বিদেশি অর্থ টানতে সাড়ে ৩ লাখ ডলারে নাগরিকত্ব বিক্রি করবে আর্জেন্টিনা
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই তার দেশে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন এবং এ লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে সফর করছেন। শুক্রবার বিদেশি অর্থ আকর্ষণে তার সর্বশেষ উদ্যোগ ঘোষণা করেন তিনি। এ সময় তিনি তথাকথিত 'গোল্ডেন পাসপোর্ট' কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দেন।
এই কর্মসূচির আওতায় যারা আর্জেন্টিনা সরকারকে কয়েক লাখ ডলার দান করবেন অথবা ঋণ দেবেন, তারা আর্জেন্টিনার নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এর সঙ্গে তারা বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।
শুক্রবার প্যারিসে এক সম্মেলনে কর্মসূচিটি উদ্বোধনের সময় আর্জেন্টিনার অর্থমন্ত্রী লুইস কাপুতো বলেন, "এটি হবে এমন আরও একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে আমরা আর্জেন্টিনাকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারব।"
এ ঘোষণা এমন এক সময়ে এল, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশকে একই ধরনের কর্মসূচি কঠোর করা বা বন্ধ করার জন্য চাপ দিচ্ছে। কারণ, এসব কর্মসূচিকে কর ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তি কিংবা অপরাধে অভিযুক্ত এমন ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যারা বিচারের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে এসব ব্যবস্থার সুযোগ নিতে পারেন।
অন্যদিকে, বিপুল অর্থের বিনিময়ে দেওয়া এসব পাসপোর্ট নিয়ে জনসমালোচনাও তৈরি হয়েছে। কারণ, এমন সময়ে ধনী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ অধিকার ও সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দরিদ্র অভিবাসীদের জন্য নিজেদের সীমান্ত ক্রমেই বন্ধ করে দিচ্ছে।
তারপরও আর্জেন্টিনা সরকারের এই ঘোষণা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, দেশটির কোষাগারে অর্থের ঘাটতি পূরণে বিদেশি সম্পদের প্রবাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট মিলেই কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমনকি এ জন্য তিনি এমন কিছু কর্মসূচিরও আশ্রয় নিচ্ছেন, যেগুলো খুব কমসংখ্যক বড় অর্থনীতির দেশ গ্রহণ করেছে।
এই কর্মসূচির আওতায় আবেদনকারীদের আর্জেন্টিনার সরকারি কোষাগারে ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার দান করতে হবে অথবা ৮ লাখ ডলারের সরকারি বন্ড কিনতে হবে।
মাল্টাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এরিক মেজর আর্জেন্টিনা সরকারকে এই কর্মসূচির বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি ধারণা করছেন, অধিকাংশ আবেদনকারী সরকারি বন্ড কেনার পরিবর্তে অর্থ দান করাকেই বেছে নেবেন। কারণ, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে আর্জেন্টিনার।
তারপরও তিনি আর্জেন্টিনার এই কর্মসূচির ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই বিনিয়োগের বিনিময়ে বসবাসের অনুমতি দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। তবে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টিন সুরাক জানিয়েছেন, বর্তমানে সক্রিয় 'গোল্ডেন পাসপোর্ট' কর্মসূচি রয়েছে এমন দেশের সংখ্যা প্রায় এক ডজন। তিনি গোল্ডেন পাসপোর্ট নিয়ে একটি বইও লিখেছেন।
তিনি বলেন, এসব দেশের কোনোটিই আর্জেন্টিনার মতো এত বেশি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশের সুযোগ দেয় না।
আর্জেন্টিনার পাসপোর্টধারীরা শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতেই ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন না, রাশিয়া ও চীনেও ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন। এ ছাড়া আঞ্চলিক বিভিন্ন চুক্তির কারণে দক্ষিণ আমেরিকার যেকোনো জায়গায় বসবাস ও কাজ করার অধিকারও তাদের রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গোল্ডেন পাসপোর্ট কর্মসূচি ছোট দেশগুলোর জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট কিটস এবং ডোমিনিকা।
দ্বিতীয় পাসপোর্ট ঐতিহ্যগতভাবে এমন দেশগুলোর নাগরিকদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় ছিল, যেসব দেশের নাগরিকদের জন্য অন্য দেশে ভিসা পাওয়া কঠিন। এর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ। তবে বর্তমানে ক্রমবর্ধমানসংখ্যক মার্কিন নাগরিকও এসব কর্মসূচিতে আবেদন করছেন।
মেজর বলেন, "আমেরিকানরা একটি বিকল্প পরিকল্পনা চান। বিষয়টি আসলে ঝুঁকি মোকাবিলার একটি ব্যবস্থা, তবে একই সঙ্গে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি।"
আর্জেন্টিনার কর ব্যবস্থা জটিল হলেও দেশটি বিশ্বের প্রধান রাজধানীগুলো থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। এ কারণে বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্জেন্টিনা করস্বর্গের চেয়ে বরং একটি 'পলায়নের পথ' হিসেবে ব্যবহৃত হবে বেশি।
প্রযুক্তি খাতের ধনকুবের পিটার থিয়েল সম্প্রতি দেশটিতে নিজের একটি অবস্থান তৈরি করেছেন। অন্যদিকে, আরও অনেক কোটিপতি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বব্যাপী সংঘাত ও পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা থেকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তবে অর্থপাচারকারী বা অন্যান্য অপরাধী ও পলাতক ব্যক্তিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে এসব পাসপোর্ট পাওয়ার পর গোল্ডেন পাসপোর্ট কর্মসূচি নিয়ে কেলেঙ্কারিও তৈরি হয়েছে।
নাগরিকত্ব বিক্রি নিয়ে একটি বই লেখা সাংবাদিক আতসা আরাক্সিয়া আব্রাহামিয়ান বলেন, "এসব কর্মসূচি অনিবার্যভাবেই কিছু সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আকৃষ্ট করে।"
আর্জেন্টিনা সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নাগরিকত্বের আবেদনগুলো কঠোরভাবে যাচাই করা হবে। এর মধ্যে আবেদনকারীর অর্থের উৎস যাচাই এবং তাদের অপরাধ ও সুনামসংক্রান্ত অতীত পরীক্ষা করার বিষয়ও থাকবে।
একই ধরনের কর্মসূচিকে অনেক সময় একটি দেশের পাসপোর্টের কূটনৈতিক মর্যাদা কমিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবেও দেখা হয়েছে।
এর ফলে কোনো কোনো দেশ এমন দেশের সব পাসপোর্টধারীর জন্য ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা বাতিল করেছে, যে দেশ বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব বা বসবাসের সুযোগ দিয়ে থাকে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিচার আদালত মাল্টার গোল্ডেন পাসপোর্ট কর্মসূচির বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছে। আদালত বলেছে, নাগরিকত্বের সঙ্গে একটি দেশের প্রতি অর্থবহ সম্পর্ক জড়িত। তাই নাগরিকত্বকে অর্থের বিনিময়ে কেনাবেচার বিষয়ে পরিণত করা যায় না।
আর্জেন্টিনার এই কর্মসূচির জন্য আবেদনকারীদের দেশটিতে কোনো সময় কাটানোর প্রয়োজন হবে না।
জি২০-এর সদস্য কোনো দেশের জন্য এ ধরনের কর্মসূচি অত্যন্ত বিরল। জি২০ হলো বিশ্বের প্রধান উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি জোট। তুরস্কই একমাত্র অন্য জি২০ দেশ, যেখানে এ ধরনের কর্মসূচি রয়েছে।
তবে প্রেসিডেন্ট মিলেইর অধীনে এ কর্মসূচি চালু হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা অবাক হননি। কারণ, মিলেই এমন একজন উদারপন্থী নেতা, যিনি মুক্তবাজারভিত্তিক নীতির প্রতি দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আব্রাহামিয়ান বলেন, "আপনি যদি মুক্তবাজারে বিশ্বাস করেন, তাহলে সম্ভবত আপনি বিশ্বাস করবেন যে যেকোনো কিছুই কেনাবেচা করা যায়—এমনকি আপনার নাগরিকত্বও।"
