ভঙ্গুর একটি যুদ্ধবিরতি ধরে রাখতে বাধা: বহু পক্ষ, বহু ক্ষোভের জটিল বাস্তবতা
২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল সকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে "একটি পুরো সভ্যতাকে ধ্বংস" করার হুমকি দেওয়া থেকে শুরু করে একই দিনেই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার দিকে দ্রুত ও নাটকীয় মোড়—এই পরিবর্তন বহু পর্যবেক্ষকের কাছে যেন হঠাৎ ধাক্কার মতো লেগেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না, কিংবা ভবিষ্যৎ কীভাবে গড়বে—তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এখন পর্যন্ত সংঘাতের গতিপ্রকৃতি স্বল্পমেয়াদে একাধিক দুর্বলতা এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে অঞ্চলটির জন্য বহু নেতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইতোমধ্যেই যুদ্ধবিরতিতে টানাপোড়েনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। চুক্তির ব্যাখ্যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে—বিশেষ করে ইসরায়ল-লেবাননের যুদ্ধ এতে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না তা নিয়ে রয়েছে ঘোর দ্বিমত।
ইরান এবং প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান বলেছে, এটি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—যারা মার্কিন চুক্তি মানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—বলেছে, তা নয়। বাস্তবতাও সেই দিকেই ইঙ্গিত করে: যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার একদিন পরই ইসরায়েল লেবাননে এ পর্যন্ত সবচেয়ে তীব্র বোমাবর্ষণ চালায়।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির একজন গবেষক হিসেবে আমি মনে করি, এতগুলো সরকার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা—আলোচনা প্রক্রিয়া এবং সংঘাতের আঞ্চলিক প্রভাব উভয় ক্ষেত্রেই—যুদ্ধবিরতি ধরে রাখাকে আরও কঠিন করে তোলে।
গত এক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক জোটের বিন্যাসে পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে অনেক দেশ আরও আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে এবং ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও গভীর হয়েছে।
বর্তমান যুদ্ধ এই প্রবণতাকে আরও উসকে দিচ্ছে—প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে এবং সরকার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রতিপক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তারের নতুন সুযোগ দিচ্ছে।
বর্তমান বাস্তবতা এটিও তুলে ধরে যে, কূটনীতির পরিবর্তে যুদ্ধকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপ—এক দীর্ঘ সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাস, পরাশক্তির প্রতিযোগিতা এবং গভীর রাজনৈতিক বিভাজনে জর্জরিত এই অঞ্চলে—সংঘাত সমাধানকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আঞ্চলিক বিভাজনের রেখা
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল—এটি কত দ্রুত ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত হয়েছে এবং কত দ্রুত বিভিন্ন পক্ষ এতে জড়িয়ে পড়েছে।
মূল তিন পক্ষ—ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—তিন দেশই নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট, মেরুকরণ এবং বৈধতার প্রশ্নের মুখে রয়েছে।
বাইরের দেশগুলো—যেমন চীন, রাশিয়া এবং পাকিস্তান—নিজ নিজ কৌশলগত স্বার্থ ও কূটনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পরোক্ষভাবে এতে যুক্ত হয়েছে।
সংঘাতটি আরও টেনে এনেছে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি ও গোষ্ঠীকে—সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে শুরু করে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিদের পর্যন্ত।
এসবই দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
এদিকে আরব বিশ্বে জনমত দেখাচ্ছে—এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমেছে।
যুদ্ধের মানবিক মূল্যও কম নয়। এতে ইতোমধ্যে ১,২০০-এর বেশি ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, ৩২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং ইরানের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
একই সঙ্গে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে, আর ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে দুই ডজনের বেশি প্রাণহানি ঘটেছে।
লেবাননের পরিস্থিতিও ভয়াবহ—মার্চের শুরু থেকে সেখানে ১,৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
অস্থিতিশীলতার রাজনীতি
ইয়েমেনের হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠী—যারা যুদ্ধের শুরুতে তুলনামূলকভাবে নীরব ছিল—এই অঞ্চলের জটিল ও বিভক্ত বাস্তবতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
শিয়া ইসলামের জায়দি ধারার অনুসারী এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী দখল করে। ২০১৫ সাল থেকে তারা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক অভিযানেরও লক্ষ্যবস্তু।
এর ফলে তারা আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে তেহরানের সঙ্গে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে অতর্কিত এক হামলা চালায়। এরপর হামাসকে নির্মুল করার সামরিক অভিযানের নামে গাজা উপত্যকায় যখন গণহত্যা শুরু করে ইহুদিবাদী রাষ্ট্র— তখন ইসরায়েলের ঘোষিত বিরোধী এই গোষ্ঠীও যুদ্ধ ঘোষণা করে।
২০২৪ সালে তারা লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালি সংলগ্ন এলাকায় জাহাজ চলাচলে হামলা চালায়—যা বর্তমান সংকটে ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের একটি ক্ষুদ্র পূর্বাভাসই হয়তো ছিল।
এই অভিযানের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক জোট গঠিত হয় এবং হুথিদের ওপর ব্যাপক সামরিক হামলা চালানো হয়। পরে ২০২৫ সালের মে মাসে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়।
তবে এর পেছনের আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ সংকট কখনোই পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হুথিরা আবারও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে—২৮ মার্চ তারা ইসরায়েলে হামলা চালায়।
তারা লোহিত সাগরে হামলা থেকে বিরত থাকলেও বর্তমানে যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে। তবে এই যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও ইরানের সঙ্গে জোটের প্রতিশ্রুতি পুনরায় তুলে ধরেছে।
এখন হুথিরা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় 'স্পয়লার' বা বিঘ্ন সৃষ্টিকারীর ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হতে পারে।
কূটনীতি এড়ানোর মূল্য
অবশ্য হুথিরা একমাত্র গোষ্ঠী নয় যারা ইরান যুদ্ধকে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখছে।
যেভাবে তারা এবং তাদের প্রতিপক্ষরা এই সংঘাতকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বৈধতা ও কৌশলগত সুবিধা বাড়াতে ব্যবহার করছে, একইভাবে ইরান যুদ্ধের প্রধান পক্ষগুলো—ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র—নিজেদের পুরোনো আক্রোশ নিয়ে আবারও যুদ্ধক্ষেত্রে লড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্যও অনেকটাই অস্পষ্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কখনো সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য, কখনো ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানোর লক্ষ্য সামনে এনেছে।
এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে যুদ্ধবিরতিকে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক চুক্তিতে রূপ দেওয়ার আলোচনা ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থেকে বিরত রাখতে পারবে। বরং আলোচনার কাঠামোর একটি বিতর্কিত দিক হলো—ইরানের এই অধিকারকে আংশিকভাবে মেনে নেওয়া।
২০১৮ সালে ট্রাম্প জয়েন্ট কম্প্রেহেন্সিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ওই চুক্তিতে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করার মতো শর্তে সম্মত হয়েছিল, যাতে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ বন্ধ থাকে।
এছাড়া ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শনও মেনে চলছিল। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পরই তেহরান আবার ইউরেনিয়াম মজুদ ও সমৃদ্ধকরণ শুরু করে।
২০২০ সালে প্রকাশিত তার বই 'নট ফর দ্য ফেইন্ট অব হার্ট'-এ সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অয়েন্ডি শেরম্যান দেখিয়েছেন, এ ধরনের বহুপাক্ষিক আলোচনা কতটা জটিল ও সংবেদনশীল হতে পারে।
তবে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ ইঙ্গিত দেয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের "দ্রুত আঘাত-নির্ভর" নীতি গুরুতর ঝুঁকি ও মূল্য বহন করে।
অস্পষ্ট লক্ষ্য, দুর্বল কৌশল এবং উচ্চ মানবিক ক্ষতির এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্য আগের চেয়ে অনেক বেশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। ফলে এখন যখন কূটনীতি আবার আলোচনায় ফিরে এসেছে, তখন দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল শান্তির পথ আরও কঠিন হয়ে গেছে।
লেখক: ইয়োনা এমি মাতেসান যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েসলিয়ান ইউনিভার্সিটির সরকারবিষয়ক অধ্যয়নের সহযোগী অধ্যাপক।
