আর্জেন্টাইনদের ‘কাবালা’: মাঠে বসে ফাইনাল দেখবেন না কুসংস্কারে বিশ্বাসী প্রেসিডেন্ট
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই বৃহস্পতিবার বলেন, কুসংস্কারের কারণে তিনি বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখতে মাঠে যাবেন না। এর পরিবর্তে আগামী রোববার স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ম্যাচটি তিনি নিজের বাসা থেকেই দেখবেন। কারণ টুর্নামেন্টে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার আগের সাতটি ম্যাচও তিনি সেখান থেকেই দেখেছেন এবং দল প্রতিটি ম্যাচেই জয় পেয়েছে।
নিজের দেশের প্রিয় ফুটবল দলকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জিততে সহায়তা করার আশায় মিলেই আরও বলেন, তিনি এবারও একই ভারী জ্যাকেট পরবেন।
বিশ্বজুড়ে সমর্থক ও খেলোয়াড়দের অনেকেই নানা ধরনের কুসংস্কার বা বিশ্বাস আঁকড়ে ধরেন। তাদের ধারণা, এসব কাজ তাদের দলের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে কিংবা প্রতিপক্ষের জন্য দুর্ভাগ্য ডেকে আনে।
তবে লাতিন আমেরিকায়, বিশেষ করে আর্জেন্টিনায়, 'কাবালা' নামে পরিচিত এসব আচার-অনুষ্ঠানভিত্তিক বিশ্বাস ও অভ্যাসের গুরুত্ব অনেক বেশি। জাতীয় দলের প্রতি মানুষের প্রবল আবেগ ও গভীর অনুরাগেরই প্রতিফলন এগুলো।
বৃহস্পতিবার তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, বহুল আলোচিত প্রত্যাশা অনুযায়ী তিনি কি রোববারের ম্যাচ দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে যাবেন? সেখানে তার ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে খেলা দেখার কথা ছিল।
জবাবে মিলেই বলেন, 'কোনোভাবেই না।'
তিনি বুয়েনস আইরেসের স্থানীয় বেতার কেন্দ্র 'এল অবসেরভাদর'-কে বলেন, 'আমি অলিভোস থেকেই সব ম্যাচ দেখতে থাকব।' তিনি তার সরকারি বাসভবনের কথাই উল্লেখ করছিলেন।
সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, তিনি কি কুসংস্কারের কারণেই বাসায় থাকছেন?
মিলেই 'হ্যাঁ' বলে উত্তর দেন। এরপর তিনি তার আরেকটি অভ্যাসের কথা বলেন। তিনি বলেন, 'যেহেতু এখন ঠান্ডা পড়েছে এবং আমি ঘরের উষ্ণতা বাড়ানোর যন্ত্র চালাই না, তাই আমি একটি তেল কোম্পানির প্রতীকযুক্ত জ্যাকেট পরে থাকি। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের দিন সেটি পরে আমার খুব গরম লাগছিল। তাই আমি জ্যাকেটটি খুলে ফেলি, আর তখনই তারা আমাদের বিপক্ষে একটি গোল করে। এরপর আমি আবার জ্যাকেটটি পরে নিই এবং তারপর থেকে আর কখনো সেটি খুলিনি।'
মিলেইর মতোই অধিকাংশ আর্জেন্টিনাবাসীরও এমন 'কাবালা' রয়েছে, যার কারণে দল জিততে থাকলে তাদের একই রকম রুটিন কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। কেউ প্রতিটি ম্যাচে একই পোশাক পরেন এবং পুরো বিশ্বকাপজুড়ে নিজের দলের জার্সি ধোয়াও এড়িয়ে চলেন। কেউ প্রতিটি ম্যাচ একই জায়গায় বসে দেখেন। আবার এমনও হয়, আর্জেন্টিনা গোল করার সময় যদি কেউ বাথরুমে থাকেন, তাহলে তাকে আর খেলা দেখতেই দেওয়া হয় না।
এমনকি খুব ছোট ছোট কাজও তখন অসাধারণ গুরুত্ব পেয়ে যায়। চলতি বিশ্বকাপে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একদল সমর্থক ঠিক সেই মুহূর্তে ধর্মগ্রন্থ বাইবেল পড়া শুরু করেছিলেন, যখন মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা গোল করতে শুরু করে। এরপর থেকে তারা বাধ্য হয়েছেন প্রতিটি ম্যাচেই একই আচার পুনরাবৃত্তি করতে। প্রতিপক্ষ দলের ওপর প্রভাব ফেলবে—এমন বিশ্বাস থেকে প্রচলিত আরেকটি আচার হলো প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের ছোট মূর্তি অথবা তাদের নাম লেখা কাগজ হিমায়িত করে রাখা।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টরা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থেকেছেন, যাতে তাদের উপস্থিতির কারণে দলের জন্য কোনো অমঙ্গল না ডেকে আনে।
এই কুসংস্কারের সূত্রপাত ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে। সে সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কার্লোস মেনেম উদ্বোধনী ম্যাচের ঠিক আগে আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। এরপরই সবাইকে অবাক করে উদ্বোধনী ম্যাচে ক্যামেরুনের কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। এরপর মেনেমকে 'অপয়া' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
এর পর থেকে দায়িত্বে থাকা কোনো আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট জাতীয় দলের কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন—এমন নজির নেই।
