গাবতলী হাটে পশুর দামে ধস: অবিক্রীত গরু নিয়ে ফেরার শঙ্কায় বিক্রেতারা, স্বস্তিতে ক্রেতা
পবিত্র ঈদুল আজহার শেষ মুহূর্তে রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটে পশুর পর্যাপ্ত জোগান থাকলেও ক্রেতা সংকটে দামের বড় ধরনের ধস নেমেছে। গরুর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় ব্যাপারী ও খামারিরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে, দাম কিছুটা কমায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা।
বুধবার (২৭ মে) দুপুর ১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত হাট ঘুরে দেখা গেছে, পুরো হাটজুড়েই পর্যাপ্ত পশুর মজুত রয়েছে। তবে সকাল থেকেই কেনাবেচায় ভিন্ন চিত্র লক্ষ করা গেছে। বিক্রেতা ও হাটের শ্রমিকরা জানিয়েছেন, আজ ভোর ৬টার পর থেকেই গরুর দাম কমতে শুরু করেছে।
মেহেরপুর থেকে তিন দিন আগে ২৪টি গরু নিয়ে হাটে এসেছিলেন এক বিক্রেতা। এখন পর্যন্ত তাঁর ৫টি গরু অবিক্রিত রয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "বড় গরুগুলো আগে ৩ লাখ টাকা করে বিক্রি করেছিলাম, তাতে সব মিলিয়ে সমান সমান (ব্রেক ইভেন) হয়েছিল। কিন্তু এখন যে ৫টি আছে, সেগুলোর দাম ক্রেতারা ২ লাখও বলতে চায় না। শঙ্কায় আছি এগুলো বিক্রি করতে পারব কি না। গাবতলী হাটে আর আসব না। বাড়িতে সন্তান ও পরিবার আছে, ভেবেছিলাম ঈদের আগের দিন সব বিক্রি করে বাড়ি চলে যাব।"
একইভাবে গতকাল ৯টি গরু নিয়ে আসা মোহাম্মদ বিল্লাল বলেন, "সাড়ে ৫ মণ ওজনের গরুর দাম ক্রেতারা বলছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা, অথচ এর বাজার মূল্য অন্তত ২ লাখ টাকা। এমন দাম হলে বিক্রি না করে খামারে ফেরত নিয়ে যাব। পরিবহন খরচ, হাটের জায়গা ভাড়া ও শ্রমিক খরচ মিলে প্রায় ২ লাখ টাকা লস হবে।"
মানিকগঞ্জ থেকে ৩টি গরু কিনে বিক্রির জন্য আনা নুরুল ইসলাম জানান, ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা দিয়ে কেনা গরুর দাম হাটে ১ লাখ টাকা বলা হচ্ছে। হাটে গরুর জোগান অনেক বেশি হলেও সে তুলনায় ক্রেতা নেই বলে জানান তিনি।
হাটে ট্রাকে গরু ওঠানোর কাজ করা শ্রমিক আব্দুল মতিন বলেন, "একদিন আগে যে গরু ৩ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে, আজ তা ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভোর ৬টার পর থেকেই দাম কমেছে।"
বিপরীতে ক্রেতারা পছন্দের পশু তুলনামূলক কম দামে কিনতে পেরে আনন্দিত। কেরানীগঞ্জ থেকে আসা নিহাল হোসেন বিকেল ৪টার দিকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছেন। দাম পরিশোধের সময় খুশিতে তিনি বলেন, "ভাই, জিতেছি। দাম একদম রিজনেবল (যৌক্তিক)।" তবে ওই গরুর বিক্রেতা জানান, বাড়িতে ফেরত নেওয়ার খরচ বাঁচাতে তিনি ১৩ হাজার টাকা লোকসানে গরুটি বিক্রি করেছেন।
লাল রঙের ষাঁড় ৯০ হাজার টাকায় কেনা মোহাম্মদ আবুল কাশেম বলেন, "দাম ঠিকই আছে, বেশি নয়। গত বছরের চেয়েও দাম কম মনে হয়েছে।"
হাটের ভেতরে ক্রেতা কম থাকায় কিছু বিক্রেতাকে গেটের সামনে একটি করে গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এমনই একজন বিক্রেতা হামিদুর বলেন, "ভেতরে আরও ২টি গরু আছে, কিন্তু এখানে একটি নিয়ে এসেছি যাতে কোনো ক্রেতার নজরে পড়ে।"
দীর্ঘ তিন বছর ধরে গরুর ব্যবসা করা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, "নির্বাচনের পর এটি প্রথম কোরবানি। অনেকে নাড়ির টানে গ্রামের বাড়িতে কোরবানি দিতে চলে গেছেন। একারণেই হয়তো ঢাকায় ক্রেতার সংখ্যা কম মনে হচ্ছে।"
ব্যবসায়ী ও ইজারাদাররা আশা করছেন, রাতের মধ্যে অবিক্রিত পশুগুলো বিক্রি হয়ে যাবে, তবে বড় অংকের লোকসানের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে বিক্রেতাদের মনে।
