রাশিয়া-চীনকে মোকাবিলায় ৯ দেশকে নিয়ে ‘প্রতিরক্ষা ব্যাংক’ গঠন করল কানাডা
রাশিয়াকে মোকাবিলায় পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক প্রস্তুতি বাড়াতে একটি নতুন 'প্রতিরক্ষা ব্যাংক' গঠন করেছে কানাডা। এই উদ্যোগে তাদের সমর্থন দিচ্ছে আরও আটটি দেশ। মিত্র দেশগুলোকে নতুন করে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করার বহুমুখী উদ্যোগে এটি বড় অগ্রগতি।
মঙ্গলবার আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে এই নতুন প্রতিষ্ঠানের কথা ঘোষণা করা হয়। আলবেনিয়া, বেলজিয়াম, গ্রিস, লাটভিয়া, লুক্সেমবার্গ, রোমানিয়া, তুরস্ক ও ইউক্রেন শামিল হয়েছে কানাডার এই উদ্যোগে। এই ব্যাংকের সদর দপ্তর হবে কানাডায়।
নতুন এই প্রতিষ্ঠানের নাম ডিফেন্স, সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ব্যাংক (ডিএসআরবি)। বহুজাতিক এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থভান্ডারকে একজোট করার কথা ভাবা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের বিকল্প পথ হিসেবে এই ভাবনাটি বেশ কিছু দিন ধরেই আলোচনায় ছিল।
তবে উদ্যোক্তা কানাডা ছাড়া তালিকায় জি-৭ জোটের অন্য কোনো প্রভাবশালী দেশের নাম নেই। ফলে ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা কিছুটা সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকছে। অবশ্য কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ রয়টার্সকে জানিয়েছেন, নতুন সদস্যদের জন্য এই ব্যাংকের দরজা সবসময় খোলা থাকবে।
সদস্য দেশগুলোর প্রাথমিক তহবিল দিয়ে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সংস্থাকে অর্থায়ন করবে এই ব্যাংক। ফলে সদস্যরা সরাসরি নিজেদের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ না ফেলেই পরোক্ষভাবে ঋণের মাধ্যমে সামরিক খাতে ব্যয় করতে পারবে।
ব্যাংকটির মূল লক্ষ্য হলো সস্তা অর্থায়নের মাধ্যমে প্রায় ১৩৪ বিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহ করা, যা সমমনা মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে।
ডিএসআরবির সদস্য দেশগুলো এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বড় পরিসরে সরকারি ও বেসরকারি মূলধনের জোগান নিশ্চিত করবে এই ব্যাংক। এর ফলে মূলধন জোগাড় করা সহজ হবে এবং অর্থায়নের খরচ কমবে। পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতেও তা সাহায্য করবে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, 'ডিফেন্স, সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ব্যাংক বিনিয়োগের নতুন দুয়ার খুলে দেবে, আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত মজবুত করবে। সেইসঙ্গে আরও বিপজ্জনক ও বিভক্ত এক পৃথিবীর চ্যালেঞ্জগুলো যাতে কানাডা ও তার মিত্ররা একজোট হয়ে মোকাবিলা করতে পারে, তা নিশ্চিত করবে।'
কানাডা জানিয়েছে, অংশীদার দেশগুলোকে নিজ নিজ দেশে এই পরিকল্পনা অনুমোদন করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যেই ডিএসআরবির কার্যক্রম পুরোদমে চালু করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ সামরিক আগ্রাসনই প্রমাণ করে দিয়েছে যে মিত্র দেশগুলোর এখন অত্যন্ত দ্রুত ও বড় পরিসরে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো কতটা জরুরি।
চলতি বছর ডিএসআরবির প্রচার ও প্রসারের দায়িত্ব নিয়েছে কার্নি সরকার। তাদের লক্ষ্য ছিল, ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনেই অন্তত ১০টি দেশকে এর সমর্থক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে হাজির করা।
আমেরিকার নেতৃত্বাধীন চিরাচরিত বিশ্বব্যবস্থা যেভাবে ভেঙে যাচ্ছে, তা রুখতে বছরের শুরুর দিকেই 'মধ্যম শক্তি'র দেশগুলোকে নিয়ে একটি শক্তিশালী জোট গড়ার ডাক দিয়েছিলেন কার্নি।
তবে ইউরোপের বড় দেশগুলোর সমর্থন আদায় করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে ডিএসআরবিকে। ব্রিটেন ও জার্মানি আগেই এই প্রকল্প থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছিল। অবশ্য তাদের অবস্থান বদলানোর ইঙ্গিত মিলেছে গত মাসে। ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী রেচেল রিভস দেশের পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, ডিএসআরবি নিয়ে তারা এখন কানাডার সঙ্গে 'নিবিড়ভাবে' কাজ করছেন।
এদিকে ব্রিটেন নিজের উদ্যোগে আলাদা একটি বহুপাক্ষিক প্রতিরক্ষা অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করার চেষ্টায় আছে। সোমবার তাতে সায় দিয়েছে পোল্যান্ড। নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের পর পোল্যান্ডের এই সমর্থন ব্রিটেনকে আরও শক্তিশালী করল।
ডিএসআরবির মূল লক্ষ্য হলো 'ট্রিপল-এ' ক্রেডিট রেটিং বা সর্বোচ্চ ঋণমান অর্জন করা। এটি সম্ভব হলে অত্যন্ত কম সুদে ঋণ দিতে পারবে ব্যাংকটি। বিশেষ করে যেসব দেশ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এখন বাজারে সস্তায় তহবিল পাচ্ছে না, তারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
প্রতিরক্ষা শিল্পের পরিধি আরও বাড়াতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে ঋণের গ্যারান্টি দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে এই ব্যাংকের।
২০২৪ সালে একদল সাবেক ন্যাটো নিরাপত্তা উপদেষ্টা, উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও ব্যাংকার মিলে ডিএসআরবি গঠনের প্রস্তাব এনেছিলেন।
ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার সঙ্গে বাড়তে থাকা উত্তেজনা ও চীনের সামরিক আধিপত্য বিস্তার—সব মিলিয়ে ন্যাটো ও তার মিত্র দেশগুলো এখন প্রতিরক্ষার আকাশছোঁয়া চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০২৫ সালের জুনে ন্যাটো নেতারা এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে আসেন। সিদ্ধান্ত হয়, ২০৩৫ সালের মধ্যে সদস্য দেশগুলো তাদের জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতের বিনিয়োগে ব্যয় করবে।
কানাডার শীর্ষ ব্যাংকগুলোর (আরবিসি, বিএমও, সিআইবিসি, ন্যাশনাল ব্যাংক অব কানাডা, স্কোশিয়াব্যাংক ও টিডি ব্যাংক) পাশাপাশি জেপি মরগান, ডয়চে ব্যাংক, কমার্জব্যাংক ও আইএনজি-র মতো বৈশ্বিক ব্যাংকিং জায়ান্টরাও ইতিমধ্যে এই মেগা প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে।
