ঘিরে মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সরকার পরিশোধিত জ্বালানি বিক্রিতে রেশনিং ব্যবস্থা প্রত্যাহার করলেও দেশজুড়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ এখনও স্বাভাবিক হয়নি। অব্যাহত ঘাটতি ও লম্বা লাইনের জেরে এখনও ভোগান্তিতে পড়ছেন গাড়িচালক, পরিবহন অপারেটর ও পাম্প মালিকেরা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এই রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। তবে রোববার (১৫ মার্চ) সরকার জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রির ওপর থেকে যাবতীয় বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে।
তবে ভোক্তারা বলছেন, বাস্তব চিত্র খুব একটা বদলায়নি। এখনও অনেক পাম্পে ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় অনেক কম জ্বালানি পৌঁছাচ্ছে। ফলে পাম্পগুলো জ্বালানি বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক জায়গায় আবার পাম্প খোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জ্বালানি ফুরিয়ে যাচ্ছে।
পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. নাজমুল হক রোববার বলেন, ডিপো থেকে পাম্পগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ এখনও যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় পৌঁছায়নি।
টিবিএসকে তিনি বলেন, 'গ্রাহক পর্যায়ে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হলেও পেট্রোল পাম্পগুলোতে এখনও চাহিদার তুলনায় কম জ্বালানি আসছে।'
রাজধানীর একাধিক পাম্প ঘুরে দেখা যায়, জ্বালানির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে সারি সারি মোটরবাইক ও ব্যক্তিগত গাড়ি। এক থেকে দু-ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষার পরেও সামান্য পরিমাণ জ্বালানি মিলছে বলে অভিযোগ করেন অনেক গ্রাহক।
বেসরকারি খাতের কর্মজীবী সোহেল মাহমুদ বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও বাইকের ট্যাঙ্ক ভর্তি করতে পারেননি তিনি। 'আমার প্রায় ১০ লিটার অকটেনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়ানোর পর আমাকে দেওয়া হয়েছে মাত্র তিন লিটার।'
ঢাকা ও বগুড়া মিলিয়ে মোট ছয়টি পাম্প চালান পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সেক্রেটারি মিজানুর রহমান রতন। তিনি বলেন, পাম্প মালিকদের চাহিদার প্রায় অর্ধেক জ্বালানি সরবরাহ করছে ডিপোগুলো।
মিজানুর আরও বলেন, 'আমি ১৩ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেলের চাহিদা দিয়েছিলাম। কিন্তু পেয়েছি মাত্র ৯ হাজার ৫০০ লিটার। অকটেন ও পেট্রোলের সরবরাহও উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।'
জেলায় জেলায় ঘাটতি
রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হলেও বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি সরবরাহ এখনও অনিয়মিত।
ডিপো থেকে পর্যাপ্ত জোগান না থাকায় খুলনার অনেক পাম্পেই স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি বিক্রি করা যাচ্ছে না।
বিশ্বাস ফিলিং স্টেশনের একজন কর্মী বলেন, পাম্পের দৈনন্দিন চাহিদার তুলনায় ডিপো থেকে অনেক কম জ্বালানি আসছে। 'রেশনিং উঠে গেলেও সরবরাহ সীমিত থাকায় আমরা বেশি জ্বালানি দিতে পারছি না। বাইকচালকদের এখনও সর্বোচ্চ ২৫০ টাকারই জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে,' বলেন তিনি।
বগুড়ার চারমাথা ও তিনমাথা এলাকার পাম্পগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, জ্বালানির জন্য অপেক্ষায় রয়েছে ট্রাক ও বাসের লম্বা লাইন। পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে বেশ কয়েকটি পাম্প আবার বন্ধই রয়েছে।
পাবনা থেকে বগুড়ার সোনাতলায় ট্রাকে করে দুধ নিয়ে যাচ্ছিলেন চালক সোহেল। তিনি জানান, পর্যাপ্ত জ্বালানি জোগাড় করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে চালকদের।
সোহেলের বলেন, 'ডিজেল মিললেও ৫০ লিটারের বদলে আমাদের দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২০ লিটারের মতো।'
রাজশাহীর একাধিক পাম্পেও সকাল থেকে বাইক ও ব্যক্তিগত গাড়ির লম্বা লাইন চোখে পড়েছে।
আফরিন পেট্রল পাম্পের ম্যানেজার সোলায়মান কবির জানান, গ্রাহকদের এখন সর্বোচ্চ ৩০০ টাকার জ্বালানি কিনতে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'চাহিদা কয়েকগুণ বাড়লেও সরবরাহ সেই অনুপাতে বাড়েনি। ডিজেল ও অকটেন ইতিমধ্যেই ফুরিয়ে গেছে।' বাঘাবাড়ি ডিপো থেকে ট্যাঙ্কার এসে পৌঁছালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে জানান সোহেল।
জ্বালানির ঘাটতিতে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালিতেও পরিবহন পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। অনেক পাম্পেই খুব সামান্য পরিমাণে জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে। ফলে চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। দেখা গেছে, বাইকচালকেরা ১০০ থেকে ২০০ টাকার জ্বালানি পাচ্ছেন। আর ট্রাক ও বাসগুলোকে দেওয়া হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকার জ্বালানি।
ছোট ট্রাকের চালক আবদুস সালাম জানান, এই সংকটের জেরে তার কাজে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
'আগে দিনে তিন থেকে চার ট্রাক ইট পরিবহন করতাম। আর এখন একটা ট্রিপ সম্পূর্ণ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে,' বলেন তিনি।
