ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্বে ঢাবি-র একক আধিপত্য, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাদের আক্ষেপ
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক (ঢাবি) নেতৃত্বের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। গত চার থেকে পাঁচটি কমিটিতে সংগঠনের প্রথম সারির পদে—বিশেষ করে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো ধারাবাহিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দখলে রয়েছে।
এর ফলে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় ও অভিজ্ঞ নেতারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসার সুযোগ থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত হচ্ছেন।
রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাসির উদ্দীন নাসিরের নেতৃত্বাধীন ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হয়েছে। ফলে দলের হাইকমান্ড এখন নতুন কমিটি গঠনের কথা ভাবছে। তৃণমূলের নেতারা চাইছেন, সিলেকশন নয়, কাউন্সিলেই নির্ধারণ হোক ছাত্রসংগঠনটির নেতৃত্ব।
ঈদুল ফিতরের পর নতুন কমিটির ঘোষণা আসতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। ইতিমধ্যে নতুন কমিটির শীর্ষ পদে আসতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন সংগঠনটির পদপ্রত্যাশী নেতারা।
বর্তমান কমিটির শীর্ষ ৫ পদে থাকা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এছাড়াও এ কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সহ-সভাপতিদের মধ্যে প্রথম ১২ জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। কমিটিতে ঢাবির বাইরে সবচেয়ে বড় পদে রয়েছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের তৌহিদুর রহমান আউয়াল; তিনি ১৩ নং সহসভাপতি।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই রকম; তালিকার প্রথম ১৩ জনই ঢাবির শিক্ষার্থী। ১৪ নাম্বার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে স্থান পেয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার হক শিমুল মজুমদার। ছাত্রদলের সর্বশেষ তিন কমিটির শীর্ষ পাঁচ পদে ঢাবির বাইরের কারোর স্থান হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ছাত্রদল নেতা বলেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা মাঠে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সময় তাদের মূল্যায়ন হয় না। শীর্ষ পদগুলোতে তাদের জায়গা নেই। এতে অনেকেই হতাশা ও আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমূল টিবিএসকে বলেন, 'দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্বাধীনতা সংগ্রাম সবকিছুর সাথেই ঢাবির সম্পৃক্ততা আছে। সেক্ষেত্রে ঢাবিকে বিশেষ বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এই বিশেষ বিবেচনার জন্য বাকি সবাইকে উপেক্ষা করা হলে বিষয়টা আসলে আর ইনসাফের পর্যায়ে থাকে না। ছাত্রদলের ১১৮টি ইউনিট রয়েছে। নেতৃত্বের সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরিতে শীর্ষ পাঁচ পদের মধ্যে অন্তত দুই-তিনটা পদ ঢাবির বাইরে থেকে রাখা উচিত। এটা আমাদের ন্যায়সংগত দাবি।'
ছাত্রদলের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবু হোরায়রা বলেন, 'ছাত্রদলের নেতৃত্বে তাদেরকেই রাখা উচিত, যারা তাদের দক্ষতা প্রমাণ করতে পেরেছেন, নেতৃত্বের গুণ ফুটিয়ে তুলতে পারছেন; দক্ষ সংগঠক, যারা দলের দুর্দিনে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিবেচনা করা উচিত না।'
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি জাতীয় ছাত্রসংগঠনের শক্তি বাড়াতে হলে দেশের সব বড় ক্যাম্পাস থেকে নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো গেলে সংগঠন আরো বিস্তৃত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথও আরও উন্মুক্ত হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বর্তমানে শীর্ষ পদের আলোচনায় আছেন তৌহিদুর রহমান আউয়াল (শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ), কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত (জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়), শাহরিয়ার হক শিমুল (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়) ও এম রাজিবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দু (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়)।
এই নেতারা আন্দোলন, বিক্ষোভ ও তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গোছাতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন এবং প্রায়ই রাজনৈতিক দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শাহরিয়ার হক শিমুল ও কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেতের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
ঐতিহাসিকভাবেই ছাত্রদল বিএনপির জাতীয় পর্যায়ের নেতা তৈরির অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে আসছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন সাবেক নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও রাজীব আহসান। এছাড়া আছেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সহসভাপতি ফরহাদ হোসেন আজাদ।
