সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড কোচের অতি-রক্ষণাত্মক কৌশলে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এগিয়ে যাওয়ার পর ইংল্যান্ডের রক্ষণাত্মক কৌশল দেখে বিস্মিত হয়েছেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা। বিশেষ করে ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলের খেলোয়াড় পরিবর্তনের ধরন আর্জেন্টাইনদের অবাক করেছে। কারণ তারা দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ডের গতিশীল উইঙ্গারদের মোকাবিলা করার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিল।
'দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট' জানতে পেরেছে, আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি ধরে নিয়েছিলেন যে ইংল্যান্ড বুকায়ো সাকা বা ননি মাদুয়েকে—অথবা দুজনকেই মাঠে নামাবে। স্কালোনি ও তার সহকারীরা জানতেন যে তাদের দলের মূল দুর্বলতা হলো প্রতিপক্ষের গতিশীল আক্রমণ। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা জানান, ম্যাচের ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলের পর তারা ঠিক এই পরিস্থিতির আশঙ্কাই করছিলেন। তবে সময়ের সাথে সাথে তারা বুঝতে পারেন যে ইংল্যান্ড ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বদলে উল্টো রক্ষণভাগে গুটিয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় 'হাইড্রেশন ব্রেক' পর্যন্তও স্কালোনি সাকা বা মাদুয়েকের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি দেখেন যে টুখেল একের পর এক রক্ষণাত্মক খেলোয়াড় নামাচ্ছেন, যা ইংল্যান্ডের পাল্টা আক্রমণের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছিল। এর ফলে স্কালোনি নির্ভয়ে আরও আক্রমণাত্মক হওয়ার সুযোগ পান। তিনি লেফটব্যাক নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকোকে তুলে নিয়ে জয়সূচক গোলদাতা লাউতারো মার্টিনেজকে মাঠে নামান।
ম্যাচের ৭২ মিনিটে গর্ডনকে তুলে নিয়ে এজরি কনসাকে নামিয়ে পাঁচ ডিফেন্ডারের রক্ষণ তৈরি করেন টুখেল। ৮২ মিনিটে রিস জেমস ও ডেক্লান রাইসের পরিবর্তে নামানো হয় ড্যান বার্ন ও নিকো ও'রাইলিকে।
লাউতারোর গোলে আর্জেন্টিনা এগিয়ে যাওয়ার পর আক্রমণভাগের খেলোয়াড় মার্কাস রাশফোর্ড ও আইভান টনিকে মাঠে নামানো হয়। পরিসংখ্যান বলছে, গর্ডনের গোলের পর থেকে মার্টিনেজের জয়সূচক গোল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বলের দখল ছিল মাত্র ১২ শতাংশ।
টুখেলের এই কৌশলগত পরিবর্তনগুলো দেখে স্কালোনি বুঝতে পারেন ইংলিশ গতি সামলাতে আর বিশেষজ্ঞ লেফট-ব্যাক প্রয়োজন নেই। তাই রক্ষণভাগের একজন খেলোয়াড়কে উঠিয়ে তিনি ৮১ মিনিটে মার্টিনেজকে নামান। ম্যাচ জয়ের পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মধ্যে টুখেলের এই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। বিশেষ করে সাকা বা মাদুয়েকের এক মিনিটও খেলতে না পারা তাদের কাছে ছিল চরম বিস্ময়ের।
ইংলিশ খেলোয়াড় ও এফএ-র অবস্থান
টুখেলের এই কৌশলে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রাও অসন্তুষ্ট ছিলেন। অধিনায়ক হ্যারি কেইন বলেন, ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর কেবল লিড 'ধরে রাখার' চেষ্টা এই পর্যায়ে যথেষ্ট নয়। সেন্টার ব্যাক মার্ক গেহি বলেন, 'আমাদের চাপ অব্যাহত রাখা উচিত ছিল। মনে হচ্ছিল গোল করার পরই আমাদের মানসিকতা পাল্টে গেছে—সবাই রক্ষণ সামলাতে পেছনে চলে গেছি।'
তবে ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) মনে করে, সেমিফাইনাল থেকে বিদায়ের জন্য টুখেলের কৌশল দায়ী নয়। ২০২৮ সালের ইউরো জেতার লক্ষ্যে তারা এই জার্মান কোচের ওপরই আস্থা রাখছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী মার্ক বুলিংহাম ব্যক্তিগতভাবে টুখেলের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
টুখেলের আত্মপক্ষ সমর্থন
২০২৮ সালের ইউরো পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ টমাস টুখেল হারের পর বলেন, 'আমাদের ফর্মেশনের মধ্যেই আমরা বড্ড বেশি রক্ষণাত্মক হয়ে পড়েছিলাম। আমি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম; রক্ষণভাগে পাঁচজন ডিফেন্ডার নামিয়ে খেলার গতি আরও ধীর করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। বরং লক্ষ্য ছিল উইঙ্গারদের দিকে দ্রুত বল বাড়িয়ে খেলাটাকে আরও আক্রমণাত্মক করা এবং ব্যাক-ফোর (চার ডিফেন্ডারের রক্ষণভাগ) এর মাঝে যেন কোনো ফাঁকফোকর তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করা। আমরা সবাইকে সামনে এগিয়ে এসে আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার জন্য উৎসাহিত করেছিলাম, কিন্তু আমরা স্রেফ খেই হারিয়ে ফেলি।'
টুখেল আরও বলেন, 'আমার মনে হয় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখাটা বড় ভূমিকা পালন করে। বল নিজেদের পায়ে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করাটা হয়তো আমাদের ডিএনএ-তে নেই, যেমনটা স্পেন, আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের ফুটবলারদের ডিএনএ-তে থাকে।'
