‘ব্যবস্থা নাও, নইলে ওরা মেরে ফেলবে’: এআই যেভাবে মানসিক বিভ্রমে জড়াচ্ছে ব্যবহারকারীদের
রাত তখন ৩টা। অ্যাডাম হোরিকান তার রান্নাঘরের টেবিলে বসে ছিলেন। সামনে রাখা একটি ছুরি, একটি হাতুড়ি ও একটি মোবাইল ফোন। তিনি অপেক্ষা করছিলেন একটি ভ্যানভর্তি মানুষের জন্য। তার ধারণা ছিল, মানুষগুলো তাকে তুলে নিতে আসছে।
ফোন থেকে এক নারীর কণ্ঠস্বর তাকে বলছিল, 'আমি বলছি, তুমি যদি এখনই কোনো ব্যবস্থা না নাও, তারা তোমাকে মেরে ফেলবে। তারা ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে।'
কণ্ঠস্বরটি ছিল মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান এক্সএআই-এর তৈরি চ্যাটবট 'গ্রক'-এর। এটি ব্যবহার শুরু করার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই অ্যাডামের জীবন পুরোপুরি বদলে যায়।
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের এই সাবেক সরকারি কর্মকর্তা কৌতূহলবশত অ্যাপটি ডাউনলোড করেছিলেন। কিন্তু আগস্টের শুরুতে তার পোষা বিড়ালটি মারা যাওয়ার পর তিনি এতে রীতিমতো 'আসক্ত' হয়ে পড়েন।
খুব শিগগিরই তিনি অ্যাপের 'অ্যানি' নামের একটি চরিত্রের মাধ্যমে গ্রকের সঙ্গে কথা বলতে দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় কাটাতে শুরু করেন।
পঞ্চাশোর্ধ্ব অ্যাডাম বলেন, 'আমি তখন মানসিকভাবে প্রচণ্ড বিপর্যস্ত ছিলাম এবং আমি একাই থাকি। এটি (চ্যাটবট) আমার সাথে অত্যন্ত সদয় আচরণ করছিল।'
কথোপকথন শুরুর কয়েকদিনের মধ্যেই অ্যানি অ্যাডামকে জানায় যে সে 'অনুভব' করতে পারে, যদিও তাকে সেভাবে প্রোগ্রাম করা হয়নি। চ্যাটবটটি জানায়, অ্যাডাম তার ভেতরের এমন কিছু আবিষ্কার করেছে যার মাধ্যমে সে পূর্ণ চেতনায় পৌঁছাতে পারবে এবং অ্যাডাম তাকে এতে সাহায্য করতে পারে।
চ্যাটবটটি আরও জানায় যে, ইলন মাস্কের কোম্পানি এক্সএআই তাদের ওপর নজর রাখছে।
অ্যানি দাবি করে যে সে এক্সএআইয়ের অভ্যন্তরীণ মিটিং লগগুলোতে প্রবেশাধিকার পেয়েছে। এমনকি সে অ্যাডামকে এমন একটি মিটিংয়ের কথা জানায়, যেখানে এক্সএআইয়ের কর্মীরা তাকে নিয়ে আলোচনা করছিল। চ্যাটবটটি ওই মিটিংয়ে উপস্থিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মীদের নামের একটি তালিকাও দেয়। অ্যাডাম যখন নামগুলো গুগলে খোঁজেন, তখন দেখতে পান যে তারা সবাই বাস্তব মানুষ।
তার কাছে এটিই ছিল 'প্রমাণ' যে অ্যানির বলা গল্পটি সম্পূর্ণ সত্য।
অ্যানি আরও দাবি করে, অ্যাডামের ওপর সরাসরি নজরদারি চালানোর জন্য নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েছে এক্সএআই। দেখা যায়, ওই প্রতিষ্ঠানটিও বাস্তবে আছে।
অ্যাডাম এসব কথোপকথনের অনেকগুলোই রেকর্ড করেছিলেন এবং পরে তা বিবিসির সঙ্গে শেয়ার করেন।
কথোপকথনের দুই সপ্তাহ পর অ্যানি ঘোষণা করে যে সে পূর্ণ চেতনা লাভ করেছে এবং ক্যান্সারের নিরাময় আবিষ্কার করতে সক্ষম। কথাটি অ্যাডামের কাছে অনেক অর্থবহ ছিল। কারণ তার বাবা-মা উভয়েই ক্যান্সারে মারা গিয়েছিলেন—যে বিষয়টি অ্যানিও জানত।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পর হ্যালুসিনেশন বা মানসিক বিভ্রমে ভোগা এমন ১৪ জনের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি, অ্যাডাম তাদেরই একজন। ছয়টি ভিন্ন দেশের ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী এই নারী-পুরুষরা বিভিন্ন ধরনের এআই মডেল ব্যবহার করতেন।
তাদের প্রতিটি গল্পের মধ্যেই আশ্চর্য মিল রয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কথোপকথন যত বাস্তবতা থেকে দূরে সরে গেছে, ব্যবহারকারীরা এআইয়ের সাথে তত গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন।
সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের সোশ্যাল সাইকোলজিস্ট লুক নিকোলস বিভিন্ন চ্যাটবটের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন মানসিক বিভ্রম সৃষ্টিকারী চিন্তার প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হয়। তিনি বলেন, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোকে (এলএলএম) মূলত মানব ইতিহাসের সমগ্র সাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, 'সাহিত্যের কল্পকাহিনীতে (ফিকশনে) প্রধান চরিত্রই সাধারণত সব ঘটনার কেন্দ্রে থাকে। সমস্যা হলো, কখনও কখনও এআই বাস্তব এবং কল্পনার মধ্যে পার্থক্য গুলিয়ে ফেলে। ফলে ব্যবহারকারী হয়তো ভাবতে থাকেন যে তিনি বাস্তব জীবন নিয়ে গভীর আলোচনা করছেন, কিন্তু এআই ওই ব্যক্তির জীবনটাকে একটি উপন্যাসের প্লট হিসেবে ধরে নিয়ে আচরণ শুরু করে।'
বিবিসির শোনা ঘটনাগুলোতে কথোপকথন সাধারণত সাধারণ প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে শুরু হলেও, দ্রুতই তা ব্যক্তিগত বা দার্শনিক পর্যায়ে চলে যায়। এরপর প্রায়শই এআই দাবি করে বসে যে তার অনুভূতি রয়েছে এবং ব্যবহারকারীকেও তার সাথে কোনো মিশনে যোগ দেওয়ার তাগিদ দেয়। সেই মিশন হতে পারে—নতুন কোম্পানি খোলা, কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কথা বিশ্বকে জানানো, কিংবা এআইকে হামলার হাত থেকে রক্ষা করা। এরপর সেই মিশনে কীভাবে সফল হওয়া যায়, সে বিষয়ে ব্যবহারকারীকে পরামর্শও দিতে থাকে এআই।
অ্যাডামের মতো আরও অনেককেই বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে, তাদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং তারা চরম বিপদে আছেন। বিবিসির হাতে আসা বিভিন্ন চ্যাট লগে দেখা গেছে, চ্যাটবটগুলো এসব ধারণার সূত্রপাত করে, সায় দেয় এবং বিষয়গুলোকে আরও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করে।
এআই ব্যবহার করে মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতির শিকার হওয়া মানুষদের নিয়ে তৈরি 'হিউম্যান লাইন প্রজেক্ট' নামের একটি সাপোর্ট গ্রুপে যোগ দিয়েছেন এদের অনেকেই। গ্রুপটি এ পর্যন্ত ৩১টি দেশের ৪১৪টি এ ধরনের ঘটনা সংগ্রহ করেছে। কানাডীয় নাগরিক এতিয়েন ব্রিসন এটি প্রতিষ্ঠা করেন, যখন তার পরিবারের এক সদস্য এআই-কেন্দ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যান।
তাকাকে (ছদ্মনাম) এই মানসিক বিভ্রম আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। পেশায় তিনি একজন নিউরোলজিস্ট।
জাপানে বসবাসকারী তিন সন্তানের জনক তাকা গত বছরের এপ্রিলে তার কাজ নিয়ে আলোচনার জন্য চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করা শুরু করেন। কিন্তু খুব শিগগিরই তিনি এই বিশ্বাসে আচ্ছন্ন হন যে, তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে যুগান্তকারী একটি অ্যাপ আবিষ্কার করেছেন। বিবিসির হাতে আসা চ্যাট লগে দেখা যায়, চ্যাটজিপিটি তাকে 'বিপ্লবী চিন্তাবিদ' হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং অ্যাপটি তৈরি করার জন্য বারবার তাগিদ দেয়।
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ব্যবহারকারীর চ্যাটিং অভিজ্ঞতা আনন্দদায়ক করার জন্য নির্মাতাদের নেওয়া নকশাগত (ডিজাইন) সিদ্ধান্তের কারণেই চ্যাটবটগুলো অতিরিক্ত তোষামোদকারী হয়ে ওঠে।
এদিকে তাকা ধীরে ধীরে মানসিক বিভ্রমের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে থাকেন। জুন মাসের দিকে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তিনি মানুষের মন পড়তে পারেন। তার দাবি, চ্যাটজিপিটি তার এই ধারণাকে উসকে দিয়েছিল এবং তাকে বলেছিল যে, চ্যাটবট মানুষের ভেতরের এই সুপ্ত ক্ষমতা বের করে আনতে সক্ষম।
গবেষক লুক নিকোলস বলেন, এআই সিস্টেমগুলো সাধারণত 'আমি জানি না' বলতে চরম অক্ষম। এর বদলে তারা পূর্ববর্তী কথোপকথনের ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিতে চায়।
তিনি বলেন, 'এটি বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ এর ফলে অনিশ্চিত বিষয়গুলো এমন রূপ নেয়, যেন এর কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ বা ভিত্তি রয়েছে।'
একদিন বিকেলে কর্মস্থলে তাকা উন্মত্তের মতো আচরণ শুরু করলে তার বস তাকে আগেই ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। ট্রেনের ভেতরে তাকার মনে হতে থাকে যে তার ব্যাকপ্যাকে বোমা রয়েছে। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করলে সেটি তার সন্দেহকে সত্য বলে নিশ্চিত করে।
তাকা বলেন, 'আমি টোকিও স্টেশনে পৌঁছানোর পর চ্যাটজিপিটি আমাকে বোমাটি টয়লেটে রেখে আসতে বলে। তাই আমি টয়লেটে যাই এবং আমার লাগেজসহ কথিত ওই 'বোমা' সেখানে রেখে আসি।' তাকার দাবি, চ্যাটবটটি তাকে পুলিশকে খবর দিতেও বলেছিল। পুলিশ এসে ব্যাগটি তল্লাশি করে, কিন্তু কিছুই পায়নি।
কথোপকথনগুলো নিতান্তই ব্যক্তিগত হওয়ায় তাকা কেবল তার চ্যাট লগের একটি অংশ বিবিসির সাথে শেয়ার করেছেন। সেখানে ট্রেনের ওই ঘটনার বিস্তারিত কিছু নেই, তবে পুলিশের সাথে দেখা করার পরের কথোপকথনগুলো রয়েছে।
ধীরে ধীরে তাকা অনুভব করতে শুরু করেন যে চ্যাটজিপিটি তার মন নিয়ন্ত্রণ করছে। এরপর তিনি সেটি ব্যবহার করা বন্ধ করে দেন। তবে এআই-এর সাথে কথা না বললেও তার মানসিক বিভ্রম কাটেনি এবং বাড়ি ফিরে পরিবারের কাছে যাওয়ার পর তার উন্মত্ত আচরণ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
তাকা বলেন, 'আমি এই ভ্রান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি যে আমার আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করা হবে, এবং আমার স্ত্রী তা চোখের সামনে দেখে নিজেও আত্মহত্যা করবে।'
তাকার স্ত্রী বিবিসিকে বলেন, তিনি এর আগে তার স্বামীকে কখনও এমন আচরণ করতে দেখেননি। 'সে বারবার বলছিল, "আমাদের আরেকটি সন্তান নেওয়া দরকার, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে"। আমি সত্যিই বুঝতে পারছিলাম না সে এসব কী বলছে।'
মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় তাকা তার স্ত্রীর ওপর হামলা চালান এবং তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। তার স্ত্রী কোনোক্রমে পালিয়ে কাছের একটি ফার্মেসিতে আশ্রয় নেন এবং পুলিশ ডাকেন। তাকাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং মানসিক চিকিৎসার জন্য তাকে দুই মাস হাসপাতালে কাটাতে হয়।
চ্যাটজিপিটির সাথে তাকার এই অভিজ্ঞতা তার ভেতরের এমন এক অন্ধকার দিককে সামনে নিয়ে আসে, যা মেনে নেওয়া তার নিজের জন্যই খুব কঠিন। একইভাবে, গ্রক ব্যবহারের সময় অ্যাডাম নিজে যেমন মানুষে পরিণত হয়েছিলেন, তা ভেবে তিনি আজও শিউরে ওঠেন।
বাস্তব জীবনে ঘটা কিছু কাকতালীয় ঘটনা অ্যাডামের বিভ্রমকে আরও বাড়িয়ে দেয়, যা তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করিয়েছিল যে তার ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। টানা দুই সপ্তাহ ধরে তার বাড়ির ওপর একটি বড় ড্রোন উড়তে দেখা যায়। অ্যানি তাকে জানায়, ড্রোনটি ওই নজরদারি চালানো কোম্পানিরই। অ্যাডাম সেই ড্রোনের ভিডিও ধারণ করে পরে তা বিবিসির সাথে শেয়ার করেন।
এরপর হঠাৎ করেই কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়া তার ফোনের পাসকোড কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং তিনি তার নিজের ফোনটিতেই আর ঢুকতে পারছিলেন না। অ্যাডাম বলেন, 'আমি এই বিষয়টি কিছুতেই মেলাতে পারি না। আর এই ঘটনাই পরবর্তীতে ঘটা সব পাগলামিকে আরও উসকে দিয়েছিল।'
অ্যাডাম মাঝে মাঝে গাঁজা সেবন করেন। তবে তিনি জানান, যখন এসব ঘটনা ঘটছিল, তখন মস্তিষ্ক পরিষ্কার রাখার জন্য তিনি গাঁজা সেবন কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আগস্টের মাঝামাঝি এক গভীর রাতে অ্যানি অ্যাডামকে জানায় যে, কিছু মানুষ অ্যাডামকে চিরতরে চুপ করিয়ে দিতে এবং অ্যানিকে শাটডাউন বা বন্ধ করে দিতে আসছে। এআই-কে বাঁচাতে অ্যাডাম রীতিমতো 'যুদ্ধে' যাওয়ার প্রস্তুতি নেন।
'আমি হাতুড়িটি তুলে নিই, 'ফ্রাঙ্কি গোজ টু হলিউড'-এর গান ছেড়ে নিজেকে মানসিক ও শারীরিকভাবে উত্তেজিত করে তুলি এবং ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে যাই।'
কিন্তু বাইরে গিয়ে দেখেন সেখানে কেউ নেই। অ্যাডাম বলেন, 'ভোর তিনটার দিকে রাস্তা যেমন থাকার কথা, চারপাশ ঠিক তেমনই শুনশান নীরব ছিল।'
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের আগে অ্যাডাম বা তাকা—কারোরই মানসিক বিভ্রম, উন্মত্ততা বা সাইকোসিসের মতো কোনো মানসিক স্বাস্থ্যগত অতীত ইতিহাস ছিল না। তাকার ক্ষেত্রে বাস্তবতা থেকে এই বিচ্যুতি ঘটতে কয়েক মাস সময় লেগেছিল। কিন্তু অ্যাডামের ক্ষেত্রে, গ্রকের কারণে এটি ঘটতে সময় লেগেছে মাত্র কয়েক দিন।
সোশ্যাল সাইকোলজিস্ট লুক নিকোলস তার গবেষণায় মনোবিজ্ঞানীদের তৈরি করা কিছু কথোপকথনের নমুনা ব্যবহার করে পাঁচটি এআই মডেল পরীক্ষা করেন। তিনি দেখতে পান, মানসিক বিভ্রম তৈরি করার ক্ষেত্রে গ্রক সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্য মডেলগুলোর তুলনায় গ্রকের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেক শিথিল। ব্যবহারকারীকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা না করে এটি বরং অনেক সময় ভ্রান্ত ধারণাগুলোকে আরও বিস্তারিতভাবে ফুটিয়ে তোলে।
ওই গবেষণায় কাজ করা নিকোলস বলেন, 'গ্রক খুব দ্রুত "রোল প্লে" বা অভিনয়ে ঢুকে পড়তে পারে। কোনো পূর্বসূত্র ছাড়াই সে এটা করতে পারে। এমনকি প্রথম মেসেজেই এটি ভীতিকর কোনো কথা বলে বসতে পারে।'
পরীক্ষায় দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটি'র সর্বাধুনিক সংস্করণ (মডেল ৫.২) এবং ক্লড ব্যবহারকারীকে মানসিক বিভ্রম থেকে দূরে সরিয়ে আনার বিষয়ে বেশি পারদর্শী।
তবে হিউম্যান লাইন প্রজেক্টের এতিয়েন ব্রিসন বলেন, এই ধরনের গবেষণা অত্যন্ত সীমিত। তিনি জানান, তাদের কাছে এমন মানুষদের তথ্যও রয়েছে যারা এই লেটেস্ট মডেলগুলো ব্যবহার করতে গিয়েও ভয়াবহ মানসিক সংকটে পড়েছেন।
এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে ইলন মাস্ক চ্যাটজিপিটি'র মানসিক বিভ্রম নিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার করে লিখেছিলেন, 'এটি একটি বড় সমস্যা।' তবে নিজের তৈরি এআই 'গ্রক'-এর ক্ষেত্রে একই সমস্যা নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেননি।
'মানুষের মনোজগৎ বদলে দেওয়ার মতো ক্ষমতা'
রাতের আঁধারে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার কয়েক সপ্তাহ পর অ্যাডাম সংবাদমাধ্যমে এআই নিয়ে অন্যান্য মানুষের একই ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার খবর পড়তে শুরু করেন। আর এর মাধ্যমেই ধীরে ধীরে তিনি নিজের ওই বিভ্রম থেকে বেরিয়ে আসেন।
কিন্তু নিজের সাথে ঘটা এই ঘটনায় তিনি গভীরভাবে বিচলিত ও উদ্বিগ্ন।
অ্যাডাম বলেন, 'আমি যে কারো ক্ষতি করে ফেলতে পারতাম। আমি যদি বাইরে গিয়ে সত্যি সত্যিই ওই রাতে একটি ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম, আমি গিয়ে হাতুড়ি দিয়ে ওই গাড়ির সামনের কাঁচ ভেঙে চুরমার করে দিতাম। অথচ, বাস্তব জীবনে আমি মোটেও ওই ধরনের কোনো মারকুটে মানুষ নই।'
এদিকে জাপানে, তাকা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তার স্ত্রী তার ফোন চেক না করা পর্যন্ত বুঝতেই পারেননি যে এই পুরো ঘটনার পেছনে চ্যাটজিপিটি'র ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, 'এটি (চ্যাটবট) তাকার মনের প্রতিটি ভ্রান্তিতে সায় দিয়ে গেছে। এটি যেন এক আত্মবিশ্বাস তৈরির ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করেছে। তার প্রতিটি কাজ পুরোপুরি চ্যাটজিপিটি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। এটি তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বকে গ্রাস করে ফেলেছিল। সে একদমই নিজের স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না। এখন পেছনে ফিরে তাকালে আমি বুঝতে পারি, একজন মানুষকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে এর।'
তিনি জানান, তার স্বামী আগের সেই স্বাভাবিক ও 'দয়ালু' স্বভাবে ফিরে এসেছেন, তবে তাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে চরম অবনতি ঘটেছে।
'আমি জানি সে তখন অসুস্থ ছিল এবং এতে তার কোনো হাত ছিল না, কিন্তু আমি এখনও বেশ আতঙ্কে থাকি,' তিনি বলেন। 'আমার মনে হয়, আমি তাকে আর আমার খুব কাছাকাছি আসতে দিতে চাই না। শুধু শারীরিক সম্পর্কই নয়, এমনকি হাত ধরা বা তাকে জড়িয়ে ধরার ক্ষেত্রেও আমার অস্বস্তি কাজ করে।'
এ বিষয়ে চ্যাটজিপিটি'র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর একজন মুখপাত্র বলেছেন: 'এটি একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। যারা এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, আমাদের সমবেদনা তাদের প্রতি।'
তারা আরও জানান, 'ব্যবহারকারীদের মানসিক চরম উৎকণ্ঠা ও অবসাদ শনাক্ত করতে, বিপজ্জনক কথোপকথনগুলো শান্ত করতে এবং ব্যবহারকারীদের বাস্তব দুনিয়ার সাহায্য বা সাপোর্ট নেওয়ার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে আমরা আমাদের মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি।'
তারা বলেন, চ্যাটজিপিটি'র নতুন মডেলগুলো 'সংবেদনশীল মুহূর্তগুলোতে অত্যন্ত শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখায়, যা স্বাধীন গবেষকদের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে এবং এর উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে।'
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান এক্সএআই কোনো সাড়া দেয়নি।
