ধুঁকতে থাকা স্পিনিং মিল বাঁচাতে স্থানীয় সুতায় তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা ৫% করার পরিকল্পনা
ধুঁকতে থাকা দেশের স্থানীয় স্পিনিং মিলকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসছে সরকার। এজন্য দেশে উৎপাদিত সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিদ্যমান নগদ প্রণোদনা ১.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে। এতে সরকারের বাড়তি খরচ হবে প্রায় ৩,৮০০ কোটি টাকা।
বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা একটি বৈঠক করেছেন। ওই সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই নগদ প্রণোদনা ৫ শতাংশ করার বিষয়ে উদ্যোক্তাদের আশ্বাস দিয়েছেন বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানিয়েছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। সভায় উপস্থিত সংগঠনটির অপর দুইজন নেতাও এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে এই বর্ধিত প্রণোদনা সুবিধাটি কেবল সেইসব পোশাক রপ্তানিকারকরাই পাবেন, যারা পোশাক তৈরিতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা ব্যবহার করবেন। দেশীয় বা অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য সুতা সরবরাহকারী স্পিনিং মিলগুলো, যারা বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের কাঁচামাল সরবরাহ করেন, তারা এই সহায়তা পাবেন না।
মূল্যের ব্যবধান কমানো
দেশের টেক্সটাইল মিল মালিক ও তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, নগদ প্রণোদনা ৫ শতাংশ করা হলে আমদানিকৃত ইয়ার্ন বা সুতার দামের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার দামের ব্যবধান অনেক কমে যাবে, বা একেবারেই দূর হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা আমদানির স্থলে স্থানীয় টেক্সটাইল মিল থেকে সুতা কিনতে উদ্বুদ্ধ হবেন। বাংলাদেশে আমদানিকৃত সুতার প্রায় ৯৫ শতাংশই আসে প্রতিবেশী ভারত থেকে।
শওকত আজিজ রাসেল বলেন, "আমরা আশা করছি আগামী সপ্তাহে সরকার এ বিষয়ে আদেশ জারি করবে। পোশাক রপ্তানিকারকদের তাদের চূড়ান্ত রপ্তানি মূল্যের ওপর ভিত্তি করে এই প্রণোদনা দেওয়া করা হবে।"
তিনি বলেন, "এই ইনসেনটিভ পেলে আমাদের এবং আমদানিকৃত সুতার দামের যে গ্যাপ, তা প্রতি কেজিতে ১০ সেন্টের নিচে চলে আসবে, কিংবা সমানও হতে পারে। ফলে পোশাক তৈরির জন্য আমদানির বদলে আমাদের কাছ থেকে সুতা কিনতে আগ্রহী হবেন। অর্থাৎ, আমরা প্রতিযোাগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হবো।"
তিনি বলেন, "এ দাবি আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে করে আসছিলাম। তারা যদি তখনই এই পদক্ষেপ নিতেন, তবে গত দুই বছরে হয়তো দুই শতাধিক টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে যেত না।"
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিএমএ'র অপর এক নেতা টিবিএসকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী টেক্সটাইল খাতের সমস্যা জানার পর ইতোমধ্যে এ খাতকে রক্ষায় নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবং গত রোববার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছেন।
আগামী সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাবটি অনুমোদন দিলে বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করতে পারে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রীকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে সরাসরি কিছু বলেননি। তবে তিনি বলেন, "ইন্ডাস্ট্রিকে রক্ষার জন্য আমরা ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। প্রয়োজন হলে আরো নেব।"
চাপে থাকা টেক্সটাইল খাত
বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও—বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার সুতা আমদানি করেছে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা এর আগে স্থানীয় সুতা ব্যবহারের জন্য ৪ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পেতেন, কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে, ২০২৪ সালে সরকার তা এক ধাক্কায় কমিয়ে ১.৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। এছাড়া এই প্রণোদনা প্রাপ্তির ওপর ১০ শতাংশ কর বা ট্যাক্স ধার্য রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে এটি ছাড় করাতে অনেক সময় লেগে যায়, এবং বাড়তি খরচও করতে হয়। ফলে এর প্রকৃত আর্থিক মূল্য আরও কমে যায়।
একই সময়ে প্রতিবেশী ভারত সরকার তাদের টেক্সটাইল মিলগুলোকে একের পর এক নীতি সহায়তা দিয়ে থাকে। যার ফলে ভারতীয় উৎপাদকরা বাংলাদেশে অনেক কম দামে সুতা রপ্তানি করতে পারে বলে জানিয়েছে বিটিএমএ। সংগঠনটি জানায়, এই নীতিগত সহায়তার কারণে এক পর্যায়ে আমদানিকৃত ভারতীয় সুতা মূল্যের দিক থেকে প্রতি কেজিতে প্রায় ৩০ সেন্টের সুবিধা পাচ্ছিল।
বিটিএমএ'র তথ্য অনুাযায়ী, দেশে টেক্সটাইল মিলের সংখ্যা ১,৮০০-এর বেশি, যার মধ্যে সুতা উৎপাদনকারী স্পিনিং মিলের সংখ্যা ৫৭২টি। দেশের টেক্সটাইল খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। সংগঠনটির মতে, এই শিল্প দেশের কটন বা তুলাজাত সুতার সম্পূর্ণ চাহিদা এবং নন-কটন সুতার চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ মেটাতে সক্ষম।
তবে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেছেন, বর্তমানে কটন ইয়ার্ন ও ফেব্রিকের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ আমদানি হয়। আর নন-কটন সুতার প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি হচ্ছে।
মূল্যের ব্যবধান দাঁড়াবে ১২-১৫ সেন্ট
টেক্সটাইল মিলের মালিকরা জানান, ভারতে বর্তমানে ৩০-কাউন্ট সুতা প্রতি কেজি প্রায় ২.৮৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সমমানের সুতার দাম প্রায় ৩.০৫ ডলার। অর্থাৎ, প্রতি কেজিতে ২০ সেন্টের ব্যবধান।
তবে পোশাক প্রস্তুতকারকরা বলছেন, স্থানীয় সুতার দাম যদি ২০ সেন্ট বেশিও হয়, তবুও তারা দেশীয় সুতা সংগ্রহ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ স্থানীয় উৎস থেকে সুতা কিনলে ব্যাংকিং খরচ, গুদামজাতকরণ এবং ওয়ার্ক-ইন-প্রসেস-সহ আরও কিছু খরচ কমবে। প্রস্তাবিত ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা চালু হলে, এই আনুষঙ্গিক সাশ্রয়গুলো হিসাব করার পর রপ্তানিকারকদের প্রাক্কলন অনুযায়ী কার্যকর মূল্যের ব্যবধান প্রতি কেজিতে মাত্র ১২ থেকে ১৫ সেন্টে নেমে আসবে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, "আমাদের সাধারণ নিয়ম বা থাম্ব রুল হলো—স্থানীয় সুতার দাম ২০ থেকে ৩০ সেন্ট বেশি হলেও আমরা দেশীয় সুতাই কিনি। প্রস্তাবিত প্রণোদনা এই ব্যবধানকে ২০ সেন্টের নিচে নামিয়ে আনবে, যা স্থানীয় মিলগুলো থেকে আরও বেশি সুতা সংগ্রহে সবাইকে উৎসাহিত করবে।"
"বাংলাদেশের টেক্সটাইল মিলগুলো মূলত মরে যাচ্ছে," –স্বীকার করে তিনি বলেন, "পোশাক খাত হয়তো এখনই এর তীব্র প্রভাব টের পাচ্ছে না, কিন্তু এর সামগ্রিক নেতিবাচক পরিণতি আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই আমরা আমরা টের পাব।"
ফকির গ্রুপ, দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। তারা বর্তমানে চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ সুতা আমদানি করে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফকির কামরুজ্জামান নাহিদ বলেন, প্রণোদনার কারণে যদি মূল্যের দিক থেকে স্থানীয় সুতা প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়, তবে তারা নিশ্চিতভাবেই দেশীয় বাজার থেকে কেনাকাটা বাড়াবেন।
সুরম্যান গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, সুতা আমদানির ক্ষেত্রে গুদামজাতকরণ, ব্যাংকিং খরচ এবং নানাবিধ প্রশাসনিক ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। "যদি প্রস্তাবিত প্রণোদনা বাস্তবায়িত হয়, তবে স্থানীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আমাদের কেনাকাটা অবশ্যই বাড়বে," তিনি বলেন।
ইসরাক স্পিনিং মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক বলেন, মূল্যের ব্যবধান যদি প্রতি কেজিতে ২০ সেন্টের কাছাকাছি বা নিচে নেমে আসে, তবে কোনো আমদানিকারকই বিদেশি সুতা বেছে নেবেন না।
গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত ইসরাক স্পিনিং মিলসের প্রতি মাসে ৫,০০০ টন সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, তবে বর্তমান মন্দা পরিস্থিতির কারণে তাদের সক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ অব্যবহৃত পড়ে থাকছে।
তিনি বলেন, "চাহিদা বাড়লে আমার ক্যাপাসিটির প্রায় পুরোটা ব্যবহার করার সুযোগ হবে। আমরা আশা করছি, সরকার ক্যাশ ইনসেনটিভ বাড়ালে আমাদের বিক্রি বাড়বে এবং এই সেক্টর বেঁচে যাবে।"
গ্যাস সংকট সমাধানের তাগিদ
এই শিল্প খাতের নেতারা বলছেন, বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে স্পিনিং মিলগুলো তাদের মূল উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম সক্ষমতায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে দেশের মোট সুতা উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ অলস বা অব্যবহৃত পড়ে আছে।
তারা বলেন, প্রস্তাবিত নগদ প্রণোদনা সাময়িক কিছুটা স্বস্তি দেবে ঠিকই, তবে এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
লিটল স্টার স্পিনিং মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খোরশেদ আলম টিবিএস-কে বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের কারখানা মাত্র ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় চালাতে হচ্ছে।
"আমাদের অনুমোদিত গ্যাস প্রেসার হলো ১০ পিএসআই, কিন্তু পিক আওয়ারে আমরা পাচ্ছি মাত্র ১ থেকে ১.৫ পিএসআই, আর কোনো কোনো সময় লাইনে কোনো গ্যাসই থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে কারখানা চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে," তিনি বলেন।
তিনি জানান, লাইনে যে গ্যাস পাওয়া যায় তা দিয়ে মিলের মাত্র ২০ শতাংশ সক্ষমতা চালানো সম্ভব। পরবর্তীতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ, নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ এবং ব্যাটারি ব্যাকআপের মাধ্যমে বিপুল অতিরিক্ত ব্যয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করে কোম্পানিটি তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার কোনোমতে প্রায় ৭০ শতাংশে উন্নীত করতে পেরেছে।
রপ্তানিমুখী স্পিনিং প্রতিষ্ঠান এনজেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামান খান জিতু বলেন, "মাঝে কিছু সময় উন্নতি হলেও এখন গ্যাসের প্রেশার আবার কমে গেছে, যা এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন। ১৫ পিএসআই অনুমোদন হলেও, পাওয়া যায় মাত্র ১ পিএসআই। তা দিয়ে প্রোডাকশন (উৎপাদন কার্যক্রম) চলে না।"
"সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ মেটানো সম্ভব হচ্ছে" –জানিয়ে তিনি বলেন, "গ্যাস সংকটের সমাধান না হলে, প্রস্তাবিত আর্থিক প্রণোদনা মিলগুলোর জন্য খুব একটা সুফল বয়ে আনবে না।"
