বিক্রির পতন ও আকাশছোঁয়া ব্যয়ে আরও গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে আবাসন খাত
নির্মাণসামগ্রীর আকাশচুম্বী বাজারদর, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত এবং লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের আবাসন বাজার এক দীর্ঘমেয়াদি মন্দার গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে একদিকে যেমন ক্রেতাদের আস্থা কমছে, অন্যদিকে ডেভেলপারদের নির্মাণ কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)-এর সঙ্গে আলাপকালে খাত-সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন যে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফ্ল্যাটের সরকারিভাবে নির্ধারিত মূল্যের ওপর যে নতুন ১৫ শতাংশ মূলধনি মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) আরোপ করা হয়েছে, তা এই খাতের গতিকে আরও শ্লথ করে দেবে। আবাসন খাতের এই নতুন নিম্নমুখী প্রবণতা এখন সরকারি নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন তথ্যেও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
পরিসংখ্যানে মন্দার চিত্র
নিবন্ধন অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) সারাদেশে ফ্ল্যাট হস্তান্তর চুক্তি বা দলিল নিবন্ধন হয়েছে মাত্র ৪১,৮০৪টি, যেখানে অ্যাপার্টমেন্টগুলোর ঘোষিত মূল্য ছিল প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এই লেনদেনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ—অর্থাৎ ২৯,৯১৩টি ফ্ল্যাট নিবন্ধিত হয়েছে রাজধানী ঢাকায়।
বছরের প্রথম ছয় মাসের এই পারফরম্যান্স ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইতোমধ্যেই সংকটে থাকা এই খাতের জন্য সামনে আরও একটি আশঙ্কাজনক বছর অপেক্ষা করছে।
২০২৫ সালের অর্ধ-বার্ষিক গড়ের তুলনায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ফ্ল্যাট নিবন্ধন কমেছে ১৯.৬১ শতাংশ। আগের বছরগুলোর তুলনায় এই সংকোচনের হার আরও তীব্র: ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় বিক্রি কমেছে ২৫.৩৫ শতাংশ এবং ২০২৩ সালের জানুয়ারি-জুনের তুলনায় কমেছে ৪২.৭৩ শতাংশ। এটি আবাসন বাজারের পতনের গভীরতা ও দ্রুত গতিকেই নির্দেশ করে।
ফ্ল্যাট কেনাবেচা বা লেনদেনের এই ধসের কারণে সরকারের রাজস্ব আয়েও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
উল্লেখ্য, দেশব্যাপী ফ্ল্যাট নিবন্ধন ২০২৩ সালে ১ লাখ ৪৬ হাজার (যার বাজারমূল্য দেখানো হয়েছে ১ লাখ কোটি টাকা) থেকে কমে ২০২৪ সালে ১ লাখ ১২ হাজার (বাজারমূল্য ৭৯ হাজার কোটি টাকা) এবং ২০২৫ সালে ১ লাখ ৪ হাজারটিতে ( বাজারমূল্য ৬১ কোটি টাকায়) নেমে আসে।
ফ্ল্যাট কেনাবেচায় এই ধসের কারণে সরকারের রাজস্ব আয়েও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (নিবন্ধন) নিপেন্দ্র নাথ সিকদার নিশ্চিত করেছেন যে, ফ্ল্যাট নিবন্ধন মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার কারণে সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। তবে ফ্ল্যাট নিবন্ধন থেকে নির্দিষ্টভাবে ঠিক কত রাজস্ব কমেছে, সেটি তিনি জানাননি।
রুদ্ধ পাইপলাইন ও ভেস্তে যাওয়া চুক্তি
এই কাঠামোগত মন্দা আবাসন শিল্পের ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলোর গতিও রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন- রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি কামাল মাহমুদ জানান, ডেভেলপাররা এখন জমির মালিকদের সাথে যৌথ-উদ্যোগ চুক্তি অনেক কম করছেন। এছাড়া প্রকল্পগুলো আর্থিকভাবে অলাভজনক হয়ে পড়ায় বিদ্যমান অনেক চুক্তিও বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
রিহ্যাব-এর একজন কর্মকর্তার তথ্যমতে, ২০২৫ সালে প্রায় এক হাজার চুক্তি বাতিল হওয়ার পর, চলতি বছরের প্রথমার্ধে শুধুমাত্র ঢাকাতেই জমির মালিক ও ডেভেলপারদের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রায় ৪৫০টি চুক্তি বাতিল হয়েছে। বাড়তি মাথাব্যথা হিসেবে রয়েছে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের কাছ থেকে রিহ্যাবের কাছে আসা ১,৬০০টি অমীমাংসিত অভিযোগ, এসব ক্রেতারা অর্থ পরিশোধ করলেও এখনো ফ্ল্যাটের মালিকানা বুঝে পাননি।
আকাশছোঁয়া খরচ ও স্থবির সাইট
ডেলেপাররা জানাচ্ছেন যে, ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারি এবং পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে প্রধান প্রধান নির্মাণসামগ্রীর দাম ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট ৫৪০ থেকে ৫৮০ টাকায় খুচরা বিক্রি হচ্ছে, আর প্রতি টন এমএস রডের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫,০০০ থেকে ১ লাখ টাকা।
ইস্পাতপণ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম গ্রুপের পরিচালক (বিক্রয় ও বিপণন) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, "কাঁচামাল সরবরাহে সংকটের কারণে রডের দাম প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া ও আমদানি খরচ বেড়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া নতুন বাজেটে অত্যাবশ্যকীয় নির্মাণ সামগ্রীর ওপর যে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি বা নিয়ন্ত্রক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তা বাজারের দামকে আরও উপরে ঠেলে দিয়েছে।"
অবশ্য বিএসআরএম-এর মতো প্রধান ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, দেশের বাজারে রডের সামগ্রিক চাহিদা স্থিতিশীল রয়েছে। তবে তাদের মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠান আগে যে পরিমান রড ক্রয় করতো, সেটি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কিন্তু, ব্যক্তি উদ্যোগের নির্মাণকাজে এখন রডের চাহিদা ভালো আছে।
এই চলমান সংকটের কারণে মাঝারি ও ছোট ডেভেলপাররা তাদের প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করতে পারছে না। রাজধানীর দক্ষিণ বারিধারায় 'রূপসী বিল্ডার্স' ২০২৪ সালের শুরুতে, তাদের দুটি প্রকল্পের অধীনে পরিকল্পিত ৪৮টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ২২টির বিক্রয় চুক্তি সম্পন্ন করেছিল। তবে মাত্র তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাই করার পর নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, কারণ বাকি ২৬টি ফ্ল্যাট আর বিক্রি করা সম্ভব হয়নি।
রূপসী বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহুরুল আহসান রোজ বলেন, "গ্রাহকদের কাছ থেকে চুক্তির যে টাকা পেয়েছি, সেটি ইনভেস্ট করে যতটুকু সম্ভব প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়েছি। জমির মালিকদের সাথে চুক্তি অনুযায়ী, কোম্পানি যে কয়টি অ্যাপার্টমেন্ট পাবে—প্রকল্পের সাইট সচল রাখতে কোম্পানিটি এখন ব্যাংক ঋণের আশায় নিজেদের সেই অংশ বন্ধক (মর্টগেজ) রেখেছে।"
অন্যদিকে বড় অংকের আর্থিক প্রতিশ্রুতি পূরণ করার পরেও ক্রেতারা দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হচ্ছেন। বেসরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা দেবাশীষ রঞ্জন পাল ২০২৪ সালের মার্চ মাসে রূপসী বিল্ডার্সের একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য ১.২০ কোটি টাকার চুক্তি করেন এবং অগ্রিম বাবদ ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন।
দেবাশীষ বলেন, "দুই বছরে অ্যাপার্টমেন্ট হস্তান্তরের কথা। এখন প্রায় আড়াই বছর হতে চলছে। প্রকল্পের অর্ধেক কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি।"
ওই প্রকল্পের আরেক ক্রেতা চিকিৎসক শাহজাদা ইমরান হোসেন প্রায় ৭০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। তিনিও জানান একই ভোগান্তির কথা।
বাজেট পদক্ষেপে পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা
সংশ্লিষ্ট শিল্পের ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করে বলেছেন যে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আর্থিক নীতি কঠোর করা—বিশেষ করে ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ওপর নতুন ১৫ শতাংশ মূলধনি মুনাফা কর, রড ও সিমেন্টের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক এবং অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা সাদা করার সুযোগের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা– এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
রিহ্যাব-এর সভাপতি আলী আফজল সতর্ক করে বলেন, "নতুন এই কর ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যই আরও জটিলতা তৈরি করবে।"
দেশের শীর্ষস্থানীয় ডেভেলপারদের মধ্যেও এই সংকট এখন স্পষ্ট। শেলটেক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে তাদের প্রায় ২৫ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়েছে এবং এর পাশাপাশি নতুন ফ্ল্যাট বিক্রি ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ কমে গেছে।
শেলটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, "বৈশ্বিক অস্থিরতা স্টিল ও সিমেন্টের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার স্থানীয় উৎপাদকরাও উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ডেভেলপাররা স্পট মার্কেট (খোলাবাজার) থেকে আরও বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।"
একই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হাসান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইমুল হাসান জানান, ২০২০ সালের আগে যেখানে তার কোম্পানি বছরে ৭ থেকে ৮টি প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করত, সেখানে ২০২১ এবং ২০২২ সালে তারা মাত্র তিনটি প্রকল্প শেষ করতে পেরেছে।
এমনকি ২০২৩ সালে শুরু করা চারটি প্রকল্প ৭০ শতাংশ ফ্ল্যাট বিক্রি হওয়া সত্ত্বেও এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে। নাইমুল হাসান বলেন, "২০২৩ সালের পর থেকে আমরা নতুন কোনো প্রকল্প হাতে নিতে পারিনি। অধিকাংশ হাউজিং কোম্পানির অবস্থাই এখন একই রকম।"
বড় আবাসন কোম্পানি এখনো সংকটে না পড়লেও, ঝুঁকিমুক্তও নয়
ছোট ও মাঝারি ডেভেলপাররা যখন টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন আবাসন বাজারের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর ভর করে টিকে রয়েছে।
কনকর্ড গ্রুপের রিয়েল এস্টেট ডিভিশনের ব্র্যান্ড ম্যানেজার তারিকুল আলম বলেন, বড় কোম্পানিগুলো এপর্যন্ত মারাত্মক কোনো বিপর্যয় এড়িয়ে যেতে পেরেছে—যার আংশিক কারণ, আবাসিক ইউনিটের চেয়ে তাদের কমার্শিয়াল রিয়েল এস্টেট প্রকল্পগুলো ভালো পারফর্ম করছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই দীর্ঘায়িত মন্দা শেষ পর্যন্ত বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পোর্টফোলিওকেও টেনে ধরবে।
আনোয়ার ল্যান্ডমার্ক এবং সাউথ ব্রিজ হাউজিংয়ের প্রতিনিধিরাও একই কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছেন, বড় প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী ব্যালেন্স শিট বা আর্থিক ভিত্তি আপাতত বাজারের এই বড় ধাক্কাগুলো সামলে নিতে পারছে।
তা সত্ত্বেও, মন্দার এই প্রভাব চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ঢাকার মগবাজার এলাকার একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার জানান, এই খাতের বড় বড় নামগুলোও এখন হোঁচট খেতে শুরু করেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি একটি শীর্ষস্থানীয় ডেভেলপার কোম্পানির কথা বলেন, যারা কয়েক বছর আগে মগবাজার এলাকায় একটি আবাসিক প্রকল্প চালু করে খুব সহজেই সব ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়েছিল। সেই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে কোম্পানিটি কাছেই দ্বিতীয় আরেকটি প্রকল্পের কাজ শুরু করে—কিন্তু এবার পর্যাপ্ত সংখ্যক ক্রেতা আকৃষ্ট করতেই তাদের চরম বেগ পোহাতে হচ্ছে।
