আমদানি-নির্ভরতা কমাতে ১০ হাজার কোটি টাকার ফ্ল্যাট স্টিল কারখানার পরিকল্পনা বিএসআরএমের
বাংলাদেশের বৃহত্তম ইস্পাত-পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান-বিএসআরএম দেশের প্রথম সমন্বিত হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিল উৎপাদন কারখানা স্থাপনে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্প উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে, প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার আমদানিকৃত পণ্যের বিকল্প উৎস হয়ে উঠবে।
চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা হবে ১৫ লাখ টন। এখানে মূলত হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিল, মাইল্ড স্টিল এবং স্টেইনলেস স্টিল- এর মতো পণ্য উৎপাদিত হবে। বর্তমানে দেশের অবকাঠামো, ভারী প্রকৌশল এবং উৎপাদন খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা থাকা সত্ত্বেও— হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিল সম্পূর্ণভাবে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট শিল্পের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রতি বছর ১৪ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার ফ্ল্যাট স্টিল আমদানি করে। বিএসআরএম জানিয়েছে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু হলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ অনেকটা কমাবে, সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করবে এবং দেশে একটি মৌলিক আপস্ট্রিম ইস্পাত উৎপাদন-ভিত্তি গড়ে তুলবে।
কোম্পানিটির কর্মকর্তারা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, এরমধ্যে জমি অধিগ্রহণ ও সেখানে উন্নয়ন কাজ উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে। কারখানাটিতে আধুনিক ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস (বিদ্যুৎ-চালিত চুল্লি) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এটি সনাতন গ্যাস-চালিত ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎশক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হবে; যা জ্বালানি দক্ষতা বাড়াবে, কার্বন নির্গমন হ্রাস করবে এবং পরিচালন ব্যয়ও কমিয়ে আনবে।
এই বিনিয়োগ প্রস্তাবটি সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। পুঁজিঘন বা মূলধনের ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন এই প্রকল্পটিকে বাণিজ্যিকভাবে টেকসই করতে বিএসআরএম সরকারের কাছে দীর্ঘমেয়াদী নীতি সহায়তা এবং সীমিত হারে শুল্ক সুরক্ষার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।
এই বিনিয়োগের বড় অংশই স্থানীয় ব্যাংকগুলোর একটি কনসোর্টিয়াম (ব্যাংক জোট) এবং বিএসআরএম-এর নিজস্ব ইক্যুইটির মাধ্যমে অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোম্পানির কর্মকর্তারা অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট কাঠামো প্রকাশ করতে রাজি হননি।
বিএসআরএম-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিল, মাইল্ড স্টিল ও স্টেইনলেস স্টিলের বার্ষিক চাহিদা বর্তমানে ২০ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। যার পুরোটাই চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশীয়ভাবে এই পণ্যগুলো উৎপাদিত হলে– তা সরবরাহ শৃঙ্খলের সময় এবং ডাউনস্ট্রিম প্রস্তুতকারকদের (যারা ইস্পাতকে প্রক্রিয়াজাত করে চূড়ান্ত পণ্য তৈরি করে) লজিস্টিক ব্যয় অনেক কমিয়ে আনবে। বর্তমানে যাদেরকে ডেলিভারি পেতে দীর্ঘ সময় বিলম্বের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
১,৭০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রায় স্টিল বিলেট উত্তপ্ত করার পর রোলিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিট, প্লেট এবং ফ্ল্যাট বারে রূপান্তর করে তৈরি করা হয় হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিল। আর মাইল্ড স্টিল মূলত কাঠামোগত ফ্রেম, রিইনফোর্সিং বার, মোটরগাড়ির যন্ত্রাংশ ও শিল্প যন্ত্রপাতিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে স্টেইনলেস স্টিল রান্নাঘরের সরঞ্জাম, চিকিৎসা সরঞ্জাম, রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট, পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন স্থাপত্যকর্মে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান।
এসব পণ্য বহুতল ভবন, সেতু, রেলওয়ে অবকাঠামো, জাহাজ নির্মাণ এবং ভারী প্রকৌশল প্রকল্পের মতো বৃহৎ উদ্যোগগুলোর প্রধান কাঁচামাল। অর্থাৎ, এগুলো শিল্পায়ন ও উন্নত উৎপাদন খাতের জন্য কেন্দ্রীয় গুরুত্ব রাখে।
কর্মসংস্থান ও শিল্প সম্প্রসারণ
বিএসআরএম গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) তপন সেনগুপ্ত বলেন, "আমরা ইতিমধ্যেই মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু করেছি। ভূমি উন্নয়ন শেষ হলে এবং সরকার থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সামগ্রিক বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকলে, মূল নির্মাণ কাজ শুরু হবে।"
তিনি বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি এটি প্রকৌশল, জাহাজ নির্মাণ, ভারী শিল্প, রেলওয়ে প্রকল্প, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ এবং বৃহৎ আকারের অবকাঠামো নির্মাণ খাতের সম্প্রসারণকে সমর্থন করবে।
তপন সেনগুপ্ত আরও বলেন, নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর [নতুন কারখানাটিতে] তিন বছরের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হতে পারে। তবে জ্বালানি সংকটের উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত কারখানায় বিদ্যুৎ ব্যবহার সর্বনিম্ন রাখতে অত্যাধুনিক জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
বিএসআরএম গ্রুপের ডিএমডি আরও জানান, অর্থমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে তারা জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। "অর্থমন্ত্রী আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, সরকার জ্বালানি সরবরাহসহ অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আশাবাদী যে কারখানাটির কাজ শেষ হওয়ার মধ্যেই পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো প্রস্তুত হয়ে যাবে।"
শুল্ক সুরক্ষার দাবি
এই প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বিএসআরএম সরকারের কাছে আমদানিকৃত হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিলের ওপর ১০ বছরের জন্য অতিরিক্ত ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের দাবি জানিয়েছে।
কোম্পানির যুক্তি, সমন্বিত ফ্ল্যাট স্টিল উৎপাদনের জন্য ডাউনস্ট্রিম রোলিং বা স্রেফ প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমের চেয়ে অনেক বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। তাই সুনির্দিষ্ট নীতিগত নিশ্চয়তা ছাড়া ঋণদাতারা এ ধরনের বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করতে আগ্রহ দেখান না।
বিএসআরএম-এর হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স সৌমিত্র কুমার মুৎসুদ্দী বলেন, নতুন এই কারখানার প্রস্তাবটি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, "সবাই এ বিনিয়োগের কৌশলগত গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। তবে ব্যাংকগুলো এই আকারের প্রকল্পে অর্থায়নের আগে দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত স্থায়িত্ব চায়।"
তবে এই প্রস্তাবটি সরকারের মধ্যে বাজার একচেটিয়াকরণের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আলোচনার বিষয়ে অবহিত সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, দেশের একমাত্র সমন্বিত ফ্ল্যাট স্টিল উৎপাদনকারীকে শুল্ক সুরক্ষা দিলে তা বাজারে কোনো একচেটিয়া সুবিধা বা মনোপলি তৈরির ঝুঁকি তৈরি করবে কি না— অর্থমন্ত্রী সে প্রশ্নও তুলেছেন।
কর্মকর্তারা জানান, মন্ত্রী বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখার পাশাপাশি ডাউনস্ট্রিম উৎপাদনকারী ও সাধারণ ভোক্তাদের সম্ভাব্য দামের কারসাজি থেকে রক্ষা করার ওপর জোর দিয়েছেন।
তবে বিএসআরএম যুক্তি দেখিয়েছে যে, এতে আমদানিকৃত হট-রোল্ড স্টিল পণ্য বাজারে আসা বন্ধ হবে না। আর প্রস্তাবিত সম্পূরক শুল্ক কেবল আমদানিকৃত পণ্যের সাথে দেশীয় উৎপাদনের প্রতিযোগিতামূলক ব্যবধান কমিয়ে আনবে। কোম্পানির প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের ফলে ডাউনস্ট্রিম প্রস্তুতকারকদের উৎপাদন ব্যয় মাত্র ৬ শতাংশ বাড়তে পারে। কিন্তু, এটি বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী দেশীয় আপস্ট্রিম ইস্পাত শিল্প গড়ে তুলতে সহায়তাও করবে।
কোম্পানিটি আরও যোগ করেছে, ভবিষ্যতে অন্য কোনো বিনিয়োগকারী একই ধরনের কারখানা স্থাপন করলে—তারাও একই ধরনের কর বা শুল্ক সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন।
ইস্পাত শিল্পে কৌশলগত রূপান্তর
এই বিনিয়োগটি বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পের জন্য একটি কৌশলগত পরিবর্তনের বড় ইঙ্গিত। গত দুই দশক ধরে মূলত নির্মাণ-গ্রেডের লং স্টিল (যেমন রড) পণ্যের ওপর মনোনিবেশ করলেও— দেশের শিল্প খাত এখন ধীরে ধীরে উচ্চ-মূল্যের পণ্য উৎপাদনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
শিল্প বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে তা ডাউনস্ট্রিম প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে সমন্বিত ইস্পাত উৎপাদনের দিকে একটি কাঠামোগত রূপান্তরকে তুলে ধরবে, যা আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশকে স্থানীয়ভাবে উচ্চ-মূল্যের শিল্প কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অনেক ফিনিশড স্টিল প্রোডাক্টের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক বজায় রাখা সত্ত্বেও— সম্পূর্ণভাবে আমদানিকৃত হট-রোল্ড ফ্ল্যাট স্টিলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু হলে, এটি সম্পূর্ণ ইস্পাত শিল্পের ভ্যালু-চেইনকে শক্তিশালী করবে।
১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএসআরএম বাংলাদেশের সংগঠিত নির্মাণশিল্পের ইস্পাত বাজারের প্রায় ৩৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। চট্টগ্রাম-ভিত্তিক এই গ্রুপের বার্ষিক ইস্পাত গলানোর সক্ষমতা ২৩ লাখ টন এবং রোলিং ক্ষমতা ১৬ লাখ টন। তারা টিএমটি রিবার, বিলেট, ক্যাবল পণ্য ও কাঠামোগত ইস্পাত (স্ট্রাকচারাল স্টিল) উৎপাদন করে, যা দেশের অনেক বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়েছে।
কোম্পানিটির বার্ষিক রাজস্ব সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। তাদের উৎপাদিত পণ্যগুলো বিডিএস আইএসও, এএসটিএম এবং ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রত্যয়িত।
