এক বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারের চেহারা বদলে যাবে: অর্থমন্ত্রী
আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের শেয়ারবাজারের চেহারা বদলে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটলে এই সময়ের মধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রবিবার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব সিকিউরিটিজ কমিশনস (আইওএসসিও)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত 'ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬'-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক বা এডিবিসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর স্পষ্ট বার্তা দেন। আইএমএফের শর্ত মানা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, তাদের প্রোগ্রাম বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'আইএমএফের প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে দিয়েছি। আপনারা জানেন, দেখছেন তো। তাদের কন্ডিশন আমাদের কাছে অ্যাকসেপ্টেবল না। আমি মার্কেট থেকে আমার টাকা রেইজ করতে চাই। ২০৩৪ সালের মধ্যে আমরা ট্রিলিয়ন ডলারের ইকোনমিতে যেতে চাই। আমরা আইএমএফের ওপর ডিপেন্ড করতে পারি না। আইএমএফ পয়সা দেবে, বিশ্বব্যাংক পয়সা দেবে, এডিবি পয়সা দেবে—এভাবে আমরা এগোতে পারব না।'
তিনি আরও জানান, দেশের বার্ষিক ৫০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন এবং উন্নয়ন সহযোগীরা যৌথভাবে ১০ বিলিয়ন ডলার দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়। সময়সীমার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে নিজেদের বাজার থেকেই অর্থ সংস্থানের ওপর তাগিদ দেন তিনি।
উন্নয়ন অর্থায়নে আইএমএফের বিকল্প হিসেবে দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে মূল উৎস হিসেবে গড়ে তোলার জোর তাগিদ দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'ক্যাপিটাল মার্কেট ইজ দ্য আন্সার, বন্ড মার্কেট ইজ দ্য আন্সার।'
নিউইয়র্ক ও হংকংয়ের মতো বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সংযোগ ঘটানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে ডলার বন্ড, পাণ্ডা বন্ড, সামুরাই বন্ড, স্থানীয় মুদ্রার বন্ড এবং বাংলাদেশকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ইকুইটি ফান্ডের মতো বিভিন্ন আর্থিক উপকরণ ব্যবহার করা হবে।
এছাড়া প্রাইভেট ও পাবলিক দুই খাতের জন্যই সিকিউরাইজেশন ও নতুন নতুন প্রোডাক্টের মাধ্যমে বাজার থেকে অর্থ তোলার সুযোগ তৈরি করা দরকার বলে জানান তিনি।
বড় প্রকল্পের অর্থায়নে সরকারের অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমরা প্লেন কিনতে গেলে বাংলাদেশ গভর্নমেন্টকে এত টাকা দিতে হবে কেন? এটা এন্টারপ্রাইজ, মার্কেটে যেতে হবে। বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট কেন টাকা দেবে? আপনি ব্যবসা করবেন, টাকা নেবেন। সরকারের ট্যাক্সপেয়ারের টাকা দিয়ে ব্যবসা চালানো যাবে না। দ্য কস্ট অব ফান্ড যদি আমি কমাতে না পারি, আমি বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারব না।'
বিগত সময়ে পুঁজিবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, অটোমেশন এবং সিডিবিএল তৈরি হলেও সার্বিক পলিসি সাপোর্টের অভাবে বাজার বিকশিত হতে পারেনি বলে খোদ অর্থমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ না থাকার কারণে ক্যাপিটাল মার্কেট রিয়েলি টেক-অফ করতে পারেনি।'
বর্তমান বাজার পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে একে 'রেসকিউ অপারেশন' হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, 'এটা এখন রেসকিউ অপারেশন, স্যালভেজ অপারেশন। অনেক সিদ্ধান্ত বেদনাদায়ক হতে পারে, কঠিন হতে পারে। কিন্তু আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।'
বাজারকে শক্তিশালী করতে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বিমা খাত, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার ও ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং সংস্থাগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতে হবে। অগভীর এই বাজারে নতুন এনভায়রনমেন্ট তৈরি করে সুশাসনযুক্ত ও সেলফ-রেগুলেশনে বিশ্বাসী কোম্পানিগুলোকে এনে বাজারের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার জোর তাগিদ দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করেন অর্থমন্ত্রী। সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত বৈঠকের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, বাজারের আকার ছোট হওয়া সত্ত্বেও ১৬টি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ভালো সাড়া পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ মার্কেট তো অত বড় কোনো কিছু না। কিন্তু আমি ওয়াল স্ট্রিটে যাওয়ার সাহস করেছি। ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ পরিচালনাকারী ১৬টি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের রেসপন্সে আমি সারপ্রাইজড, অনেস্টলি।' আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্ব ও বাজারের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন বলে তিনি জানান।
