আইএমএফের শর্ত পূরণে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট হার চালুর লক্ষ্য
মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) ক্ষেত্রে বিদ্যমান সব ধরনের ছাড় ও অব্যাহতি ধাপে ধাপে তুলে নিয়ে, ২০৩০ সালের মধ্যে একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পরিবহন খাতকে এই স্ট্যান্ডার্ড বা প্রমিত হারের বাইরে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ওয়াশিংটনে আইএমএফের কারিগরি কমিটির সঙ্গে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে—জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রতিনিধি দল এই পর্যায়ভিত্তিক ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে বলে এনবিআরের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা টিবিএস'কে নিশ্চিত করেছেন।
রাজস্ব খাতের সংস্কার প্রস্তাবনা এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সরেজমিনে মূল্যায়নে, আগামী নভেম্বরে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরে আসতে পারে।
বর্তমানে ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য, কম্পিউটার সামগ্রী, মেট্রোরেল সেবা, রেস্তোরাঁ, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপারসহ—৫০০টিরও বেশি পণ্য ও সেবায় ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত রেয়াতি বা হ্রাসকৃত ভ্যাট হার প্রয়োগ করা হচ্ছে কিংবা এসআরও বা সংবিধিবদ্ধ আদেশের অধীনে সম্পূর্ণ অব্যাহতির সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত সংস্কার পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব পণ্যের ওপর থেকে ধাপে ধাপে ছাড় প্রত্যাহার করা হবে এবং সেগুলোকে ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট হারের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ ভ্যাট কর্মকর্তা টিবিএস'কে বলেন, "আইএমএফ আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে কীভাবে বাংলাদেশ নিজস্ব রাজস্ব বৃদ্ধি করবে এবং ধীরে ধীরে কর অব্যাহতির সুবিধা থেকে সরে আসবে। আমরা কিছু অপরিহার্য খাত বাদ রেখে ধাপে ধাপে ভ্যাট সুবিধা প্রত্যাহার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে একক ভ্যাট হার চালু করার প্রস্তাব দিয়েছি। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত কয়েকটি বৈঠকে আমরা একটি প্রাথমিক সময়সূচি, এবং লক্ষ্যভিত্তিক পণ্য ও সেবার তালিকা আইএমএফকে জানিয়েছি।"
প্রস্তাব তৈরির সাথে যুক্ত অপর এক কর্মকর্তা জানান, আইএমএফ মূলত সব ধরনের ভ্যাট সুবিধা পুরোপুরি বিলোপের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিল। তবে দেশের বিদ্যমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, চিকিৎসা এবং শিক্ষা খাতের জন্য এই সুবিধা বহাল রাখার বিষয়ে জোর দিয়েছে সরকার।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদিত ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায়– রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাত ও জ্বালানি খাতে গভীর সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিল বাংলাদেশ, তবে পরে এর বেশ কয়েকটি প্রধান শর্ত পালনে পিছিয়ে পড়ে।
সরকার কি এটি বাস্তবায়ন করতে পারবে?
সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, অতীতে করা এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি পূরণের ব্যর্থতার ইতিহাসই এমন ধারণার প্রধান কারণ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সরকারের এই প্রস্তাবের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, "সরকার যে এবার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে—আইএমএফের কাছে তার কী গ্যারান্টি আছে?"
তিনি বলেন, "সরকার যদি ২০৩০ সালের মধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেয়, তাহলে আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ তার অনেক আগেই শেষ হয়ে যাবে। তাই আইএমএফ এই কর্মসূচির নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কার্যকরভাবে কী কী বাস্তবায়ন করা সম্ভব—তার সুনির্দিষ্ট, বাস্তবমুখী প্রতিশ্রুতি এবং যৌক্তিক ব্যাখ্যা চাইবে।"
তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে দেশে মোট কর ছাড়ের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৬.৮ শতাংশ, যেখানে প্রকৃত রাজস্ব আদায় মাত্র ৬.৪ শতাংশ। "এই বিশাল কর সুবিধা তুলে নিলে ঠিক কত টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে, সরকারকে তার স্পষ্ট পরিমাণ বা হিসাব দেখাতে হবে।"
দাম বাড়তে পারে শত শত পণ্যের
বর্তমানে ভ্যাট আইনের তিনটি ভিন্ন তফসিল এবং এনবিআরের একাধিক সংবিধিবদ্ধ আদেশের (এসআরও) প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে, ৫০০টিরও বেশি পণ্য ও সেবায় হ্রাসকৃত বা কম হারে ভ্যাট প্রযোজ্য রয়েছে। এসব পণ্যের ওপর একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট কার্যকর করা হলে, স্বভাবতই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন পণ্য ও সেবার খরচ অনেকটা বেড়ে যাবে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রী, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কম্পিউটার এক্সসরিজ, সমুদ্রগামী জাহাজ, মেট্রোরেল, রড-স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, রেস্তোরাঁ, নন-ব্র্যান্ডের পোশাক, স্যানিটারি ন্যাপকিন এবং ডায়াপারের ক্ষেত্রে বর্তমানে কার্যকর থাকা ৭.৫ থেকে ১০ শতাংশ রেয়াতি ভ্যাট হার—২০২৮ সালের জুন এবং ২০৩০ সালের জুনে তাদের বিদ্যমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর বাড়ানো হবে না। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লিফটের ওপর ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রযোজ্য ১০ শতাংশ রেয়াতি সুবিধাটির মেয়াদও আর বাড়ানো হবে না।
শুধু তাই নয়, রাজস্ব কর্তৃপক্ষ সারাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য কার্যকর থাকা প্যাকেজ-ভিত্তিক ভ্যাট হার সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে—সেটিকেও স্ট্যান্ডার্ড বা প্রমিত ভ্যাট হারের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর থাকা হ্রাসকৃত ভ্যাট হারও পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
যেসব খাত থাকছে সুরক্ষায়
নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে মূল্যস্ফীতি থেকে সুরক্ষা দিতে কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণের পাশাপাশি চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, লবণ এবং মরিচের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় মৌলিক খাদ্যপণ্যে ভ্যাট ছাড় পুরোপুরি বহাল রাখা হবে। এর পাশাপাশি গণপরিবহন, প্রাথমিক ও মৌলিক শিক্ষা, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ওপরও ভ্যাট সুবিধা অব্যাহত থাকবে।
বিরোধিতা করতে পারেন ব্যবসায়ীরা
এর আগে ২০১৫ সালে যখন সরকার দেশে ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট হার চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল, তখন ব্যবসায়ী সমাজের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সরকার। ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, একই হারে ভ্যাট চাপানোর নতুন কোনো প্রয়াসও ফের একই ধরনের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে।
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক টিবিএস'কে বলেন, "একক বা অভিন্ন ভ্যাট হার চালু করা অসম্ভব কিছু নয়, তবে মূল সমস্যাটি হলো ভ্যাটের হারের পরিমাণ নিয়ে। সামগ্রিক ভ্যাটের হার কিছুটা কমিয়ে এনে যদি একটি সুনির্দিষ্ট অভিন্ন হার নির্ধারণ করা হয়, তাহলে ব্যবসায়ীদের আপত্তি করার কোনো বড় কারণ থাকবে না।"
এনবিআরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিভিন্ন কর ছাড় ও রেয়াতি সুবিধার কারণে এনবিআর যে পরিমাণ ভ্যাট রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তার পরিমাণ ছিল ১.২৯ লাখ কোটি টাকারও বেশি—যা দেশের মোট জিডিপির ৩.৩ শতাংশের সমান। ওই একই অর্থবছরে ভ্যাট খাত থেকে এনবিআরের প্রকৃত রাজস্ব আদায় ছিল ১.২৫ লাখ কোটি টাকা—অর্থাৎ আদায়ের চেয়ে অব্যাহতির পরিমাণই ছিল বেশি।
