কোয়ান্টানাইট: ঢাকার যে ‘ব্যাক অফিস’ বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল সেবার নেপথ্যে
তরুণ কুমার রায় সবেমাত্র যোগ দিয়েছেন কোয়ান্টানাইটে। মার্কিন এক ক্লায়েন্টের সঙ্গে আগে থেকেই নির্ধারিত একটি সভা ছিল তার। সে অনুযায়ী কনফারেন্স রুমটিও বুক করে রেখেছিলেন তিনি। যথাসময়ে সেখানে পৌঁছে দেখলেন, পরিপাটি পোশাকের এক বিদেশি ভদ্রলোক ল্যাপটপে খুব মন দিয়ে কাজ করছেন।
তরুণ ভাবলেন, তিনি কি তবে ভুল সময়ে চলে এলেন? তিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে ভদ্রলোককে জানালেন যে রুমটি তার প্রয়োজন। ভদ্রলোক তৎক্ষণাৎ দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং কোনো দ্বিধা ছাড়াই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
সেই বিনয়ী মানুষটি ছিলেন কোয়ান্টানাইটের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মিক্কো তাম্মিনেন। তিনি ফিনল্যান্ডের নাগরিক। মিক্কোর এই নম্রতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তরুণ। নিজের জরুরি কাজ থাকা সত্ত্বেও যেভাবে তিনি একজন কর্মীর জন্য ঘর ছেড়ে দিলেন, তা সাধারণত সচরাচর দেখা যায় না। কোয়ান্টানাইটের কর্মীরা বলেন, মিক্কোর এই শিষ্টাচার ও বিনয়ই আজ প্রতিষ্ঠানটির মজ্জাগত সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক মিক্কো ২০১৪ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন নতুন কোনো ব্যবসা শুরুর স্বপ্ন নিয়ে। শুরুতে তিনি একটি ফুড ডেলিভারি অ্যাপ তৈরির কথা ভেবেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন বিপিও (বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং) খাতকে। কারণ, এ দেশে এই খাতের অপার সম্ভাবনা তিনি আগেভাগেই টের পেয়েছিলেন। কন্টেন্ট মডারেশন বা ব্যাক অফিস অপারেশনের জন্য বাংলাদেশে রয়েছে বিশাল এক শিক্ষিত জনবল, যা বিপিও শিল্পের জন্য অপরিহার্য।
'সৃজনশীলতার উর্বর ভূমি বাংলাদেশ'
কোয়ান্টানাইটের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বাংলাদেশকে 'সৃজনশীলতা এবং অবারিত মেধার উর্বর ভূমি' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানকার প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মীই স্নাতক সম্পন্ন করা, যা জটিল সব অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের যোগ্য করে তুলেছে।
কোয়ান্টানাইটের ডিরেক্টর অব পিপল অপারেশনস নাফিজ আলম বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, 'বিপিও খাতে ভারত, ফিলিপাইন বা থাইল্যান্ড আমাদের চেয়ে এগিয়ে থাকার মূল কারণ হলো তারা অনেক আগে কাজ শুরু করেছে। কিন্তু আমাদের শক্তি হলো—আমাদের প্রচুর স্নাতক ডিগ্রিধারী কর্মী রয়েছেন এবং এখানকার শ্রম মজুরিও তুলনামূলক সাশ্রয়ী। মিক্কো সম্ভবত শুরুতেই এই সম্ভাবনাটা বুঝতে পেরেছিলেন।'
ডিজিটাল অর্থনীতির চাকা নেপথ্যে থেকে কীভাবে বিপিও সেবা সচল রাখে, তার একটি উদাহরণ দিলেন নাফিজ। তিনি বলেন, 'ধরা যাক একটি রেস্তোরাঁর ওয়েবসাইটের কথা। সেখানে মেনু আপলোড করা, দাম পরিবর্তন বা প্রমোশনাল অফার সাজানোর মতো কাজগুলো বিপিও কর্মীরাই করে থাকেন। পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রেও রঙ, মাপ, কাপড়ের ধরন বা পরিমাপ অনুযায়ী অনলাইন ডেটা নিয়মিত আপডেট করতে হয়। এসব কাজের জন্য স্থায়ী ইন-হাউস টিম রাখা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্যই ব্যয়বহুল, কারণ কাজের চাপ সব সময় এক থাকে না। তাই আউটসোর্সিং অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর।'
১৪০০ কর্মীর এক কর্মস্থল
কোয়ান্টানাইটের শুরুর দিকের কর্মীদের একজন ইমতিয়াজ আহমেদ অনিল। তিনি যখন যোগ দেন, তখন তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির নবম কর্মী। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা অফিসেই কাজ করেন ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ।
সহযোগী বা 'অ্যাসোসিয়েট' হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা অনিল এখন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ফ্যাসিলিটিজ বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার। তার প্রথম প্রজেক্টটি ছিল লিথুয়ানিয়ার এক গেম ডেভেলপারের হয়ে। সেটি ছিল মিউজিক ট্রিভিয়া গেম—যেখানে মেটালিকা, বিটলস বা পিঙ্ক ফ্লয়েডের মতো ব্যান্ড দলের গান, লিরিক বা অ্যালবাম নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে এগিয়ে যেতে হতো। সঙ্গীতশিল্পী হওয়ায় কাজটি বেশ উপভোগ করতেন অনিল। এমনকি ক্লায়েন্টের সঙ্গে এমন সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছিল যে তিনি অনিলকে উপহার হিসেবে টি-শার্টও পাঠিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে ইবে-র জন্য হ্যালোইন পোশাকের ক্যাটালগ তৈরি এবং যুক্তরাজ্যের ম্যাপিং প্রজেক্টেও কাজ করেছেন অনিল। ঢাকার লন্ডন স্কুল অব কমার্সে ব্যবসায় শিক্ষায় পড়াশোনা করা অনিলের কাছে কোয়ান্টানাইটের কর্মপরিবেশ খুব চমৎকার মনে হয়। অফিসে রয়েছে সিনেমা রুম, গেমিং জোন আর ছাদ-বাগান, যেখানে কাজের ক্লান্তি দূর করেন কর্মীরা।
দীর্ঘ ১২ বছরের ক্যারিয়ারে অনিল দেখেছেন ভিনদেশি সংস্কৃতির নানা দিক। তিনি বলেন, 'আমাদের প্রায় সব ক্লায়েন্টই বিদেশি, মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের। বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করাটা সব সময় মজার। মার্কিনিরা কাজের সময় অত্যন্ত সিরিয়াস, আবার কাজ শেষে খুব রিল্যাক্সড। ব্রিটিশরা 'টা-টা, গুডবাই' বলে দ্রুত কাজ শেষ করতে পছন্দ করে। একবার এক সুইডিশ ক্লায়েন্ট ট্রেনিং চলাকালে আমাকে স্মার্টফোন হাতে নিয়ে বোঝাচ্ছিলেন এটি কীভাবে কাজ করে। সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন আমি আগে কখনো স্মার্টফোন দেখিনি।'
অনিল হাসতে হাসতে সেই স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, তিনি তখন পকেট থেকে নিজের ফোনটি বের করেছিলেন, যা ছিল ওই ক্লায়েন্টের ফোনের চেয়েও আধুনিক এবং লেটেস্ট মডেল।
মিক্কো তাম্মিনেনকে অনিল চেনেন অনেক আগে থেকেই। অনিল জানান, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হোয়ার্টন স্কুলের এক বাংলাদেশি সাবেক এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মিক্কো প্রথম বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে পারেন। মিক্কো যখন প্রথম ঢাকা আসেন, তখন গুলশানে ওই সাবেক শিক্ষার্থীর অফিসেই কাজ শুরু করেন। সাত মাস পর তিনি অফিস সরিয়ে নেন মিরপুর ডিওএইচএস-এ। তিন বছর পর তার কর্মী সংখ্যা বেড়ে হয় ১০০। এর প্রায় দুই বছর পর বড় জায়গার প্রয়োজনে কোয়ান্টানাইট মিরপুরের সিআরপি ভবনের দশম তলায় চলে আসে।
মিক্কো সাধারণত একবারে তিন-চার মাসের জন্য ঢাকায় থাকেন। ওঠেন গুলশানের আমারি হোটেলে। দুপুরের খাবারের জন্য পিৎজা হাট থেকে পিৎজা অর্ডার করাই ছিল তার পছন্দ। মিক্কো তার সহকর্মীদের প্রতি ভীষণ বন্ধুসুলভ। তিনি আলাদা কেবিনে বসার চেয়ে কর্মীদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই
বিপিও খাতে অনেক সময় বড় প্রজেক্টের চাপে দ্রুত জনবল নিয়োগের প্রয়োজন হয়। এইচআর-এ থাকাকালীন অনিলকে একবার মাত্র দুই সপ্তাহে ৭০ জন কর্মী নিয়োগ দিতে হয়েছিল।
এখানকার আবেদনের যোগ্যতাও বেশ সহজ: আইটিতে প্রাথমিক ধারণা এবং মোটামুটি কাজ চালানোর মতো ইংরেজি। পূর্ব অভিজ্ঞতার তেমন প্রয়োজন হয় না। যদিও শুরুতে বেতন ২০ হাজার টাকার আশেপাশে থাকে, তবুও ট্রিপল-ই (ইইই) বা বিবিএ গ্র্যাজুয়েটদের এই খাতের প্রতি বেশ আগ্রহ দেখা যায়।
নাফিজ আলমের মতে, অনেক তরুণ কেবল বেতনের জন্য নয়, বরং কাজের পরিবেশ এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার জন্য এখানে আসেন। তিনি বলেন, 'অনেকের জন্য বিপিও হলো বিদেশে যাওয়ার আগে একধরণের প্রস্তুতির ক্ষেত্র। এখানে ইউরোপ-আমেরিকার কাজের সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচয় ঘটে। গত বছর লন্ডন সফরের সময় আমি আমাদের এক প্রাক্তন কর্মীর দেখা পাই, যিনি সেখানে ইউনিক্লো-র ওয়ার্কফোর্স ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন। তার অধীনে অভিবাসী ও ব্রিটিশ নাগরিকরা কাজ করছেন।'
কিউ-ল্যাব এবং এআই-এর উত্থান
কোয়ান্টানাইটের কিছু কাজ অত্যন্ত দ্রুত করতে হয়। 'লাইভ টিম' নামে পরিচিত কর্মীরা মুহূর্তের মধ্যে কন্টেন্ট যাচাই করেন—যেখানে নগ্নতা, জাতিবিদ্বেষ বা উসকানিমূলক কিছু আছে কিনা তা এক বা দুই সেকেন্ডের মধ্যে শনাক্ত করতে হয়।
২০১৫ সালে যুক্তরাজ্য এবং ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পর ২০২০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় কল সেন্টার খোলে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে তাদের কর্মী সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার। একই বছর তারা মুম্বাইতে 'কিউ-ল্যাব' স্থাপন করে, যার লক্ষ্য হলো ক্লায়েন্ট সার্ভিসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা।
এআই কি বিপিও খাতের জন্য হুমকি? নাফিজ আলম বেশ ইতিবাচক উত্তর দিলেন। তিনি বলেন, 'আমরা এআই-কে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে এগিয়ে থাকতে চাই। গতানুগতিক বা একই ধরণের কাজগুলো এআই করলে মানুষ আরও সৃজনশীল কাজে মন দিতে পারবে। এতে ক্লায়েন্টরাও বেশি খুশি হন।'
'এআই এখনো ছাত্র'
নাফিজের মতে, এআই এখনো বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তার ভাষায়, 'এআই এখনো একজন ছাত্র। বিপদ তখনই শুরু হবে, যখন সে শিক্ষকের মতো আচরণ শুরু করবে।' প্রযুক্তিকে থামানো সম্ভব নয়, তাই একে ধ্বংসাত্মক নয় বরং গঠনমূলকভাবে ব্যবহারের কৌশল শিখছেন কোয়ান্টানাইটের কর্মীরা। লার্নিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার তরুণ কুমার রায় এখন কর্মীদের এআই-এর ইতিহাস ও প্রায়োগিক দিক নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
টিম লিডার কাজী সাঈদ তার অ্যাসোসিয়েট থাকাকালীন সময়ের এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা জানালেন। ড্যাশবোর্ড ক্যামেরার ফুটেজ দেখে তাকে শনাক্ত করতে হতো চালক অসাবধান কি না। একবার জুম করে তিনি দেখলেন, এক চালক হাতে কলম নয়, বরং সিগারেট ধরে আছেন—যা প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতি বিরুদ্ধ। সাঈদের মতে, এআই আসার ফলে এ ধরণের কাজগুলো এখন সহজ হচ্ছে।
কোয়ালিটি চেকার শাফায়েত শিমুল গত ছয় বছর ধরে রেস্তোরাঁ মেনু থেকে শুরু করে প্রপার্টি মেইনটেন্যান্স রিপোর্ট নিয়ে কাজ করছেন। লন্ডনের কোনো বাড়ির কল নষ্ট হওয়া বা প্রতিবেশীর অসুবিধার খবর তিনি পৌঁছে দিতেন সংশ্লিষ্ট ম্যানেজমেন্টের কাছে। শিমুলও মনে করেন এআই মানুষের জায়গা দখল করবে না, বরং নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করবে।
ঢাকা থেকে বিশ্ব জয়
কোয়ান্টানাইট মূলত একটি 'সার্ভিস ডেলিভারি সেন্টার'। ভয়েস-বেজড সাপোর্টের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা এবং বহুভাষী সুবিধার জন্য কায়রোতে তাদের অফিস থাকলেও অপারেশনাল বা ব্যাক অফিস কাজের জন্য ঢাকা তাদের প্রধান কেন্দ্র।
বিশ্বজুড়ে ফ্রিল্যান্সিং জনপ্রিয় হলেও অনিল মনে করেন প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির স্থিতিশীলতা আলাদা। কারণ এখানে গ্লোবাল সেলস টিমই ক্লায়েন্ট খুঁজে আনে। ট্রিপ অ্যাডভাইজার, কোর্সেরা কিংবা ফেসবুকের মালিকানাধীন ম্যাপিলারি-র মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে কোয়ান্টানাইটের।
তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানটি একটি বড় প্রজেক্ট হারায়, যার ফলে ৩৫০ জন কর্মীকে ছাঁটাই করতে হয়েছিল। আবার একবার 'মেটা'-র কাজ পাওয়ার সব কিছু চূড়ান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল হয়, কারণ ক্লায়েন্ট প্রতিটি কর্মীর সাত বছরের পুলিশ রেকর্ড দাবি করেছিল—যা বাংলাদেশে প্রচলিত নয়।
তবুও থেমে নেই কোয়ান্টানাইট। ঢাকার বুক চিরে নিরবে বিশ্বের বড় বড় কোম্পানির সমস্যার সমাধান দিয়ে যাচ্ছেন এ দেশের কর্মীরা। ২৪ ঘণ্টা সচল থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বাস করে, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললে ভবিষ্যতে তাদের অগ্রযাত্রা আরও বহুদূর বিস্তৃত হবে।