বিডা, বেজা ও পিপিপি বিলুপ্ত করে 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল-২০২৬' পাস, বিরোধী দলের আপত্তি
বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মধ্যেই জাতীয় সংসদে বুধবার 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল-২০২৬' পাস হয়েছে। এর ফলে বর্তমান বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষ (পিপিপি) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বিলুপ্ত করে একটি সমন্বিত 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ' গঠনের পথ সুগম হলো।
বিলটি জরুরি ভিত্তিতে সংসদে উত্থাপন ও পাস করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা জোরালো আপত্তি জানান। তাদের অভিযোগ, সংসদীয় বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র তাদের সরবরাহ করা হয়নি।
নতুন এই আইনের অধীনে বিদ্যমান তিনটি কর্তৃপক্ষ বিলুপ্ত করে তাদের কার্যক্রম একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা হবে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা সহজ, দ্রুত ও সমন্বিতভাবে প্রদান করা সম্ভব হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মূলত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বিলটি তাৎক্ষণিক বিবেচনার জন্য সংসদে উত্থাপন করেন। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা বলেন, সংসদীয় বিধি অনুযায়ী বিলটি উত্থাপনের অন্তত তিন দিন আগে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তাদের দেওয়া হয়নি। পর্যাপ্ত পর্যালোচনা ও আলোচনার সুযোগ না দিয়েই কেন সরকার বিলটি দ্রুত পাস করতে চাইছে, সে প্রশ্নও তোলেন তারা।
পাস হওয়া এই বিলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন, ২০১০; বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব আইন, ২০১৫; বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৬; এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইন, ২০১৮ রহিত ও সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে।
আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলোর মধ্যে রয়েছে—অর্থনৈতিক অঞ্চল, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল এবং অন্যান্য নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা; লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রদানের ক্ষেত্রে সেবার মান ও সময়সীমা নির্ধারণ এবং বিনিয়োগ ও ব্যবসা-সংক্রান্ত সব ধরনের সেবা একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রদান করা।
এ ছাড়া কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়্যালটি, প্রযুক্তিগত জ্ঞান (টেকনিক্যাল নো-হাউ) ফি, কারিগরি সহায়তা ফি বা ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি পরিশোধ করতে হলে, ওই অর্থের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতিতে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে বলে বিলে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ যে পরিমাণ রয়্যালটি বা ফি নির্ধারণ করবে, সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সেই পরিমাণ অর্থই পরিশোধ করতে হবে।
বিলটি সংসদে উত্থাপনের পর বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান বলেন, গত ৯ জুলাই মন্ত্রিসভা বিলটির অনুমোদন দিলেও সংসদে উত্থাপনের আগে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তিন দিনের নোটিশসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংসদ সদস্যদের দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, 'বিলটির মাধ্যমে চারটি বিদ্যমান আইন রহিত করা হচ্ছে। কিন্তু প্রস্তাবিত আইন ও রহিত হতে যাওয়া আইনগুলোর মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে কোনো তুলনামূলক বিবরণ সংসদ সদস্যদের দেওয়া হয়নি।'
বিরোধী দলের এই সংসদ সদস্য আরও প্রশ্ন তোলেন, কেন বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হচ্ছে না। তিনি বিলটি পাসের আগে পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'বিলটিতে কী ধরনের ভুল বা ঘাটতি থাকতে পারে কিংবা এত তাড়াহুড়ার কারণ কী, আমরা বুঝতে পারছি না। এর পেছনে অন্য কোনো স্বার্থ জড়িত আছে কি না, সেটিও আমরা জানি না।'
সংসদ সদস্যদের এই আপত্তির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ তাদের বিলটির বিরোধিতা না করে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে এটি পাসে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ থেকে সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী বিলগুলো সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়ে আসছে। তবে বর্তমান বিলের মাধ্যমে নতুন কোনো আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে না।
মন্ত্রী বলেন, 'বিভিন্ন সময়ে পৃথক আইনের আওতায় গঠিত কয়েকটি কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে যে ওভারল্যাপ বা কাজের পুনরাবৃত্তি তৈরি হয়েছে, তা দূর করে বিনিয়োগকারীদের উন্নত সেবা নিশ্চিত করতেই এগুলোকে একীভূত করা হচ্ছে।' তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ' একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সেবা দিতে একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলবে। তুলনামূলক বিবরণীর প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো আইনগত কাঠামো নয়; বরং বিদ্যমান কয়েকটি কর্তৃপক্ষকে একীভূত করার একটি প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ মাত্র।
