ব্রিটেন থেকে ফকল্যান্ড পুনর্দখলে ‘জয়ী হবে’ আর্জেন্টিনা: মিলেই; তেল উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে আর্জেন্টিনা 'জয়ী হবে' বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। দ্বীপপুঞ্জের আশপাশের সমুদ্রে তেল উত্তোলনকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার রাতে টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ব্রিটেনকে 'অবনতির দিকে এগিয়ে যাওয়া একটি দেশ' হিসেবে অভিহিত করেন মিলেই। ফকল্যান্ড নিয়ে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের বিরোধে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের বিষয়টিও তার বক্তব্যে উঠে আসে।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের আশপাশের সমুদ্রে তেল উত্তোলনকারী কোম্পানিগুলোকে শাস্তির আওতায় আনতে নতুন আইন করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন মিলেই। এ পদক্ষেপের ফলে ব্রিটেনের সঙ্গে আর্জেন্টিনার উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সম্পর্কের অংশ হিসেবে তিয়েরা দেল ফুয়েগোতে নতুন একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া টেলিভিশন ভাষণে মিলেই বলেন, 'এই মুহূর্তে বিশ্বে আমাদের দাবির পক্ষে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।' তিনি বলেন, 'সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মালভিনাস নিয়ে তার ঐতিহাসিক অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে।'
মিলেই বলেন, 'আর্জেন্টিনা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ। ভৌগোলিকভাবেও এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন, এর সঙ্গে আসা সহিংসতা এবং বর্তমানে ইউরোপকে তাড়া করে বেড়ানো জাতীয় নিরাপত্তার সমস্যাগুলো আর্জেন্টিনায় নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের কাঠামোগত পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, দেশটি অভিবাসন, জনসংখ্যা ও অর্থনীতিসহ একাধিক সংকটের মুখোমুখি। এসব সংকট সমাধান করা কঠিন হবে। স্পষ্টতই তারা অবনতির দিকে যাচ্ছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সমৃদ্ধ হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত আমরাই জয়ী হব।'
পরিকল্পিত নিষেধাজ্ঞা দ্রুত কার্যকর করতে মিলেই একটি আদেশ জারি করবেন বলে জানা গেছে। এর ফলে আর্জেন্টিনা নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করা এলাকায় তেল উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দেশটির আইনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান রকহপার এক্সপ্লোরেশন এবং ইসরায়েলি কোম্পানি নাভিতাস সি লায়ন তেলক্ষেত্রের মালিক। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের কাছে অবস্থিত এই তেলক্ষেত্রে প্রায় ১৭০ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ব্রিটিশ জলসীমায় অবশিষ্ট তেলের মজুতের তুলনায়ও এটি বেশি।
মিলেই বলেন, 'আমাদের জাতীয় দাবি এখন সরাসরি ও স্পষ্ট হুমকির মুখে। এর জবাব দিতে হবে পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। আমরা তা হতে দেব না। এমন পরিস্থিতির সামনে আর্জেন্টিনা চুপ করে বসে থাকবে না। আমাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পক্ষগুলোকে নিবৃত্ত করতে আমরা সব ধরনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেব।'
চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফকল্যান্ড বিরোধ নিয়ে মন্তব্য করার পর আর্জেন্টিনার এই পদক্ষেপের ঘোষণা এলো। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জে কোনো হামলা হলে ব্রিটেনকে সহায়তা নাও করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের 'সহায়তায় এগিয়ে আসবে কি না'—এমন প্রশ্নের জবাবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, 'তোমাদের দেশ তো আমাকে সাহায্য করতে আসেনি।' এ সময় তিনি ইরানের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ রক্ষার সক্ষমতা ব্রিটেনের আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প।
জিবি নিউজকে ট্রাম্প বলেন, 'দেখুন, প্রথম যুদ্ধের সময় আমি সেখানে ছিলাম। সেটা অনেক আগের কথা। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে যুদ্ধটি দেখেছিলাম। আপনারা খুব ভালোভাবে লড়েছিলেন। শক্তভাবেই দ্বীপগুলো ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। তবে জায়গাটি অনেক দূরে।'
এদিকে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের উপকূল থেকে উত্তোলন করা তেল যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহারের সুযোগ দিতে বুয়েনস এইরেস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।
শুক্রবার ভোরে মিলেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন। এ বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য টেলিগ্রাফ।
তিনি বলেন, 'গত তিন বছরে আমরা একই ধরনের চিন্তাভাবনা ও স্বার্থের মিল রয়েছে—এমন দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছি। এখন আমরা বিশ্বাস করি, শান্তিপূর্ণ ও বৈধভাবে আমাদের দাবি তুলে ধরার সময় এসব মিত্র আমাদের পাশে থাকবে।'
তিনি আরও বলেন, 'এই দ্বীপগুলো, আমাদের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সম্পদ অন্যরা নিয়ে যাবে এবং আমাদের সার্বভৌমত্বকে অসম্মান করবে—এমনটা আমরা মেনে নিতে পারি না।'
মিলেই আরও বলেন, 'সম্প্রতি আমরা অনেক সমর্থনও পেয়েছি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ফকল্যান্ডস নিয়ে তাদের ঐতিহাসিক অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে। এটি শুধু কথার কথা নয়। কারণ তারা বুঝতে পারছে, আর্জেন্টিনা পশ্চিমা মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নির্ভরযোগ্য অংশীদার এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। আগামী বহু দশকেও আমরা তাদের মূল্যবান মিত্র হয়ে থাকতে পারি।'
ট্রাম্পের মন্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে মিলেইর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ওয়াশিংটন ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার কারণে।
মিলেই এ সপ্তাহে ট্রাম্পের মন্তব্যকে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও 'পবিত্র' জাতীয় দাবির জন্য 'খুবই গুরুত্বপূর্ণ' ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এক-তৃতীয়াংশ তেলক্ষেত্রের মালিকানা লন্ডনে তালিকাভুক্ত কোম্পানির
রকহপার ও নাভিতাস আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ফকল্যান্ডের উত্তরে সি লায়ন তেলক্ষেত্রে খননকাজ শুরু করতে পারে। ২০২৮ সালের শুরু থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে তেল রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। তেলক্ষেত্রটি দ্বীপগুলোর প্রায় ১৩৭ মাইল উত্তরে এবং ৩০ বছরের বেশি সময় উৎপাদন সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জুনে আর্জেন্টিনা রকহপারের তেল উত্তোলন পরিকল্পনাকে 'অবৈধ' বলে হুমকি দেয়। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত রকহপারের মালিকানা ৩৫ শতাংশ, বাকি ৬৫ শতাংশ নাভিতাসের।
ফকল্যান্ডসের তেল উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা মিলেই ও ট্রাম্পের মধ্যে নতুন বিরোধ তৈরি করতে পারে। চলতি মাসে তাদের প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র বলেছেন, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা ব্রিটিশ এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার তাদের রয়েছে। তারা ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে থাকতে চায় এবং তাদের প্রতি ব্রিটেনের অঙ্গীকার অটুট।
মিলেইর কঠোর অবস্থান
ফকল্যান্ড নিয়ে মিলেইর ক্রমবর্ধমান কঠোর অবস্থানের সর্বশেষ উদাহরণ তার এই ভাষণ। আগে তিনি কূটনীতি ও দ্বীপবাসীদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে দাবি এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ছিলেন।
তবে অভ্যন্তরীণ চাপও তার অবস্থান কঠোর করার কারণ হতে পারে। মূল্যস্ফীতি কমানো ও বাজেট ঘাটতি কমানোর জন্য প্রশংসিত হলেও তার জনপ্রিয়তা কমেছে এবং আগামী বছর পুনর্নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ডানপন্থী শিবিরে তার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিয়েরেল ফকল্যান্ড ইস্যুতে কট্টর অবস্থানের জন্য পরিচিত। ২০১৩ সালের গণভোটে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ ফকল্যান্ডবাসী যুক্তরাজ্যের ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে থাকার পক্ষে ভোট দেন।
