দাবানলের ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে পুরো অঞ্চল, জাকার্তার বিরুদ্ধে মামলা করতে সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়াকে ইন্দোনেশীয়দের আহ্বান
প্রতিবার বাড়ি ফিরেই ক্রিস্টায়েন আলবার্ট ঘরের প্রবেশপথের পাশে রাখা টেবিল থেকে অক্সিজেনের এক ডজন ক্যানের যেকোনো একটি হাতে তুলে নেন। তার বাড়ি ইন্দোনেশিয়ার মধ্য কালিমান্তান প্রদেশে।
তার এলাকার বাতাস ধুলোমাখা হলুদাভ-কমলা রং ধারণ করেছে। বায়ুমান বিপজ্জনক মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
৩১ বছর বয়সী সফটওয়্যার প্রকৌশলী আলবার্ট 'দিস উইক ইন এশিয়া'কে বলেন, 'স্পষ্টভাবে টের পাই বাইরে বেরোলেই আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, যা আমার কাজেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। এই ধোঁয়াশার মধ্যে বসবাস করা ভয়াবহ।'
তিনি বলেন, 'এই ভয়াবহ দাবানল মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ নিতে অবিশ্বাস্য রকমের দেরি হচ্ছে। সোজাসসুজি বললে, আমরা ক্ষুব্ধ।'
আলবার্ট সেইসব ইন্দোনেশীয়ের একজন, যারা দাবানল মোকাবিলায় জাকার্তার ভূমিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশি সরকারগুলোর পদক্ষেপ চাইছেন। ধোঁয়াশায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিবেশী দেশগুলোর সরকারকেও তারা পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
আলবার্ট বলেন, 'দয়া করে আমাদের ক্ষমা করুন। আপনারা আমাদের সরকারকে আইনের আওতায় আনতে মামলা করতে সাহায্য করতে পারেন; আমরা আপনাদের সমর্থন করব।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক ব্যবহারকারী বিদেশি রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থাগুলোকে আইন অনুযায়ী জাকার্তার কাছে 'জবাবদিহি দাবি' করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ওই ব্যবহারকারী বলেন, 'দয়া করে আমাদের দুর্ভোগ দেখে আপনারা মুখ ফিরিয়ে থাকবেন না। কালিমান্তানের আপনাদের সাহায্য প্রয়োজন।'
এ বছর ইন্দোনেশিয়াজুড়ে, বিশেষ করে সুমাত্রা ও কালিমান্তানে ছড়িয়ে পড়া আগুনের কারণে ধোঁয়াশা আরও তীব্র হয়েছে। শুষ্ক আবহাওয়ায় বনভূমি ও পিটভূমিতে লাগা আগুন ছড়িয়ে পড়ছে।
বিষাক্ত ধোঁয়া সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, থাইল্যান্ড; এমনকি ভিয়েতনাম পর্যন্ত পৌঁছেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লাখো মানুষ গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ধোঁয়াশা বিপর্যয়ের একটির সঙ্গে লড়ছেন। তাদের অনেকেই এর বিরূপ স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে অভিযোগ করছেন।
বুধবার সিঙ্গাপুরের বায়ুমানের অবনতি হয়ে এ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো 'খুব অস্বাস্থ্যকর' পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, ধোঁয়াশার কারণে মালয়েশিয়ার কয়েকটি রাজ্যে স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে।
দক্ষিণ সুমাত্রায় বসবাসকারী রিসায়োগি উইকসানা 'দিস উইক ইন এশিয়া'কে বলেন, তার প্রদেশে ধোঁয়াশার অসংখ্য হটস্পট থাকায় অন্যান্য দেশের মানুষের কাছে তিনি দায়বদ্ধতা ও অপরাধবোধ অনুভব করেন।
তিনি বলেন, 'সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে ফর্মুলা ওয়ান রেস চলাকালে বিখ্যাত কয়েকজন ব্যক্তি এই বিপর্যয় নিয়ে সরব হয়েছিলেন। আমি সত্যিই আশা করেছিলাম, এরপর বিষয়টি আরও বেশি আন্তর্জাতিক মনোযোগ পাবে।'
আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের ইন্দোনেশিয়া স্টাডিজ প্রোগ্রামের ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো ম্যাক্সওয়েল লেন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের এই ক্ষোভ সাম্প্রতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপকে অপর্যাপ্ত মনে হওয়ার কারণে বাড়তে থাকা হতাশারই প্রতিফলন।
তিনি বলেন, 'নাগরিক সমাজের অনেকে মনে করেন এসব দুর্যোগের ব্যাপারে সরকার উদাসীন।'
লেন বলেন, সরকার সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোকে জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেনি। এর মধ্যে রয়েছে গত বছর সুমাত্রায় হওয়া বন্যা, যাতে এক হাজারের বেশি মানুষ মারা যান, এবং আগস্টে ফ্লোরেস অঞ্চলে হওয়া ভূমিকম্প, যার কারণে কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
ইন্দোনেশিয়ার পরিবেশ মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার জানিয়েছে, দেশটিতে বনাঞ্চলের আগুন এক মাসের মধ্যে নেভানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে সোমবার সরকারের যোগাযোগ সংস্থা জানায়, দাবানল প্রতিরোধের কাজের গতি বাড়াতে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো।
এ বছর এল নিনোর প্রভাবে দাবানল পরিস্থিতি তীব্র হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ এর তীব্রতাকে 'গডজিলা-পর্যায়ের' বলে বর্ণনা করেছেন।এল নিনোর কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও শুষ্ক আবহাওয়া আগুনের বিস্তার বাড়িয়ে দিতে পারে।
ধোঁয়াশা মোকাবিলায় বৃহস্পতিবার দক্ষিণ সুমাত্রার আকাশে শুষ্ক বরফ ছড়িয়ে দেওয়ার একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সমন্বয়বিষয়ক নিরাপত্তামন্ত্রী দুদুং আবদুরাচমান।
এর আগে বনাঞ্চলে বিরাজমান দীর্ঘস্থায়ী দাবানলকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করার সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন এই মন্ত্রী।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর দুদুং বলেন, 'এখনই [জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা] না। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।'
ইন্দোনেশিয়াকে দাবানল মোকাবিলায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। তবে প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাকার্তা এখনও তাদের সহায়তা গ্রহণ করেনি।
মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদি রোববার বলেন, তার দেশ আগুন নেভানোর জন্য একটি উড়োজাহাজ, তিনটি হেলিকপ্টার ও কর্মী পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এখনও তারা ইন্দোনেশিয়ার জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
২৭ বছর বয়সী ইন্দোনেশীয় নাগরিক আবি ভিক্টর বলেন, তার দেশ এখনও সহায়তা গ্রহণ না করায় তিনি 'হতাশ'।
তিনি বলেন, 'সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের করার তেমন কিছুই নেই—এ কথা ভেবে আমি গভীরভাবে দুঃখিত।'
এদিকে, ইন্দোনেশিয়ার এক কর্মকর্তার মন্তব্যও অনলাইনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেছিলেন, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া জাকার্তার কাছ থেকেই অক্সিজেন পায়।
তার এই মন্তব্যের পর উপহাসের পাশাপাশি বন ও পিটভূমির আগুন মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম 'কমপাস'-এর বরাত দিয়ে শনিবার জানানো হয়, সরকারের যোগাযোগ সংস্থার নবনিযুক্ত প্রধান সিয়াহগান্দা নাইঙ্গোলান বলেন, 'আমরা শুধু ধোঁয়াই পাঠাই না, ধোঁয়া না থাকলে অক্সিজেনও পাঠাই। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার অক্সিজেন আসে আমাদের বন থেকে।'
গত মাসে ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক সমাজের কয়েকটি সংগঠনের একটি জোট দাবানল মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রেসিডেন্ট প্রবোও ও তার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরিবেশবিষয়ক অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানায় তারা।
তবে এর আগে অন্যদের নেওয়া একই ধরনের উদ্যোগগুলো খুব বেশি সফল হয়নি।
সিঙ্গাপুরের টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রী গ্রেস ফু বুধবার বলেন, আগুনের জন্য দায়ী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তার দেশ 'সব বিকল্প খোলা রাখবে'।
২০১৪ সালের আন্তঃসীমান্ত ধোঁয়াশা দূষণ আইনের আওতায় আগুন লাগানো বা আগুন লাগতে দেওয়ার দায়ে কোনো কোম্পানি দোষী সাব্যস্ত হলে প্রতিদিন সর্বোচ্চ এক লাখ সিঙ্গাপুরি ডলার (৭৭ হাজার ৯৫১ মার্কিন ডলার) জরিমানা হতে পারে। তবে মোট জরিমানার পরিমাণ দুই মিলিয়ন সিঙ্গাপুরি ডলারের বেশি হতে পারবে না।
এ বিষয়ে কোনো তদন্ত চলছে কি না, জানতে চাইলে সিঙ্গাপুরের জাতীয় পরিবেশ সংস্থা (এনইএ) জানায়, তারা পরিস্থিতির ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখছে এবং আগুনের হটস্পটগুলোর তথ্য সংগ্রহ করছে।
২০১৫ সালে ধোঁয়াশার তীব্র প্রকোপের পর ওই আইনের আওতায় ইন্দোনেশিয়ার ছয়টি কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছিল। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দুটি মামলার কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। বাকি চারটি কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছিল বলে জানায় এনইএ।
২০১৫ সালের ধোঁয়াশা পরিস্থিতি নিয়ে সিঙ্গাপুর কয়েকটি ইন্দোনেশীয় কোম্পানির বিরুদ্ধে সমন জারি করলে তৎকালীন ইন্দোনেশীয় সরকার এর সমালোচনা করেছিল।
তবে রিসায়োগি তার দেশের সরকারের আগুন মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান। হতাশা প্রকাশ করে তিনিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন।
এমনকি জাকার্তার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য অন্যান্য দেশের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, 'এখানে কী ঘটছে, তা বিশ্ববাসীর জানা প্রয়োজন।'
তিনি আরও বলেন, 'আগুন মোকাবিলায় সরকারকে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করার জন্য যা যা প্রয়োজন, সবার তা করা উচিত।'
