এআই-এর যুগে বিশ্ববিদ্যালয়: ভরসা, যোগ্যতা, আর নজরদারির টানাপোড়া
১৩৩ বছর ধরে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে একটি অসাধারণ ঐতিহ্য ছিল। পরীক্ষার হলে কোনো প্রক্টর থাকত না। শিক্ষকরা বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিবেক ও সততার জায়গা থেকে নকল করবে না। পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা একটি প্রতিজ্ঞাপত্রে সই করত যে, তারা কোনো অসদুপায় অবলম্বন করেনি। ১৮৯৩ সাল থেকে চলে আসা এই 'অনার কোড' শুধু একটি একাডেমিক নিয়ম ছিল না; এটি ছিল মানুষকে বিশ্বাস করার একটি সাংস্কৃতিক অবস্থান। বিশ্বযুদ্ধ এসেছে, ইন্টারনেট এসেছে, স্মার্টফোন এসেছে, কিন্তু এই ঐতিহ্য টিকে ছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত যে শক্তি এই প্রথাকে বদলে দিল, তার নাম এআই।
চ্যাটজিপিটি বা অন্যান্য জেনারেটিভ এআই টুলের যুগে পরীক্ষার সময় গোপনে উত্তর তৈরি করা এত সহজ হয়ে গেছে যে, শুধুমাত্র 'সততার প্রতিশ্রুতি' এখন আর যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। প্রযুক্তি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে মানুষ কী লিখছে আর মেশিন কী লিখে দিচ্ছে, সেই সীমারেখা মুহূর্তেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতার মুখে ২০২৬ সালের ১১ মে প্রিন্সটনের শিক্ষকরা পরীক্ষার হলে আবার প্রক্টর ফিরিয়ে আনার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ, এখন থেকে পরীক্ষার সময় শিক্ষক বা পরিদর্শক উপস্থিত থাকবেন এবং নজরদারি করবেন। কারিগরিভাবে 'অনার কোড' এখনো আছে, শিক্ষার্থীরা এখনো প্রতিজ্ঞাপত্রে সই করবে, কিন্তু সেই পুরোনো 'ভরসা' ভিত্তিক পরীক্ষার সংস্কৃতি আর আগের মতো থাকছে না।
আমাদের কাছে এই ঘটনাটি এআই নিয়ে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গভীর প্রতীকগুলোর একটি। কারণ, আমরা প্রায়ই এআই-এর দক্ষতা, গতি বা সুবিধা নিয়ে কথা বলি, কিন্তু খুব কমই আলোচনা করি যে, এই প্রযুক্তি ধীরে ধীরে কোন সামাজিক সম্পর্কগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রিন্সটনের এই সিদ্ধান্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির পরিবর্তন সবসময় কেবল নতুন সুবিধা আনে না; কখনও কখনও তা মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের কাঠামোকেও পুনর্লিখন করে। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়টি মনে করত, শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা দিলে তারা দায়িত্বশীল হবে। এখন প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে, প্রযুক্তির এই যুগে শুধুমাত্র নৈতিকতার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। হয়তো এটাই এআই যুগের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন: আমরা শুধু মেশিনের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছি না, ধীরে ধীরে একে অপরের ওপর আস্থাও হারাতে শুরু করছি।
প্রিন্সটনের ঘটনাটি আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই ধরনের পরিবর্তন এখন বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে। ওবারলিন কলেজেও তাদের ঐতিহ্যবাহী অনার কোড বদলানোর আলোচনা চলছে। এতদিন সেখানে পরীক্ষার হলে শিক্ষকদের উপস্থিতি প্রায় নিষিদ্ধ ছিল, কারণ প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বাস করত যে শিক্ষার্থীদের সততাই পরীক্ষার মূল ভিত্তি। কিন্তু এআই-নির্ভর জালিয়াতির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পর এখন সেখানে প্রক্টরিং বা সরাসরি নজরদারির অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। অর্থাৎ, যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একসময় স্বাধীনতা ও বিশ্বাসকে শিক্ষার অংশ হিসেবে দেখত, তারাও এখন ধীরে ধীরে নজরদারিনির্ভর কাঠামোর দিকে ঝুঁকছে।
একই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পরীক্ষার ধরনও। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখন আবার মৌখিক পরীক্ষা বা 'ওরাল এক্সাম'-এর দিকে ফিরে যাচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ায় অনেক শিক্ষক লিখিত অ্যাসাইনমেন্টের পাশাপাশি মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করছেন, যাতে বোঝা যায় শিক্ষার্থী সত্যিই বিষয়টি বুঝেছে নাকি শুধু এআই দিয়ে সুন্দর ভাষায় উত্তর তৈরি করেছে। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির কিছু কোর্সে আবার এআই-চালিত মৌখিক পরীক্ষাও নেওয়া হচ্ছে, যেখানে চ্যাটবট শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করে তাদের চিন্তার গভীরতা যাচাই করছে। বিষয়টি এক ধরনের বিদ্রূপও তৈরি করছে: এআই-সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে আবার এআই-কেই ব্যবহার করা হচ্ছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে অনেক প্রতিষ্ঠান আবার পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাচ্ছে। হাতে লেখা পরীক্ষা, ক্লাসরুমে বসে কাগজে উত্তর দেওয়া কিংবা সরাসরি উপস্থিতিতে মূল্যায়ন এখন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বুঝতে পারছে, বাসায় বসে করা নিখুঁত অ্যাসাইনমেন্ট আর সত্যিকারের শেখার মধ্যে পার্থক্য করা ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নীতিমালাও বদলাচ্ছে। এখন অনেক কোর্সে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে কোথায় এআই ব্যবহার করা যাবে আর কোথায় যাবে না। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকারও করছে যে, শুধুমাত্র এআই ডিটেক্টর সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে কাউকে অভিযুক্ত করা বিপজ্জনক, কারণ এই প্রযুক্তি প্রায়ই ভুল সিদ্ধান্ত দেয়।
ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইন, যেখানে শরিফা কর্মরত, সেখানেও বর্তমানে এআই-এর প্রভাব মোকাবিলায় এক ধরনের 'মিশ্র পদ্ধতি' দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি বিভাগের বাস্তবতা অনুযায়ী মূল্যায়নের ধরন বদলানো হচ্ছে। স্টেম বিষয়গুলোতে হাতে-কলমে পরীক্ষা, রেস্ট্রিক্টেড কোডিং এনভায়রনমেন্ট, বোর্ডে দাঁড়িয়ে প্রোগ্রামিং লজিক ব্যাখ্যা এবং নতুন হাইপোথেটিক্যাল ডেটাসেট ভিত্তিক প্রবলেম সেটের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে এআই থেকে সরাসরি উত্তর কপি করা কঠিন হয়। অন্যদিকে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগগুলোতে ইন-ক্লাস রাইটিং, ড্রাফট-ভিত্তিক মূল্যায়ন এবং আলোচনাভিত্তিক মূল্যায়নের প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন সিলেবাসেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করছে কোথায় এআই ব্যবহার করা যাবে, কোথায় যাবে না এবং এআই ব্যবহার করলে 'অ্যাট্রিবিউশন' বা স্বীকৃতি প্রদান বাধ্যতামূলক কি না। সহ-লেখক ইশতিয়াক পড়ান ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোতে একই ধরনের পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছেন, যেখানে ২০২৫ সালের এআই টাস্কফোর্স রিপোর্ট স্টেম ও নন-স্টেম বিষয়ের জন্য আলাদা মূল্যায়ন কৌশলের সুপারিশ করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন ধীরে ধীরে 'চূড়ান্ত উত্তর' মূল্যায়নের বদলে 'চিন্তার প্রক্রিয়া' বা প্রসেস মূল্যায়নের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি প্রযুক্তি নয়, বরং শিক্ষার দর্শন নিয়ে। আমরা কি এমন এক পৃথিবীর দিকে এগোচ্ছি, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শুরু থেকেই 'সম্ভাব্য প্রতারক' হিসেবে ধরে নেওয়া হবে? নজরদারি হয়তো কিছু ক্ষেত্রে জালিয়াতি কমাবে, কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে এটি শিক্ষার পরিবেশকে আরও ভীতিকর, প্রতিযোগিতামূলক এবং অবিশ্বাসনির্ভর করে তুলতে পারে। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাধীন চিন্তা, নৈতিকতা এবং আত্মদায়িত্ব তৈরি করতে চাইত। এখন মনে হচ্ছে, ধীরে ধীরে সেই জায়গা দখল করছে নজরদারি, যাচাই এবং সন্দেহ। হয়তো এআই যুগ আমাদের শুধু নতুন প্রযুক্তিই দেয়নি; এটি আমাদের শেখাচ্ছে যে আধুনিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ বিশ্বাসের বদলে নিয়ন্ত্রণের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এই পরিবর্তনগুলো আরও জটিল বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। কারণ আমাদের শিক্ষা কাঠামো এখনো অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর, পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং নম্বরভিত্তিক। সেখানে এআই খুব দ্রুত একটি 'শেখার সহকারী' থেকে 'শর্টকাট নেওয়ার যন্ত্র'-এ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষার্থী অ্যাসাইনমেন্ট লেখা, কোড তৈরি, এমনকি গবেষণাপত্রের অংশ তৈরির জন্যও এআই ব্যবহার করছে, কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এখনো স্পষ্টভাবে জানে না কোথায় এআই গ্রহণযোগ্য আর কোথায় তা একাডেমিক অসততা। ফলে একদিকে শিক্ষার্থীরা দ্রুত এআই ব্যবহার শিখছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলগুলোর নীতিমালা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং মূল্যায়ন কাঠামো সেই গতিতে বদলাতে পারছে না। এই ব্যবধান ভবিষ্যতে বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, বাংলাদেশের এআই থেকে দূরে থাকার সুযোগ আর নেই। ভবিষ্যতের চাকরি, গবেষণা, ব্যবসা, এমনকি দৈনন্দিন যোগাযোগেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই প্রশ্নটি এআই নিষিদ্ধ করা উচিত কি না সেটি নয়; বরং প্রশ্ন হলো আমরা শিক্ষার্থীদের কীভাবে দায়িত্বশীল, সমালোচনামূলক এবং নৈতিকভাবে এআই ব্যবহার করতে শেখাব। যদি শিক্ষাব্যবস্থা শুধু নজরদারি বাড়ায়, তাহলে হয়তো ভয় তৈরি হবে, কিন্তু প্রকৃত 'এআই লিটারেসি' বা এআই-সাক্ষরতা তৈরি হবে না। বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষানীতি, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু এআই দিয়ে উত্তর তৈরি করতে শিখবে না, বরং এআই-এর সীমাবদ্ধতা, ভুল, পক্ষপাত এবং সামাজিক প্রভাবও বুঝতে শিখবে। নাহলে আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করতে পারি যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে, কিন্তু প্রযুক্তিকে প্রশ্ন করতে পারবে না।
লেখক: শরিফা সুলতানা, সহকারী অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইন; ডিরেক্টর, ইলিনয় রেসপন্সিবল এআই গ্রুপ।
সহ-লেখক: সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, সহযোগী অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো; সহযোগী পরিচালক, নলেজ মিডিয়া ডিজাইন ইনস্টিটিউট।
