পোপের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, ‘যিশুর’ বেশে ছবি পোস্টের পর এবার প্রকাশ্যে বাইবেল পাঠের ঘোষণা ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সপ্তাহে প্রকাশ্যে একটি বাইবেল পাঠ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে রাষ্ট্রীয় দাপ্তরিক কাজে ধর্মকে, বিশেষ করে খ্রিষ্টধর্মকে একীভূত করছে, এটি তারই ধারাবাহিকতা।
আয়োজকদের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, '২১ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টায় (ইএসটি) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওভাল অফিস থেকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করবেন।' এই অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছে 'আমেরিকা রিডস দ্য বাইবেল'।
সপ্তাহব্যাপী এই পাঠ কর্মসূচিতে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ সম্প্রতি ইরান সংঘাত নিয়ে পোপ লিও-র সাথে তার বিরোধ তৈরি হয়েছে এবং এই সপ্তাহের শুরুতে নিজেকে যিশু খ্রিষ্ট হিসেবে চিত্রিত করা একটি এআই-জেনারেটেড ছবি পোস্ট করে এবং পরে তা মুছে ফেলে তিনি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।
আয়োজকদের মতে, ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বাইবেলের '২ ক্রনিকলস ৭:১১-২২' অংশ থেকে পাঠ করবেন। এর মধ্যে বহুল উদ্ধৃত ১৪ নম্বর আয়াতটিও রয়েছে: 'যদি আমার প্রজারা, যারা আমার নামে পরিচিত, তারা নিজেদের নম্র করে এবং প্রার্থনা করে, আমার সান্নিধ্য খোঁজে এবং তাদের মন্দ পথ থেকে ফিরে আসে; তবে আমি স্বর্গ থেকে তাদের কথা শুনব, তাদের পাপ ক্ষমা করব এবং তাদের দেশ নিরাময় করব।'
এই আয়াতটি এর আগেও জনসমক্ষে আলোচিত হয়েছিল যখন 'কাউবয়স ফর ট্রাম্প'-এর প্রতিষ্ঠাতা কুই গ্রিফিন ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি মার্কিন ক্যাপিটল দাঙ্গার সময় ভিড়ের মধ্যে এটি পাঠ করে প্রার্থনা করেছিলেন।
'খ্রিস্টান পোস্ট'-এর তথ্য অনুযায়ী, এই আয়াতের সাথে ট্রাম্পের সম্পর্ক আরও পুরোনো। ২০১৬ সালের বিজয়ের পরপরই ধর্মপ্রচারক অ্যান গ্রাহাম লটজ (বিলি গ্রাহামের মেয়ে) বলেছিলেন যে, এটি একটি চিহ্ন যে ঈশ্বর তাঁর প্রজাদের প্রার্থনার উত্তর দিচ্ছেন, ঠিক যেমনটি '২ ক্রনিকলস ৭:১৪'-তে বলা হয়েছে।
এই অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক এবং 'খ্রিষ্টানস এনগেজড'-এর প্রেসিডেন্ট বুন্নি পাউন্ডস ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন যে, 'সেকেন্ড ক্রনিকলস-এর সপ্তম অধ্যায়টি পড়ার জন্য তাদের বিশেষ কাউকে প্রয়োজন ছিল' এবং তারা এই অংশটি ট্রাম্পের পড়ার জন্যই নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন।
সিরাকিউস ইউনিভার্সিটির ম্যাক্সওয়েল স্কুলের ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মার্গারেট সুসান থম্পসন সিএনএন-কে বলেন, অনেক ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিষ্টান এই আয়াতটিকে 'ঈশ্বরের কাছে নিজ জাতির আশীর্বাদ চাওয়ার একটি ন্যায্যতা' হিসেবে দেখেন।
ট্রাম্প প্রশাসন ইদানীং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে খ্রিস্টীয় ভাষা ব্যবহার করলেও থম্পসন উল্লেখ করেন যে, এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার থেকে শুরু করে জর্জ ডব্লিউ বুশ পর্যন্ত আমেরিকান নেতারা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু কোনো নেতা ব্যক্তিগতভাবে তাদের বিশ্বাসকে বাধ্যতামূলক নির্দেশ হিসেবে চাপিয়ে দেননি।
থম্পসন বলেন, 'সমস্যা তখনই হয় যখন এটি সমগ্র জাতির জন্য আদর্শ বা বাধ্যতামূলক ধর্মীয় মতবাদ হিসেবে নির্ধারিত হয়।'
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের এই পাঠ কর্মসূচিতে প্রশাসনের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যোগ দেবেন। এদের মধ্যে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং চিফ অফ স্টাফ সুজি ওয়াইলস।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প দুটি ধর্মীয় বিষয়ের কেন্দ্রে ছিলেন। প্রথমটি ছিল পোপ লিও-র সাথে বিরোধ, যিনি ইরানের সাথে যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। প্রেসিডেন্ট পোপের সমালোচনা করে সাংবাদিকদের বলেন, 'আমরা এমন পোপকে পছন্দ করি না যিনি বলবেন যে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা ঠিক আছে। আমি পোপ লিও-র ভক্ত নই।' জবাবে পোপ বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনকে নিয়ে তার 'কোনো ভয় নেই'।
এরপর ট্রাম্পকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয়, যখন তিনি নিজেকে যিশুরূপে দেখানো একটি এআই ছবি পোস্ট করেন, যা তার নিজ সমর্থকদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি করে।
তিনি ওয়েস্ট উইংয়ের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি ভেবেছিলাম এটি আমাকে একজন ডাক্তার হিসেবে দেখাচ্ছে এবং রেড ক্রসের সঙ্গে সম্পর্কিত।' তিনি আরও বলেন, 'এখানে আমাকে একজন চিকিৎসক হিসেবে দেখানোর কথা, যে মানুষকে ভালো করে তোলে। আর আমি মানুষকে ভালো করি।'
গত বছর ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই তার প্রশাসন গির্জা ও রাষ্ট্রের মধ্যকার বিভাজন ক্রমশ কমিয়ে আনছে। হোয়াইট হাউস আমেরিকানদের সপ্তাহে এক ঘণ্টা প্রার্থনার জন্য অনুরোধ করেছে। সরকারি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে বাইবেলের আয়াত ও খ্রিস্টীয় চিত্রকর্ম দেখা যাচ্ছে এবং ফেডারেল সংস্থাগুলো প্রার্থনা সভার আয়োজন করছে।
এই বছরের শুরুর দিকে হেগসেথ—যিনি পেন্টাগনের দাপ্তরিক কাজে ধর্মকে অন্তর্ভুক্ত করার এবং নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ উদ্ধৃত করার চেষ্টা করেন—পেন্টাগনে প্রার্থনা সভার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একজন বিতর্কিত যাজককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ডগলাস উইলসন নামের ওই যাজক নারীদের ভোটাধিকার বাতিলের সমর্থন করেন, সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে চান এবং খ্রিষ্টীয় ধর্মতন্ত্রের ডাক দেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরান যুদ্ধ নিয়ে পেন্টাগনের এক ব্রিফিংয়ে হেগসেথ সাংবাদিকদের 'ফরীশী' বা সেই সময়কার স্বঘোষিত অভিজাতদের সাথে তুলনা করেন, যারা যিশুর 'মহত্ত্ব' নিয়ে সন্দেহ পোষণ করত।
