ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানো কেন ট্রাম্পের জন্য আসলেই কঠিন হবে
চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়া থেকে দুই দেশের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তেহরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও নৌযানে সাম্প্রতিক মার্কিন হামলাকে যুদ্ধবিরতির 'সুস্পষ্ট লঙ্ঘন' হিসেবে অভিহিত করেছে এবং এর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আক্রমণকারী হিসেবে চিত্রায়িত করলেও জোর দিয়ে বলছে যে যুদ্ধবিরতি এখনো 'অব্যাহত' রয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) একজন মুখপাত্র অভিযোগ করেছেন, ইরানের নৌযানগুলো হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর চেষ্টা করছিল। অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চলমান শান্তি আলোচনার এই প্রেক্ষাপটে এটি একটি বড় ধরণের উসকানিমূলক কাজ। তা সত্ত্বেও ওই মুখপাত্র বলেন, 'সেন্ট্রাল কমান্ড সংযম প্রদর্শন করে বাহিনীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে যাচ্ছে।'
ট্রাম্প প্রশাসনের এমন প্রতিক্রিয়া থেকে এটিই স্পষ্ট হচ্ছে যে যুদ্ধ শেষ করার জন্য তারা কতটা মরিয়া। পর্যবেক্ষকদের মতে, হোয়াইট হাউসের এই অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত দরকষাকষির টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
সর্বশেষ উত্তেজনার সূত্রপাত গত সোমবার। সেদিন মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র ও নৌযানগুলোতে 'আত্মরক্ষামূলক হামলা' চালানোর দাবি করে। এর কিছুক্ষণ পরেই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, তারা একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং অন্য একটি ড্রোন ও যুদ্ধবিমানকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ইরান বিষয়টিকে মার্কিন হামলার 'উপযুক্ত জবাব' হিসেবে তুলে ধরেছে।
ইরানের মেজাজ যেখানে আক্রমণাত্মক, যুক্তরাষ্ট্রের সুর সেখানে অনেকটাই নরম। বর্তমানে ভারত সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই হামলা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দুইবার এড়িয়ে গেছেন। একবার তিনি কেবল শান্তি আলোচনা নিয়ে কথা বলেন, আরেকবার হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
এই পরিস্থিতি মে মাসের শুরুর দিকের কিছু ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছিলেন, ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে ৯ বার গুলিবর্ষণ করেছে এবং দুটি কন্টেইনার জাহাজ জব্দ করেছে। এছাড়া মার্কিন বাহিনীর ওপর ১০টিরও বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছিল।
কিন্তু ড্যান কেইন তাৎক্ষণিকভাবে এসব ঘটনাকে 'নিম্ন-পর্যায়ের সংঘাত' হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এগুলো পুনরায় বড় ধরণের যুদ্ধ শুরু করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেনি।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথও তখন সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে যায়নি। তিনি বরং ইরানকে 'বিচক্ষণ' হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, তেহরান যেন এমন কিছু না করে যা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের সীমা অতিক্রম করে।
কয়েক দিন পর যখন যুক্তরাষ্ট্র কিছু ইরানি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টিকে খাটো করে দেখেন। তিনি এবিসি নিউজকে বলেছিলেন, 'যুদ্ধবিরতি চলছে। এটি কার্যকর আছে।' তিনি মার্কিন হামলাকে তখন 'সামান্য টোকা' হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
বর্তমানেও ট্রাম্প প্রশাসন যখন জনগণকে আশ্বস্ত করছে যে যুদ্ধবিরতি অটুট আছে, তখন ইরান দাবি করছে যে এটি বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং তারা 'পাল্টা' হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সবথেকে বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি।
গত ৭ এপ্রিল যখন ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন, তখন তিনি স্পষ্ট শর্ত দিয়েছিলেন যে এটি কেবল তখনই কার্যকর থাকবে যদি ইরান এই জলপথ পুনরায় খুলে দেয়। কিন্তু ইরান এখনো হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছে, যা যুদ্ধবিরতির সবথেকে বড় লঙ্ঘন বলে মনে করা হচ্ছে।
গত ৭ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছিলেন, 'ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যদি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ, অবিলম্বে এবং নিরাপদে খুলে দিতে সম্মত হয়, তবেই আমি দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে বোমাবর্ষণ এবং হামলা স্থগিত রাখতে রাজি আছি।'
তবে ট্রাম্পের সেই 'সম্পূর্ণ ও অবিলম্বে' প্রণালি খুলে দেওয়ার শর্তটি বাস্তবে কখনোই পূরণ হয়নি। পরবর্তী দিনগুলোতে মার্কিন প্রশাসন বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছে এবং দাবি করেছে যে প্রণালিটি পুনরায় সচল করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধবিরতির আজ সাত সপ্তাহ পার হতে চলল, অথচ হরমুজ প্রণালি এখনো আগের মতোই অবরুদ্ধ হয়ে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি কোনোমতে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা এবং ইরানের ক্রমাগত উসকানিগুলোকে খাটো করে দেখার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন আসলে একটি বিষয়ই পরিষ্কার করছে—তারা আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়াতে প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছেন এবং যেভাবেই হোক একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
এই পরিস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায় ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণে। তিনি তেহরানকে চুক্তি করার জন্য নিজের দেওয়া ডেডলাইন বারবার উপেক্ষা করেছেন। ঘনঘন বড় ধরণের হামলার হুমকি দিলেও বাস্তবে তিনি নতুন করে কোনো বড় সংঘাত শুরু করতে রাজি হননি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই অবস্থান দরকষাকষির টেবিলে তার শক্তি কমিয়ে দিচ্ছে। ইরান এখন সম্ভবত এই ঝুঁকি নিচ্ছে, তেহরানের তুলনায় ট্রাম্পই আসলে এই যুদ্ধের ইতি টানার জন্য বেশি তাড়াহুড়ো করছেন। সাম্প্রতিক হামলাগুলোর বিষয়ে দুই দেশের বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া মূলত এই ধারণাটিকেই আরও জোরালো করে তুলছে।
