অসহনীয় গরমেও ইউরোপে এসির ব্যবহার এত কম কেন?
ইউরোপে দিন দিন তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ছে। এতে মহাদেশটির কোটি কোটি মানুষ রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রচণ্ড এই গরমে স্বস্তির তেমন কোনো উপায় নেই। ইউরোপের বাড়িগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির ব্যবহার খুবই কম। সেখানকার বেশির ভাগ বাসিন্দা বৈদ্যুতিক পাখা, বরফ বা ঠান্ডা পানিতে গোসল করে গরম কাটানোর চেষ্টা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িতে এসি থাকলেও ইউরোপে এই হার মাত্র ২০ শতাংশের কাছাকাছি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন অনেক আগেভাগেই তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হচ্ছে। এর ফলে মৃত্যুর হারও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্পদশালী ইউরোপীয় দেশগুলো কেন এসি ব্যবহারে অনীহা দেখাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রয়োজনহীনতা ও উচ্চ ব্যয়
ইউরোপের অনেক দেশে ঐতিহাসিকভাবে ঘর ঠান্ডা করার তেমন কোনো প্রয়োজন ছিল না। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের দেশগুলোতে আগে তাপপ্রবাহ হলেও তা বর্তমানের মতো ভয়াবহ বা দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) জ্বালানি দক্ষতা বিভাগের প্রধান ব্রায়ান মাদারওয়ে বলেন, 'ইউরোপে এসির ব্যবহারের কোনো ঐতিহ্য নেই। কারণ সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত এর কোনো বড় প্রয়োজন ছিল না।'
ইউরোপে এসিকে প্রয়োজনের বদলে বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়। এটি কেনা এবং চালানোও বেশ ব্যয়বহুল। অনেক ইউরোপীয় দেশে বিদ্যুতের দাম যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি, অথচ মানুষের আয় সে তুলনায় কম। ফলে এসির খরচ মেটানো অনেক ইউরোপীয়র জন্য কঠিন।
স্থাপত্যশৈলী ও পুরনো ভবন
দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর পুরনো ভবনগুলো গরমের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল। সেগুলোর পুরু দেয়াল ও ছোট জানালা সরাসরি রোদ আটকায় এবং বাতাস চলাচলে সাহায্য করে। এতে ঘর ঠান্ডা থাকে এবং কৃত্রিম শীতলীকরণের প্রয়োজন কম হয়।
তবে মহাদেশের অন্য অংশের বাড়িগুলো গরমের কথা ভেবে বানানো হয়নি।
ইউরোপের অনেক ভবনই বেশ পুরনো এবং এসি প্রযুক্তি জনপ্রিয় হওয়ার আগে তৈরি। ইংল্যান্ডে প্রতি ছয়টি বাড়ির একটি ১৯০০ সালের আগে নির্মিত। ব্রায়ান মাদারওয়ে বলেন, এসব পুরনো বাড়িতে এসির কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা বসানো অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
আইনি বাধা ও নীতিগত সমস্যা
যুক্তরাজ্যভিত্তিক 'এয়ার কন্ডিশনিং কোম্পানি'র পরিচালক রিচার্ড স্যামন বলেন, অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এসির অনুমোদন পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী এলাকা বা সংরক্ষিত ভবনের বাইরের দিকে এসি বসলে দৃশ্যপট নষ্ট হতে পারে—এমন অজুহাতে কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয় না।
এছাড়া পরিবেশগত নীতিমালার বিষয়টিও রয়েছে। ইউরোপ ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এসির ব্যবহার বাড়লে এই লক্ষ্য পূরণ কঠিন হতে পারে। এসি প্রচুর বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি বাইরের গরম বাতাস আরও বাড়িয়ে দেয়। প্যারিসে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসির কারণে বাইরের তাপমাত্রা ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর জন্য এই প্রভাব বেশ ক্ষতিকর।
জ্বালানি বাঁচাতে ২০২২ সালে স্পেন একটি নিয়ম চালু করেছে। এর ফলে সরকারি জায়গাগুলোতে এসির তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা নিষিদ্ধ।
দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
ইউরোপ এখন বিশ্বের অন্য অঞ্চলের চেয়ে দ্বিগুণ দ্রুতগতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে। ফলে এসির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বদলাতে শুরু করেছে। এখন ইউরোপের দেশগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, হয় তারা পরিবেশের ক্ষতি করে এসি ব্যবহার করবে, নয়তো গরম মোকাবিলায় বিকল্প কোনো পথ খুঁজবে।
ইউকে গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের পরিচালক ইয়েতুন্দে আব্দুল বলেন, 'বাড়িগুলোকে কেবল ঠান্ডার জন্য নয়, বরং তীব্র গরম মোকাবিলায় সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে।'
আইইএ-র প্রতিবেদন বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে এসির সংখ্যা বেড়ে ২৭৫ মিলিয়নে পৌঁছাতে পারে, যা ২০১৯ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। রিচার্ড স্যামন জানান, গত পাঁচ বছরে বাসাবাড়িতে এসির চাহিদা তিন গুণের বেশি বেড়েছে।
তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাধিকা খোসলা সতর্ক করেছেন যে এসি ব্যবহারের ফলে একটি 'দুষ্টচক্র' তৈরি হতে পারে। এসি জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে চালানো হয়, যা পরিবেশকে আরও গরম করে তোলে।
ব্রায়ান মাদারওয়ে বলেন, চরম গরম ও স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে এসির প্রতি মানুষের মানসিকতা অবশ্যই বদলাবে। তবে এসির কারণে যাতে জলবায়ুর বড় ক্ষতি না হয়, তার জন্য কড়া নিয়ম প্রণয়ন জরুরি। কারণ প্রতিটি এসি আগামী এক বা দুই দশকের জন্য কার্বন নিঃসরণের পথ তৈরি করে দেয়। তাই শুরুতেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
