ওপেন সোর্স প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিককে টেক্কা দিচ্ছে চীনের ‘ঝিপু’
গত বছর ডিপসিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বাজারে এনে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিসহ বিশ্ব প্রযুক্তিখাতে তুমুল আলোড়ন তৈরি করার পর, এবার ঠিক একই ধরনের গুঞ্জন ও বিস্ময় নিয়ে গত সপ্তাহে বাজারে এসেছে চীনের এআই স্টার্টআপ 'ঝিপু'-এর নতুন মডেল 'জিএলএম ৫.২'।
চীনের এই এআই স্টার্টআপের নতুন 'ওপেন সোর্স' (উন্মুক্ত কোডবিশিষ্ট) মডেলটি অন্যান্য সব উন্মুক্ত রিলিজ বা সংস্করণকে পেছনে ফেলে তরতরিয়ে এগিয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের একটি বহুল পর্যবেক্ষিত 'এজেন্টিক বেঞ্চমার্ক'-এ এটি এখন মার্কিন এআই জায়ান্ট অ্যানথ্রোপিক-এর শীর্ষস্থানীয় 'ওপাস ৪.৮' মডেলের চেয়ে মাত্র ১ শতাংশ নম্বর পেছনে রয়েছে। অথচ এটি পরিচালনা করতে খরচ হচ্ছে অ্যানথ্রোপিকের ফ্রন্টিয়ার মডেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ।
বিশ্বজুড়ে ডেভেলপাররা এখন এই মডেলটির দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকছেন। এপিআই প্ল্যাটফর্ম 'ওপেনরাউটার'-এ এই মডেলের টোকেন ব্যবহারের ট্রাফিক গত এপ্রিল মাসে ডিপসিক-এর 'ভি৪' সংস্করণ চালুর সময়ের চেয়েও দ্রুত গতিতে বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকেরা একসময় ডিপসিক-কে কেবল সাময়িক 'চ্যাটবট চমক' বলে উড়িয়ে দিলেও, জিএলএম ৫.২-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এই মডেলটি মূলত পরিকল্পনা তৈরি, কোডিং, টেস্টিং এবং লুপিংয়ের মতো জটিল 'এজেন্টিক' কাজে অত্যন্ত পারদর্শী—যা বিশ্বের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসায়িক কাজ স্বয়ংক্রিয় (অটোমেট) করার জন্য মরিয়া হয়ে ব্যবহার করতে চাইছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেলের ডেটা প্রসেসিং ও জেনারেশনের একক বা 'টোকেন'-এর পেছনে অপ্রত্যাশিত উচ্চ ব্যয়ের মুখে পড়া কোম্পানিগুলো এখন ভাবছে, কীভাবে কম খরচে সবচেয়ে সেরা আউটপুট বা সুবিধা পাওয়া যায়।
ফলে বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক হয়ে উঠছে 'প্রতি ডলারে বুদ্ধিমত্তার পরিমাণ' (ইন্টেলিজেন্স পার ডলার)। আর এই সমীকরণে ঝিপুর কমদামী কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর এই মডেলটি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে একটি আকর্ষণীয় সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এআই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান 'হার্ভি'-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা গেব পেরেইরা সিএনবিসি-কে বলেন, "ওপেন সোর্স প্রযুক্তি কত দ্রুত মার্কিন প্রাতিষ্ঠানিক প্রযুক্তির সমকক্ষ হয়ে উঠছে, তা দেখে আমি বারবার বিস্মিত হচ্ছি। জিএলএম ৫.২-এর মাধ্যমে আমরা এমন প্রথম কোনো মডেল দেখছি, যা আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় ক্লোজড-সোর্স (গোপন কোডবিশিষ্ট) ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর সঙ্গে সত্যিকারের টেক্কা দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।"
তবে কম খরচের এই শোরগোলের আড়ালে আসল যে বিষয়টি আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা হলো বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তিতে 'ওপেন সোর্স'-এর এক যুগান্তকারী উত্থান।
জিএলএম ৫.২ মডেলটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ডাউনলোড করা, নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন (ফাইন-টিউন) করা এবং যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সার্ভারে চালানো সম্ভব। এটি যখন আমেরিকার শীর্ষ এআই ল্যাবগুলোর ওপর দাম কমানোর তীব্র চাপ তৈরি করছে, ঠিক তখনই মার্কিন মডেলগুলোর বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার রাজনৈতিক কারণে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক আদেশের পর অ্যানথ্রোপিক তাদের 'ফেবল মিথোস' শ্রেণির মডেলটি বাজার থেকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে ওপেনএআই গত শুক্রবার ঘোষণা করেছে যে, মার্কিন সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তারা তাদের 'জিপিটি ৫.৬' মডেলগুলোর ব্যবহার বিশ্ববাজারে সীমিত করছে।
মার্কিন সরকারের এই কঠোর নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্ববাজারের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে এখন এমন একটি উন্মুক্ত এআই মডেলকে সবচেয়ে নিরাপদ বা বাজি ধরার মতো মনে হচ্ছে, যা কোনো বিদেশি সরকার চাইলেই হঠাৎ করে রাজনৈতিক কারণে বাতিল বা বন্ধ করে দিতে পারবে না।
