যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে বিশ্বের দ্রুততম সুপারকম্পিউটার এখন চীনের
বিশ্বের দ্রুততম সুপারকম্পিউটারের মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে শীর্ষ স্থান দখল করেছে চীন। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতারই প্রমাণ এই অর্জন।
জার্মানির হামবুর্গে মঙ্গলবার প্রকাশিত ষাণ্মাসিক তালিকা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের 'এল ক্যাপিতান'কে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার সিস্টেমের খেতাব জিতেছে চীনের 'লাইনশাইন'।
সর্বশেষ 'টপ৫০০' তালিকা অনুযায়ী, চীনের শেনঝেন শহরের ন্যাশনাল সুপারকম্পিউটিং সেন্টারে অবস্থিত লাইনশাইন ২.১৯৮ এক্সাফ্লপস পারফরম্যান্স অর্জন করেছে। অর্থাৎ, এটি প্রতি সেকেন্ডে ২ কুইন্টিলিয়নের বেশি হিসাব-নিকাশ করতে সক্ষম। এই গতি যুক্তরাষ্ট্রের এল ক্যাপিতানের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি।
২০১৭ সালে 'সানওয়ে তাইহুলাইট'-এর পর এই প্রথম কোনো চীনা সুপারকম্পিউটার সিস্টেম এই তালিকার শীর্ষে উঠল।
এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার লিভারমোরের লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে থাকা এল ক্যাপিটান শীর্ষ স্থানে ছিল।
নতুন তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির 'ফ্রন্টিয়ার'। এরপর চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে ইলিনয়ের আর্গন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির 'অরোরা' এবং জার্মানির জুলিখ সুপারকম্পিউটিং সেন্টারের 'জুপিটার'।
শীর্ষ ২০-এর তালিকায় থাকা অন্যান্য দেশের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ড।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরও চীনের বাজিমাত
টপ৫০০ তালিকার অন্যতম আয়োজক এবং টেনেসি ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের ইমেরিটাস অধ্যাপক জ্যাক ডংগারা বলেন, সবচেয়ে উন্নত চিপের ওপর মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও 'লাইনশাইন'-এর এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যে চীন উন্নত কম্পিউটিংয়ে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম।
ডংগারা আল জাজিরাকে বলেন, 'রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে কিছু উন্নত যন্ত্রাংশ পেতে চীনের হয়তো দেরি হচ্ছে, কিন্তু এটি তাদের নিজস্ব দেশীয় বিকল্প তৈরি করতে জোরালোভাবে উৎসাহিত করছে।'
তিনি আরও বলেন, চীনের এই শীর্ষস্থান দখলের খবরে তিনি 'পুরোপুরি অবাক হননি'।
তিনি বলেন, 'দীর্ঘ মেয়াদে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো হয়তো চীনের গতি কিছুটা ধীর করবে, তবে প্রযুক্তিগতভাবে স্বনির্ভর হওয়ার জন্য তাদের চেষ্টাকেও ত্বরান্বিত করবে।'
কীভাবে কাজ করে লাইনশাইন?
অন্যান্য সুপারকম্পিউটারের সঙ্গে লাইনশাইন-এর একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। এটি পুরোপুরি সাধারণ কাজের জন্য তৈরি 'সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট' বা সিপিইউ-এর ওপর ভিত্তি করে চলে।
সাধারণত সিপিইউতে প্রসেসিং কোর কম থাকে এবং চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল চালানোর জন্য এগুলো 'গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট' বা জিপিইউ-এর চেয়ে ধীরগতির হয়।
টপ৫০০ তালিকার তথ্যমতে, লাইনশাইনই প্রথম এবং একমাত্র সিস্টেম, যা শুধু সিপিইউ ডিজাইন ব্যবহার করে ২ এক্সাফ্লপসের বেশি পারফরম্যান্স অর্জন করতে পেরেছে।
১৯৯৩ সালে একটি সম্মেলনের প্রস্তুতির জন্য কম্পিউটার বিজ্ঞানী এরিখ স্ট্রোমায়ার এবং হ্যান্স মেউয়ার বিশ্বজুড়ে সুপারকম্পিউটারগুলোর তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। তখন থেকেই বছরে দুবার এই তালিকা প্রকাশ করা হয়।
'লিনপ্যাক বেঞ্চমার্কের' ওপর ভিত্তি করে এই তালিকায় সুপারকম্পিউটারগুলোর সক্ষমতার র্যাংকিং করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে মূলত একটি জটিল লিনিয়ার ইকুয়েশন সমাধান করতে সুপারকম্পিউটারের কত সময় লাগে, তা পরিমাপ করা হয়।
২০১৯ সালে এই তালিকার প্রায় অর্ধেকই ছিল চীনের দখলে। কিন্তু ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই র্যাঙ্কিংয়ে চীনের অংশগ্রহণ কমে গিয়েছিল।
র্যাঙ্কিংয়ের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন
কয়েক দশক ধরে টপ৫০০ তালিকা বেশ প্রভাবশালী হলেও, কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন এআই আসার পর কম্পিউটিং প্রক্রিয়ায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার কারণে এই র্যাঙ্কিংয়ের গুরুত্ব কিছুটা কমেছে।
বর্তমানে মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো করপোরেট প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো এআইয়ের অগ্রগতিতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে। অথচ টপ৫০০ তালিকায় মূলত সরকারি ও একাডেমিক উদ্যোগে তৈরি সুপারকম্পিউটার জায়গা পেয়েছে। এরা স্বেচ্ছায় এই তালিকায় অংশ নিয়েছে।
২০১৫ সালের এক গবেষণাপত্রে কর্নেল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা দাবি করেছিলেন, এল ক্যাপিতান আসলে 'এক্সএআই'-এর কলোসাস সুপারকম্পিউটিং-এর মাত্র ২২ শতাংশ গণনাক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে।
অধ্যাপক ডংগারা বলেন, এই তালিকা কেবল একটি 'বেঞ্চমার্কের' ওপর ভিত্তি করে পারফরম্যান্স মাপে, তাই একে 'প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের সম্পূর্ণ মাপকাঠি' হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তিনি বলেন, 'বৈজ্ঞানিক প্রয়োগের ক্ষমতা, জ্বালানি সাশ্রয়, সফটওয়্যারের মান, নির্ভরযোগ্যতা, ব্যবহারের সহজতা এবং বৃহৎ একটি গবেষক সম্প্রদায়কে সাহায্য করার ক্ষমতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।'
কম্পিউটিং শিল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'ইন্টারসেক্ট৩৬০ রিসার্চ'-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যাডিসন স্নেল বলেন, লাইনশাইনের সক্ষমতা নিয়ে তিনি অবাক হননি। তবে চীনা ডেভেলপাররা যে আবারও এই র্যাঙ্কিংয়ে অংশ নেওয়া শুরু করেছে, সেটাই সবচেয়ে লক্ষণীয়।
স্নেল আল জাজিরাকে বলেন, 'বিশ্বের শীর্ষ সুপারকম্পিউটার হিসেবে লাইনশাইনের স্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং জাপানের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। কারণ দেশগুলো এআইয়ে আধিপত্য বিস্তারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রযুক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বজুড়ে এগিয়ে আছে, তবে ব্যবধানটা খুব একটা বেশি নয়। বিবর্তনের এই দ্রুত গতির কারণে বৈশ্বিক চিত্র খুব তাড়াতাড়ি বদলে যেতে পারে। সুপারকম্পিউটিং এবং এআই-এর ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো "ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব"। প্রতিটি অঞ্চলই এখন নিজস্ব সম্পদ এবং সক্ষমতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।'
এআইয়ের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এখন তীব্র লড়াইয়ে মেতেছে। একে অপরের অগ্রগতি ঠেকাতে ওয়াশিংটন ও বেইজিং পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
গত এপ্রিলে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত '২০২৬ এআই ইনডেক্স রিপোর্ট' অনুযায়ী, এআই মডেল পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবধান 'কার্যত কমিয়ে এনেছে' চীন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে বেশি উন্নত এআই মডেল তৈরি করছে, সেখানে পেটেন্ট তৈরি এবং শিল্পক্ষেত্রে রোবট স্থাপনের দিক থেকে চীন এগিয়ে রয়েছে।
