বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা: ‘ব্যান্ড-এইড’ দিয়ে কি সুশাসনের গভীর ক্ষত সারবে?
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের অর্থনীতির বিষয়ে এমন এক সতর্কতামূলক পূর্বাভাস দিয়েছে, যেখানে কোনো অযৌক্তিক আশাবাদ বা শিথিলতার সুযোগ রাখা হয়নি।
সরকার যখন অর্থনীতিতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখছে—যেখানে ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে দ্বিগুণ করে ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে—আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাস তার সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র তুলে ধরছে। আইএমএফ প্রক্ষেপণ করেছে যে, ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াবে মাত্র ৩ শতাংশে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এর পূর্ববর্তী তিন বছরে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে; যা সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যের অর্ধেকেরও কম। এর ফলে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির দেশে পরিণত হতে পারে।
মূল কারণ: সুশাসনের গভীর সংকট
অর্থনৈতিক অগ্রগতির এই তীব্র পতনের কারণ কী? উত্তরটি নিহিত রয়েছে দুটি শব্দের মধ্যে—সুশাসনের সংকট।
এই পর্যবেক্ষণ নতুন কিছু নয়, তবে সংকটের গভীরতা বিশ্বব্যাংকের 'ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরস' (ডব্লিউজিআই)-এর তথ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সুশাসন কোনো উন্নয়নের আকস্মিক উপজাত বা পার্শ্বফল নয়; এটি যেকোনো অর্থনীতির অপরিহার্য ভিত্তি। এটি এমন এক অদৃশ্য অবকাঠামোর মতো কাজ করে, যা সম্ভাবনাকে টেকসই সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত করে।
অর্থনীতির বিকাশে সুশাসন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বব্যাংক তার ডব্লিউজিআই প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছে, সুশাসন—যা কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং ঐতিহ্যের সমষ্টি—উন্নয়নের ফলাফল নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে, শক্তিশালী গণসেবা নিশ্চিত করে এবং সুযোগের পরিধি বাড়ায়। কিন্তু সুশাসন ভেঙে পড়লে এই অর্জিত উন্নয়ন অনিবার্যভাবেই মুখ থুবড়ে পড়ে।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা এমন একটি ব্যবস্থারই প্রমাণ দিচ্ছে, যা তার সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব পালনেই হিমশিম খাচ্ছে। আইএমএফের এই হতাশাজনক পূর্বাভাস মূলত সুশাসনের এই বিপর্যয়েরই সরাসরি প্রতিফলন।
প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়ের পরিমাপ
বিশ্বব্যাংকের সুশাসন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন, তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক। এই সূচকটি সুশাসনের ছয়টি মাত্রার সমষ্টিগত মান প্রকাশ করে: মতপ্রকাশ ও জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরকারের কার্যকারিতা, নিয়ন্ত্রণমূলক মান, আইনের শাসন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ।
ছয়টি সূচকের মধ্যে বাংলাদেশ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সরকারের কার্যকারিতায় সামান্য উন্নতি করেছে। তবে সার্বিক স্কোর মোটেও উৎসাহব্যঞ্জক নয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় ২০১৫ সালে ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৪২.০৩, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯.১১-এ। সরকারের কার্যকারিতাও গত এক দশকে ৪১.১৯ থেকে সামান্য বেড়ে ৪৩.২৪ হয়েছে। তবে বাকি চারটি সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নমুখী। মতপ্রকাশ ও জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক মানের সার্বিক স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৩৯ থেকে ৪৯-এর ঘরেই আটকে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কেবল আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের চেয়ে সামান্য এগিয়ে রয়েছে। অথচ যেসব দেশে কার্যকর সুশাসন ব্যবস্থা রয়েছে, তাদের স্কোর সাধারণত ৯০-এর ওপরে থাকে।
এই সূচকগুলোতে দুর্বল স্কোরের সম্মিলিত প্রভাব হিসেবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের জন্য এক অসম্ভব কাজে পরিণত হয়েছে এবং এই সূচকে বাংলাদেশ সবসময়ই সর্বনিম্ন স্কোর পেয়েছে। ২০১৫ সালে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ছিল মাত্র ২৬.৩৩, যা এক দশক পর বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোটে ২৮.২০-এ। দুর্নীতি দমনে বাংলাদেশের এই ব্যর্থতা প্রতিবছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের 'দুর্নীতি ধারণা সূচকে'ও প্রতিফলিত হয়, যেখানে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্রাস করছে, সক্ষমতা নষ্ট করছে এবং অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে।
অবাধ এই দুর্নীতির মূলে রয়েছে একটি আপসকামিতাপূর্ণ বিচারিক কাঠামো। 'ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট'-এর রুল অব ল ইনডেক্স—যা পুলিশ, আদালত ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা মূল্যায়ন করে—সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় তলানিতে। গত এক দশকে বাংলাদেশের স্কোর ১.০০-এর মধ্যে ০.৩০ থেকে ০.৩৪-এর মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে, যা বৈশ্বিক গড় (০.৪৭–০.৫০) এবং দক্ষিণ এশিয়ার গড় (০.৩৬–০.৩৯)-এর চেয়ে অনেক নিচে। আদালতে বছরের পর বছর লাখ লাখ মামলা ঝুলে থাকায় কার্যকর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, ফলে দুর্নীতি অবাধে ডালপালা মেলছে।
এই সমস্ত স্কোর বাংলাদেশের সুশাসনের এক ভঙ্গুর চিত্র তুলে ধরে। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনা, বাজেট ঘাটতি, রাজস্ব সংকট, ঋণের ফাঁদ, শোচনীয় কর-জিডিপি অনুপাত, দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের স্থবিরতা, বেসরকারি খাতের সীমাবদ্ধতা এবং লাল ফিতার দৌরাত্ম্য—সবই মূলত এই সুশাসনের সংকটের ফল। আর এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার যাবতীয় আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরই বইতে হচ্ছে।
শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান ও সংস্কারের দ্বিধাদ্বন্দ্ব
২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে ব্যাপক এবং মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু একের পর এক সংস্কার উদ্যোগ সবসময়ই গতি হারিয়েছে। বর্তমানের নীতিগত সমন্বয়গুলোর মধ্যে ক্ষয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করার মতো গভীরতার বড় অভাব রয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিবিদরা সবসময় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও তা সক্রিয়ভাবে সংস্কার করার পক্ষে কথা বলেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অত্যন্ত পরিষ্কার। তারা বিশ্বাস করেন, কোনো অর্থনীতি শূন্যতার মধ্যে কার্যকরভাবে চলতে পারে না। প্রতিষ্ঠানগুলোই মূলত বাজারের সেই 'রুলস অব দ্য গেম' ঠিক করে দেয়, যার ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি বিকশিত হবে নাকি স্থবির হয়ে পড়বে। অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী চারজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ—ডগলাস নর্থ, ড্যারন আজিমোগলু, জেমস রবিনসন এবং সাইমন জনসন দেখিয়েছেন যে, ভূগোল বা সংস্কৃতির চেয়ে সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।
বিশ্বব্যাংকের সুশাসন প্রতিবেদন প্রবৃদ্ধির জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানের কথাই বলে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ পর্যন্ত 'শোষণমূলক প্রতিষ্ঠানে' (এক্সট্র্যাক্টিভ ইনস্টিটিউশন) রূপ নিয়েছে; যেখানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা গুটি কয়েক অনিয়ন্ত্রিত অভিজাত শ্রেণির হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে। সেই ক্ষমতাশালী শ্রেণি পুরো ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ জনগণের সম্পদ নিজেরা শোষণ করে নিজেদের ভাগ্য গড়েছে।
এই ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হলে আপসহীন সংস্কারের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানের দিকে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
গভীর ক্ষতে ক্ষণস্থায়ী ব্যান্ড-এইড
বাস্তবে অর্থপূর্ণ কোনো সংস্কার এখনও দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন উল্লেখ করেন, কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকৃত অগ্রগতি অত্যন্ত সীমিত।
তিনি বলেন, 'ব্যাংকিং খাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে একটি বড় উদ্যোগ লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশিরভাগ সার্কুলার—যেমন ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ বা জরুরি তারল্য সহায়তা—প্রকৃত কোনো সংস্কার নয়; এগুলো কেবল রক্তক্ষরণ ঢেকে রাখার সাময়িক ব্যান্ড-এইড ছাড়া আর কিছুই নয়।'
তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে নানা সংকট চলা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন সমমানের অন্যান্য দেশের চেয়ে খারাপ করছে, তা বুঝতে সুশাসনের বিষয়টিই বড় ব্যাখ্যা দেয়। কারণ ওইসব দেশও তো একই বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তারা একই ধরনের বাহ্যিক ধাক্কার মুখোমুখি হচ্ছে, তবুও তাদের অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো।
রাজনৈতিক সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, অর্থনীতির কাঠামো মূলত দাঁড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর। রাজনৈতিক ভারসাম্য যদি পরিবর্তিত না হয়, তবে অর্থনৈতিক গতি পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন—তা অর্থনীতি কতটা দ্রুত বাড়বে এবং এর সুফল কারা ভোগ করবে উভয় বিচারেই।
তিনি বলেন, 'রাজনীতি আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে তা দেখুন। গুগল ট্রেন্ডসে "পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট" লিখে সার্চ করলেই দেখতে পাবেন ২০২৪ সালের আগস্টের পর এটি কীভাবে শীর্ষে উঠেছিল এবং পরবর্তীতে প্রায় শূন্যে নেমে গেছে। নতুন একটি রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে সব আলোচনা এখন পুরোপুরি থমকে গেছে—আমরা তা অর্জন করতে পেরেছি বলে নয়, বরং আমরা তা পারিনি বলে এবং হয়তো সেই আশাও ছেড়ে দিয়েছি।'
গত জুনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী দশটি মূল অগ্রাধিকার তুলে ধরেছিলেন; যেখানে স্বচ্ছ, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন গড়ে তোলার বিষয়টিকে একদম শেষে—দশ নম্বরে রাখা হয়েছিল।
রূপক অর্থে বলতে গেলে, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত অসংগতি দূর করতে প্রয়োজন অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো আমূল পরিবর্তন। কিন্তু অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী সংস্কার পদক্ষেপগুলো যদি কেবল সামান্য 'ব্যান্ড-এইড' হিসেবেই কাজ করে, তবে এই রুগ্ণ ব্যবস্থা কি কোনোদিন সেরে উঠবে?
কোনো দেশ শোষণমূলক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুষ্টচক্র ভাঙতে ব্যর্থ হলে তার পরিণতি কী হতে পারে, তা ড্যারন অ্যাসেমোগলু ও জেমস এ রবিনসনের বহুল আলোচিত বই 'হোয়াই নেশনস ফেইল'-এ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
