সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন উদ্যোগ: লাইসেন্স পেতে চালকদের ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক
কমিটির মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের বর্তমান পদ্ধতিকে পৃথিবীর উদ্ভট নিয়ম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
তিনি বলেন, 'এ ব্যবস্থার পরিবর্তন করে নতুন বিধিমালার আওতায় চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ চালু করা হচ্ছে।'
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ঢাকার তেজগাঁওস্থ বিআরটিসি'র প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্বমূলক প্রকল্প (৩য় সংশোধিত)-এর আওতায় পেশাজীবী পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের দক্ষতা এবং শব্দদূষণ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানিকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় গ্লানি হিসেবে উল্লেখ করে সড়ক উপদেষ্টা বলেন, 'দেশে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবছর বেড়েই চলেছে, অথচ তা কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না।'
এই স্থবিরতার কারণ হিসেবে তিনি প্রশাসনিক জটিলতাকে দায়ী করে বলেন, 'এর প্রধান বাধা আমলাতন্ত্র, যা জনগণের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে এবং মানবিক দায়িত্ববোধহীনভাবে জনস্বার্থকে উপেক্ষা করছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।'
লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, 'কমিটির মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের বর্তমান পদ্ধতি পৃথিবীর সবচেয়ে উদ্ভট নিয়মগুলোর একটি। এ ব্যবস্থার পরিবর্তন করে নতুন বিধিমালার আওতায় চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ চালু করা হচ্ছে। এই প্রশিক্ষণে গাড়ি চালানোর দক্ষতা, শারীরিক সক্ষমতা, দৃষ্টিশক্তি ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য চালকদের লাইসেন্স দেওয়া হবে।'
উপদেষ্টা আরও জানান, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের জীবন রক্ষা করা, সড়কে মৃত্যুর হার কমানো, বিশৃঙ্খলা দূর করা এবং শব্দ ও বায়ু দূষণ কমিয়ে ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করা। এসময় সরকারি কর্মচারীদের জনগণের সেবক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বৃহত্তর জনস্বার্থে এই উদ্যোগ সফল করতে সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, 'আজকের আয়োজনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশের ৫৪ বছরের বাস্তবতায় আমরা কার্যকরভাবে খুব কম কাজই করেছি। এই বাস্তবতার ঊর্ধ্বে উঠে প্রথমবারের মতো একটি বাস্তবভিত্তিক অংশীদারিত্বমূলক উদ্যোগ শুরু হয়েছে, যা সফল হবে তখনই যখন চালকরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারবেন।'
অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহারের কুফল তুলে ধরে তিনি বলেন, 'হর্ন ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় চালকদের। শব্দদূষণ বিধিমালার আওতায় পুলিশকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে ট্রাফিক সার্জেন্টরা রাস্তায় থেকে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে জরিমানাও করতে পারবেন।'
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, 'লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বা শুধু জরিমানা করে মানুষের আচরণ পরিবর্তন সম্ভব নয়। মানুষের কল্যাণে এই উদ্যোগ—এই বোধ চালকদের অন্তরে ধারণ করতে হবে।'
বায়ু দূষণ প্রসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'বর্তমানে বায়ু দূষণে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে বিআরটিসির অনেক বাস থেকে কালো ধোঁয়া বের হওয়া অগ্রহণযোগ্য।' আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন দ্রুত বন্ধ করতে বিআরটিএ ও বিআরটিসির প্রতি তিনি বিশেষ অনুরোধ জানান।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়) শেখ মইনউদ্দিন বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, 'একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবহন খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে এই খাতটি দীর্ঘদিন ধরেই বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। বর্তমান সরকার এ খাতকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।'
তিনি প্রশিক্ষণের বিশদ তুলে ধরে বলেন, '৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণে চালকদের কখন হর্ন ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে সঠিকভাবে লেন পরিবর্তন করতে হবে, ট্রাফিক সংকেত সংক্রান্ত নিয়মকানুন—এসব বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হবে। আমি আশা করছি ভবিষ্যতে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান থাকবে যা সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে এবং শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।'
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ। বিআরটিএ-এর চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমিতির নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
