বন বাঁচাতে ১ লাখ ৪০ হাজার গাছ কেটে ফেলছে ভারত—কারণ কী?
ভোরের আলো ফুটতেই এসব দিনে ভারতের মধ্যপ্রদেশের ডিন্ডোরি-মাণ্ডলা সড়কের পাশের শালবনে সবচেয়ে বেশি যে শব্দটি শোনা যায়, তা হলো শুকনো পাতার ওপর মানুষের পায়ের চলার শব্দ।
গ্রামবাসীরা তিন দিন আগে কেটে ছাল ছাড়িয়ে ফেলা গাছগুলোর দিকে ছড়িয়ে পড়েন, যেগুলোর কষ বাইরে বেরিয়ে এসেছে। এবং সেখানে কাণ্ডের ওপর উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে আছে তাদের অপরাধী – শাল হার্টউড বোরার, এক ধরণের লম্বা শিংওয়ালা গুবরে পোকা যা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই গাছগুলোর জন্য অভিশাপ হয়ে রয়েছে।
গ্রামবাসীরা পোকাগুলো হাতে ধরে সংগ্রহ করেন এবং ব্যাগ বা কাচের বয়ামে ভরে রাখেন। পরে সেগুলো দিয়ে মালা তৈরি করা হয়। পোকার লম্বা শুঁড় মালা বোনার কাজে সহায়তা করে। তবে এসব মালা কোনো অলংকার হিসেবে ব্যবহারের জন্য নয়। বরং গ্রামবাসীদের জন্য পোকাগুলো বহন করে জেলার আটটি সংগ্রহকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার কাজটি সহজ করতেই এভাবে মালা বানানো হয়।
প্রতিটি পোকার জন্য দেওয়া হয় ২ রুপি।
চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ১৯ লাখ ২৫ হাজার ১১৮টি পোকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর জন্য রাজ্যের বন বিভাগের খরচ হয়েছে ৩৮ লাখ ৫০ হাজার রুপি।
হপ্লোসেরামবিক্স স্পিনিকর্নিস, যা সাধারণভাবে শাল কাঠভেদী পোকা নামে পরিচিত, একটি ধ্বংসাত্মক কীট। ১৮৯৭ সালেই শালগাছের জন্য এটিকে হুমকি হিসেবে প্রথম নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
এখন বড় ধরনের পোকার সংক্রমণের পর সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বৃহৎ শালগাছ কাটার কার্যক্রমের কেন্দ্রে রয়েছে এই পোকা। কয়েক সপ্তাহ আগে কেন্দ্রীয় সরকার সংক্রমিত ১ লাখ ৪৭ হাজার শালগাছ কাটার অনুমোদন দিয়েছে।
শাল, অর্থাৎ শোরিয়া রোবাস্টা, মধ্য ভারতের শুষ্ক পাতাঝরা বনাঞ্চলের অন্যতম প্রধান বৃক্ষপ্রজাতি। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ওডিশা, ঝাড়খণ্ড এবং উত্তরপ্রদেশের কিছু অংশজুড়ে বিস্তৃত বনভূমির বড় একটি অংশ এই গাছকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।
কানহা ও পেঞ্চের মতো বাঘের অভয়ারণ্যগুলোর বনভূমিতেও শালগাছের ছাউনি আবাসস্থলের বড় একটি অংশ জুরে রয়েছে।
শালকাঠ ঐতিহাসিকভাবে নির্মাণকাজে এবং রেললাইনের কাঠের পাটাতন তৈরিতে অত্যন্ত মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এর কারণ হলো কাঠটি শক্ত এবং সহজে পচে না।
এই গাছ এখনো এমন অনেক বনজ পণ্য সরবরাহ করে, যার ওপর বননির্ভর ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্ভরশীল। এর মধ্যে রয়েছে শালের বীজ, যা থেকে তেল তৈরি করা হয় এবং রান্নার পাশাপাশি সাবান ও মিষ্টান্ন শিল্পেও ব্যবহার করা হয়।
আবার শালের পাতা সেলাই করে থালা ও বাটি তৈরি করা হয়, যা স্থানীয় বাজারগুলোতে বিক্রি হয়।
এ ছাড়া শালগাছের কাণ্ড থেকে রজন সংগ্রহ করা হয়, যা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ধূপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শালবন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশগত গুরুত্ব এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার এই সমন্বয়ই শাল কাঠভেদী পোকার ব্যাপক সংক্রমণকে শুধু বন বিভাগের গাছ কাটার হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বড় একটি সমস্যায় পরিণত করেছে।
এ পর্যন্ত ২১টিরও বেশি প্রাদুর্ভাব নিবন্ধিত হয়েছে
পোকাটি নির্বিচারে গাছে আক্রমণ করে না। সাধারণত অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও কম সবল গাছকেই এটি বেশি আক্রমণ করে। তবে কোনো গাছের কাণ্ডের পরিধি ২০ সেন্টিমিটারের বেশি হলে বিভিন্ন বয়সের শালগাছও এই পোকার আক্রমণে মারা যেতে পারে।
গাছ মারা যাওয়ার ঘটনা মূলত ৯১ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার কাণ্ডের পরিধির গাছগুলোর মধ্যে বেশি দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি নথিভুক্ত হয়েছে ১২১ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার পরিধির গাছগুলোতে।
আর ঠিক এই গাছগুলোই শালবনের পরিণত ও ছাউনিবিশিষ্ট গাছ, যেগুলো একটি শালবনের কাঠামো ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং কাঠ ও অন্যান্য বনজ পণ্যের সবচেয়ে বড় অংশও সরবরাহ করে।
এখন পর্যন্ত ভারতজুড়ে শাল কাঠভেদী পোকার ২১টিরও বেশি ব্যাপক সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে মধ্যপ্রদেশ ও পার্শ্ববর্তী ছত্তিশগড়ে বড় ধরনের সংক্রমণ হয়েছিল। ওই সময় ওই অঞ্চলের মোট ১৬ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর শালবনের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ হেক্টর বন এই পোকার আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
সে সময় ডিন্ডোরির পার্শ্ববর্তী জেলা মাণ্ডলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেখানে প্রায় ৮ লাখ গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ডিন্ডোরির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা অশোক সোলাঙ্কি বলেন, "আমরা বিপুলসংখ্যক আক্রান্ত গাছ নিয়ে কাজ করছি।"
সমন্বিতভাবে চলছে দুটি কার্যক্রম
পোকা ধরার কার্যক্রম এবং গাছ কাটার কার্যক্রম—দুটি আলাদা উদ্যোগ হলেও একই সময়ে সমান্তরালভাবে চলছে।
বন বিভাগ যাকে ফাঁদগাছ বলে, সেই পদ্ধতিতে পোকা সংগ্রহের কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হলো পূর্ণবয়স্ক পোকাগুলো ডিম পাড়ার এবং বংশবৃদ্ধির সুযোগ পাওয়ার আগেই ধরে ফেলা।
অন্যদিকে, ইতোমধ্যে আক্রান্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে আলাদা ও বড় পরিসরের একটি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে। এর উদ্দেশ্য হলো এমন কাঠ সরিয়ে ফেলা, যেগুলো আর রক্ষা করা সম্ভব নয় এবং যেগুলো থেকে আশপাশের এলাকায় আরও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ডিন্ডোরির বন বিভাগের উপবিভাগীয় কর্মকর্তা সুরেন্দ্র যাদব এই পদ্ধতিটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, "বৃষ্টি শুরু হলে আমরা পোকা ধরার কার্যক্রম শুরু করি।"
এ জন্য নির্দিষ্ট কিছু গাছ কেটে ফেলা হয় এবং গাছের বাকল ছাড়িয়ে নেওয়া হয়, যাতে পোকাগুলো গাছের কাণ্ডের বাইরে বেরিয়ে আসে।
যাদব বলেন, "পোকাগুলো এসে গাছের রস খায় এবং রাতে কাণ্ডের বাইরে বেরিয়ে আসে।"
গাছগুলো তিন দিন এভাবে রেখে দেওয়া হয়। এরপর যেসব পোকা বাইরে বেরিয়ে আসে, সেগুলো সংগ্রহ করতে গ্রামবাসীরা সেখানে ফিরে যান।
তিনি বলেন, "সূর্য ওঠার পর যখন তারা বেরিয়ে আসে, সকাল ৫টা থেকে ৬টার দিকে, তখন আমরা গিয়ে সেগুলো হাতে ধরে ব্যাগে রাখি।"
যাদব জানান, দাঁড়িয়ে থাকা আক্রান্ত গাছগুলো কেটে ফেলার কাজও কুঠার দিয়ে করা হচ্ছে। একটি সংস্থার মাধ্যমে কাজটি পরিচালিত হলেও প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় গ্রামবাসীরাই গাছ কাটছেন।
এই কার্যক্রম শেষ হতে প্রায় চার মাস সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যাদব বলেন, কাটা গাছের কাঠ কাঠের বাজারে পাঠানো হবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের সংক্রমণের মাত্রা অস্বাভাবিক হলেও একেবারে নজিরবিহীন নয়।
তিনি বলেন, "এটি একটি মহামারির মতো চক্র। প্রায় ৩০ বছর পরপর এটি ফিরে আসে।"
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এক বছর থেকে আরেক বছরে পোকার সংক্রমণের মাত্রায় বড় ধরনের ওঠানামা হতে পারে।
তিনি বলেন, "গত বছর এর মাত্রা খুব কম ছিল; এ বছর তা অনেক বেড়ে গেছে।"
জবলপুরের রাজ্য বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা এবং সংরক্ষণ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উদয় হোমকার এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রদেশে শাল কাঠভেদী পোকার সংক্রমণ নিয়ে গবেষণা করছেন।
এবার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে আবহাওয়াকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
হোমকার বলেন, গত বছর ডিন্ডোরি-মাণ্ডলা অঞ্চলে অস্বাভাবিক বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল, যা এই পোকার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
হোমকারের মতে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো এটি দ্রুত শনাক্ত করা।
তিনি বলেন, "সংক্রমণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা শনাক্ত করতে হবে। আমরা এই শনাক্তকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করি।"
কোনো গাছ আক্রান্ত হিসেবে নিশ্চিত হওয়ার পর সংক্রমণ পাশের গাছগুলোতে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সেটি সরিয়ে ফেলা জরুরি।
তবে হোমকার সতর্ক করে বলেন, বিপুলসংখ্যক গাছ আক্রান্ত হওয়ার পরই শুধু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু করা উচিত নয়। বরং সারা বছর ধরে প্রতিরোধমূলকভাবে পোকা ধরার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
হোমকার বলেন, গবেষকেরা গাছ কাটার এবং পোকা ধরার ওপর প্রধানত নির্ভর না করে আরও টেকসই পদ্ধতি হিসেবে জৈবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা যায় কি না, সেটিও পরীক্ষা করেছেন।
এর অর্থ হলো, শাল কাঠভেদী পোকার বিরুদ্ধে লড়তে এর প্রাকৃতিক শত্রুদের ব্যবহার করা।
তিনি বলেন, "বড় পরিসরে এসব প্রাকৃতিক শত্রু লালন-পালন ও বনে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে গবেষণা হয়েছে, কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে এখনো যথেষ্ট গবেষণা হয়নি।"
