কিশোরদের কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনায় ডাকসু সদস্য সর্বমিত্রের পদত্যাগের ঘোষণা, চাইলেন ‘ক্ষমা’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে 'খেলতে আসা' প্রায় ৩০ জন কিশোর-তরুণকে কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনায় দায় স্বীকার করে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য সর্বমিত্র চাকমা। একই সঙ্গে এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ-২' গ্রুপে নিজের আইডি থেকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই ঘোষণা দেন। এর প্রায় ৩০ মিনিট আগে নিজের ব্যক্তিগত আইডিতে দেওয়া আরেকটি পোস্টে তিনি ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও সেখানে পদত্যাগের কথা উল্লেখ করেননি।
এ বিষয়ে জানতে সর্বমিত্র চাকমার সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ডাকসুর আরেক কার্যনির্বাহী সদস্য মেফতাহুল হোসাইন আল মারুফ দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'আমরা (ডাকসু) আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো পদত্যাগের বিষয় জানি না। তবে কয়েকজনের ফেসবুক পোস্টে এ সংক্রান্ত পোস্ট দেখেছি।'
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সর্বমিত্রের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় প্রায় ৩০ জন কিশোর–তরুণ সারিতে দাঁড়িয়ে কান ধরে উঠবস করছেন। তাদের সামনে একটি লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন সর্বমিত্র চাকমা।
ভিডিওটি প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক পোস্ট করেন সূর্যসেন হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব আবিদুর রহমান মিশু। ভিডিওটি গত ৬ জানুয়ারি বিকাল ৪ টা ৪৪ মিনিটের বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)- নিশ্চিত করেন তিনি।
পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে ফেসবুক পোস্টে সর্বমিত্র লিখেছেন, 'প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে আমি বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকানোর উদ্দেশ্যে তাদের কান ধরে উঠবস করাতে বাধ্য হই। এটি কোনোভাবেই আমার প্রত্যাশিত বা কাম্য আচরণ ছিল না। আমি স্বীকার করছি—এভাবে কাউকে শাস্তি দেওয়া আমার উচিত হয়নি এবং এই ঘটনার জন্য আমি নিঃশর্তভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।'
পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে তিনি লেখেন, 'একই সাথে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য পদ হতে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ সিদ্ধান্ত আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, কারো প্রতি ক্ষুব্ধ বা অভিমানবশত নয়। আমি মনে করি, শিক্ষার্থীরা যে প্রত্যাশা নিয়ে আমাকে প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিয়েছেন, আমি সে প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হইনি। প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে, আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'
ঘটনার ব্যাখ্যায় ফেসবুকে সর্বমিত্র উল্লেখ করেন, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের মাঠটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য। দীর্ঘদিন ধরে বহিরাগতদের অবাধ অনুপ্রবেশ একটি গুরুতর নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিয়েছে। বহিরাগত ব্যক্তিদের দ্বারা প্রায় নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্তার ঘটনা ঘটে, মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও সাইকেল চুরির মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও নিরাপদ পরিবেশকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।'
প্রশাসনের সমালোচনা করে তিনি আরও লেখেন, 'এই পরিস্থিতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা বারবার প্রশাসনকে অবগত করলেও এখনো পর্যন্ত কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়নি, নিরাপত্তা জোরদার করা হয়নি, এমনকি বহিরাগতদের প্রবেশ রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়নি। প্রশাসনের এই দীর্ঘস্থায়ী নীরবতা ও অসহযোগিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।'
বহিরাগতদের আচরণের বিষয়ে তিনি বলেন, 'বহিরাগতরা নিয়মিতভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বিপরীত পাশের দেয়াল টপকে প্রবেশ করে। তাদের একাধিকবার নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা তা অগ্রাহ্য করেছে। নিষেধ করতে গেলে তারা উল্টো স্টাফদের লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়ে পালিয়ে যায়—যা একটি চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে। এমন বাস্তবতায় শিক্ষার্থীরা বারবার অভিযোগ জানালেও কার্যকর সমাধান না আসায় ক্ষোভ ও আতঙ্ক ক্রমেই বাড়তে থাকে।'
