যুক্তরাষ্ট্রে পর্যটনে নজিরবিহীন ধস: ভবিষ্যতের জন্য এক উদ্বেগজনক সংকেত
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি পর্যটক আগমনের সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে পর্যটনে মন্দার বিষয়টি আড়াল করার আর কোনো সুযোগ নেই। তথ্যউপাত্ত দেখাচ্ছে, কোভিড-১৯ মহামারির পর এই প্রথম বছরওয়ারি হিসাবে এক বাস্তব পতনের মুখে, আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। পর্যটক পতনের এই হার ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার চেয়েও বড়।
এবার অবশ্য কোনো মহামারি কিংবা বাজারের ধস এর জন্য দায়ী ছিল না—বরং ছিল মানুষের তৈরি ভুল সিদ্ধান্ত ও নীতির খেসারত। পর্যটকেরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে থাকার কারণ হিসেবে, ভিনদেশীদের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের আক্রমণাত্মক বক্তব্য এবং নীতিগুলোকে দায়ী করছেন। ট্রাম্পের এহেন সিদ্ধান্ত মার্কিন রাজনীতির পরিমণ্ডলে, অভিবাসন নীতি নিয়ে বিতর্কে- রূপক ও আক্ষরিক উভয় অর্থেই ব্যাপক প্রচারযুদ্ধেরও রূপ নিয়েছে।
২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ লাখ কম বিদেশি পর্যটক এসেছেন এবং এর ফলে দেশটিতে তাদের সামগ্রিক ব্যয়ের পরিমাণ কমেছে ৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
এটি কেবল সেবা ও পর্যটন খাতের সাথে যুক্ত কর্মীদের জন্যই খারাপ খবর নয়। নিজেদের ভুলে আন্তর্জাতিক পর্যটক কমে যাওয়ার এই বিশাল প্রভাব বিশ্বের বুকে আমেরিকার অবস্থান, তার 'সফট পাওয়ার' বা নরম শক্তির কূটনীতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক আঘাত হানছে।
গত বছরের আগস্টে সিএনএন প্রথম এই উদ্বেগজনক প্রবণতার কথা জানিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটনে ৫.৫% পতনের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২০ সালের মহামারি বাদে গত দুই দশকের মধ্যে এটিই একক কোনো বছরে পর্যটনের সবচেয়ে বড় পতন।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি প্রজেক্টের ফ্যাকাল্টি চেয়ার এবং সিএনএন-এর সিনিয়র জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক জুলিয়েট কায়েম বলেন, "আমরা এমন একটি দেশ ছিলাম যাকে অন্যরা অনুকরণ করতে চাইত। কিন্তু সেই ধারণা এখন আর টিকে নেই।"
কায়েম ব্যাখ্যা করেন, 'সফট পাওয়ার'—যেখানে আমেরিকার শক্তি কেবল সামরিক ক্ষমতার বাইরেও অন্যান্য বিষয়েও প্রতিফলিত হয়—তা ক্রমান্বয়ে দুর্বল হচ্ছে। দেশের বাইরে থাকা মানুষের কাছে এখন একটি নেতিবাচক চিত্র পৌঁছাচ্ছে: "আপনি যদি এখন একজন বিদেশি হন, তবে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে আপনার মনে যে ধারণা তৈরি হবে তা হলো—একটি অচল সরকার, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই-এর নির্মম অভিযান, আমেরিকানদের হত্যাকাণ্ড এবং চারদিকে অপরাধের সয়লাব।"
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগমন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এবিষয়ে তিনি বলেন, "এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হলো বিশ্ব আর আমেরিকাকে আগের মতো চিনবে না... যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে এখন যে ধারণা তৈরি হচ্ছে তা হলো—এই দেশটিকে সম্মান করা যায় না। আর সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, এটি এমন এক গণতন্ত্র যা এখন চরমভাবে ধুঁকছে।"
ধারণাগত বিষয়ের বাইরেও, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু ব্যবহারিক বাধাও তৈরি হয়েছে: যেমন প্রস্তাবিত ২৫০ ডলারের 'ভিসা ইন্টিগ্রিটি ফি' নিয়ে দ্বিধা, যুদ্ধের কারণে জেট ফুয়েল বা বিমানের জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়া এবং 'ব্র্যান্ড ইউএসএ'-এর তহবিল বন্ধ করে দেওয়া—যা আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে মার্কিন পর্যটনের প্রচার চালানো একমাত্র আমেরিকান সংস্থা। সংস্থাটির তহবিল ফিরিয়ে আনার জন্য প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে বিল আনা হলেও—কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি।
ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান 'ট্যুরিজম ইকোনমিক্স'-এর প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম স্যাক্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের জন্য অতিরিক্ত ফি প্রস্তাব করা এবং শুল্কযুদ্ধ হচ্ছে মূলত 'বিন্দু বিন্দু বাঁচিয়ে সিন্ধু উজাড়' করার মতো নীতি, যা নীতিগতভাবে হয়তো বেশি অর্থ নিয়ে আসে বলে মনে হয় কিন্তু দিনশেষে আমেরিকার জন্য অনেক বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপগুলো এতটাই বিভ্রান্তি এবং নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম দিয়েছে যে, 'ব্র্যান্ড ইউএসএ' সম্প্রতি পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং বিভিন্ন ভুল তথ্য দূর করতে একটি প্রচারণা শুরু করেছে। প্রচারে এটি তুলে ধরা হচ্ছে যে, ভিসা ইন্টিগ্রিটি ফি এখনো কার্যকর করা হয়নি এবং নির্দিষ্ট কিছু দর্শনার্থীর বিগত পাঁচ বছরের সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিহাস সংগ্রহের যে প্রস্তাব ট্রাম্প প্রশাসন দিয়েছিল, তা বর্তমান নীতিমালার অংশ নয়।
ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিনও প্রকাশ্যে 'স্যাঙ্কচুয়ারি সিটি' বা অভিবাসী-বান্ধব শহরগুলোর বিমানবন্দরগুলোতে কাস্টমস প্রক্রিয়াকরণ সীমিত করার একটি ধারণা নিয়ে এসেছিলেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো পর্যন্ত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগোয়নি।
ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের মতে, ২০২৫ সালে যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেছেন, তারা মাথাপিছু বেশি খরচ করেছেন। কিন্তু পর্যটকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার কারণে, আগের বছরের তুলনায় মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৮.৪ বিলিয়ন ডলার কমে গেছে (যা মুদ্রাস্ফীতি এবং বিনিময় হারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ)। ট্যুরিজম ইকোনমিক্সের প্রাক্কলন অনুযায়ী, পর্যটন যদি তার প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকত এবং সেই অনুযায়ী যে ব্যয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, তার সাথে তুলনা করলে—এই ক্ষতির পরিমাণ আরও ভয়াবহ (প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কম)।
অথচ বিশ্বজুড়ে পর্যটনের হারের সাথে তুলনা করলে, যুক্তরাষ্ট্রের এই মন্দা একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। আগের বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে আরও ৮ কোটি মানুষ আন্তর্জাতিকভাবে ভ্রমণ করেছেন, "অথচ তারা ভ্রমণের জন্য অন্য গন্তব্যগুলোকে বেছে নিয়েছেন," গত এপ্রিলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল।
যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে চলার দৌড়ে সবার আগে কানাডিয়রা
জার্মানি, ভারত, ফ্রান্স, চিলি, অস্ট্রেলিয়া এবং চীন থেকে আসা দর্শনার্থীদের সংখ্যায় লক্ষণীয় হ্রাস ঘটলেও, যুক্তরাষ্ট্রে পর্যটক কমার সিংহভাগ কারণ ছিল প্রতিবেশী কানাডিয়দের সীমান্ত পার না হওয়া। অবশ্য কিছু দেশ থেকে বিদেশি পর্যটকদের আগমন বেড়েছে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মেক্সিকো থেকে অতিরিক্ত আরও ১০ লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে পর্যটক কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল কানাডা। ওন্টারিওর গোল্ডেন লেকের বাসিন্দা জন স্টুয়ার্টের এই মেমোরিয়াল ডে'র সাপ্তাহিক ছুটির দিনে 'ইন্ডি ৫০০' রেসিং প্রতিযোগিতায় থাকার কথা ছিল। কিন্তু এবার তিনি যাননি।
দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর ধরে প্রতি বসন্তে তিনি ইন্ডিয়ানাপোলিসে যান তাঁর মার্কিন আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে, রেসের সকালের আমেজ উপভোগ করতে, চারপাশের জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতায় মেতে উঠতে এবং হাতে বিয়ার নিয়ে মানুষের সাথে আড্ডা দিতে। এক সপ্তাহের এই বার্ষিক ভ্রমণে তিনি অনায়াসেই ১০ হাজার ডলারের মতো খরচ করে ফেলতেন।
কিন্তু স্টুয়ার্ট জানান, তিনি এখন একটি "মতাদর্শগত চূড়ান্ত সীমায়" পৌঁছে গেছেন।
কিছু কানাডিয়ানদের মতো স্টুয়ার্ট যুক্তরাষ্ট্রের সবকিছু বয়কট করতে চাননি, কারণ তিনি সাধারণ মার্কিনীদের কর্মসংস্থানের ক্ষতি করতে চান না; তাঁর মূল আপত্তি কেবল দেশটির শীর্ষ নেতার ওপর।
তবে ট্রাম্প-সমর্থক মার্কিন সহকর্মীদের সাথে সাম্প্রতিক কিছু কথোপকথনই মূলত তাকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ছুটির সময়টা তর্কে নষ্ট করার বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, "ছুটির দিনে আমি নিজেকে এমন তর্ক-বিতর্কে জড়াতে চাই না যেখানে আমার শান্তিতে বিয়ার পানের ও রেস দেখার কথা ছিল... আমার মনে হয়েছে আমি সেখানকার কিছু আলাপ-আলোচনা মোটেও উপভোগ করতে পারব না।"
কানাডার ওপর ট্রাম্পের বিশৃঙ্খল শুল্ক আরোপ এবং কানাডাকে আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর মতো উসকানিমূলক কথাবার্তা বিরক্তিকর ছিল ঠিকই, কিন্তু ইরানে যুদ্ধ শুরু করার বিষয়টিই স্টুয়ার্টকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।
তিনি বলেন, "এটি আসলে কোনো কানাডিয়ান বনাম আমেরিকান লড়াই নয়, এটি স্রেফ ন্যায় ও অন্যায়ের বিষয়।" আপাতত, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর সব ধরনের ব্যক্তিগত ভ্রমণ স্থগিত রেখেছেন।
ক্ষতির আঁচ টের পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা
মোবাইল ফোনের কার্যক্রম ট্র্যাককারী প্রতিষ্ঠান 'কিউবিক'-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় শহরগুলোতে কানাডিয়ানদের ভ্রমণের হার ৪২% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে, যা সরকারিভাবে প্রাক্কলিত ২৫% -এর চেয়ে অনেক বেশি।
'সিয়াটল ফ্রি ওয়াকিং ট্যুরস' পরিচালনাকারী জো কোনেন এই ধাক্কাটা খুব গভীরভাবে অনুভব করছেন। গত গ্রীষ্মে যখন তিনি সিয়াটল থেকে কানাডিয়ানদের হঠাৎ উধাও হয়ে যেতে দেখেন, তখন সিএনএন তাঁর সাথে কথাও বলেছিল।
কোনেন জানান, এই বছর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি বিপণন এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনে আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও গত বছরের তুলনায় বুকিংয়ের সংখ্যা অনেক কম।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকায় 'সার্ফ সিটি ট্যুরস' পরিচালনাকারী অ্যাডাম ডুফোর্ডের সাথেও গত বছর কথা বলেছিল সিএনএন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে যেন কোনো "কানাডিয়ান স্প্রিং ব্রেক" বা বসন্তকালীন ছুটিতেই আসেনি।
ডুফোর্ড অবশ্য এই বছর কিছু আন্তর্জাতিক পর্যটককে ধীরে ধীরে ফিরে আসতে দেখছেন, তবে ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। গত অক্টোবরে ডুফোর্ডকে তাঁর সাতজন কর্মীর সবাইকেই চাকরি থেকে ছাঁটাই করতে হয়েছে।
ডুফোর্ড বলেন, "এটি ছিল অত্যন্ত দুঃসহ অভিজ্ঞতা। ছাঁটাইয়ের সময় তারা (কর্মীরা) এতটাই বিস্মিত এবং অপ্রস্তুত ছিল যে বলার মতো না। তারা বিস্মিত হচ্ছে দেখে আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছিল।"
২০১৯ সালে যখন ডুফোর্ড প্রথম এই ট্যুর কোম্পানিটির দায়িত্ব নেন, তখন তিনি ভেবেছিলেন, "ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকার চমৎকার রোদ আর পর্যটন শিল্প তো আর কখনো হারিয়ে যাবে না। এটা খুব ভালো একটি বিনিয়োগ হতে যাচ্ছে।"
তাঁকে কেবল মহামারিকালীন লকডাউনের মুখোমুখিই হতে হয়নি, বরং ২০২৫ সালের লস অ্যাঞ্জেলেসের অভিবাসন বিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও সহিংসতা ঠিক কোন কোন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল—তা নিয়ে ছড়ানো বিভিন্ন ভুল তথ্যের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হয়েছিল। তিনি বলেন, মানুষ ভুলবশত বিশ্বাস করেছিল যে আইসিই-এর উপস্থিতির বিরুদ্ধে চলা বিক্ষোভ পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও তা মূলত ডাউনটাউন না নগরকেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। এরপরেও এই ঘটনা গত বছর অনেক পর্যটককে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে দূরে রেখেছিল।
শেষ পর্যন্ত, ২০২৫ সালে তাঁর আয় আগের বছরগুলোর তুলনায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে যায়।
স্যাক্স জানান, আরেকটি জনপ্রিয় অবকাশযাপন কেন্দ্র ফ্লোরিডা আন্তর্জাতিক পর্যটক হারানোর এই ধাক্কা সবচেয়ে বেশি টের পেয়েছে। শীতের তীব্র প্রকোপ থেকে বাঁচতে আসা 'স্নোবার্ডস' (উত্তরের শীতপ্রধান অঞ্চলের বাসিন্দা)-দের জন্য এই 'সানশাইন স্টেট' একটি অত্যন্ত পছন্দের গন্তব্য।
সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার 'ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ড'-এর আরেকটি উদাহরণ। এখানে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যটকের সমাগম ঘটে। তবে বিদেশ থেকে আসা কিছু কট্টর ভক্তও এখন এই পর্যটনকেন্দ্রে ফিরে আসতে দ্বিধাবোধ করছেন।
ডিজনির সর্বশেষ ত্রৈমাসিক আয়ের প্রতিবেদনে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় তাদের অভ্যন্তরীণ থিম পার্কগুলোতে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ১% হ্রাস পেয়েছে, যা "আংশিকভাবে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের অব্যাহত মন্দার প্রতিফলন।" ডিজনির ওয়ার্ল্ডের হোটেলগুলোর রুম বুকিংয়ের হারও এক বছর আগের ৯২% থেকে কমে ৮৯%-এ নেমে এসেছে (২০২৬ সালের ২৮ মার্চ শেষ হওয়া কোম্পানির দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী)।
হতাশ পর্যটকেরা
'স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা'-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে কানাডিয়ানদের ভ্রমণ এখন কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যায়ে প্রবেশ করছে। গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় এই বছরের এপ্রিলে গাড়িতে করে সীমান্ত পার হওয়া পর্যটকের সংখ্যা ৫.৮% বেড়েছে—যা এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম কোনো প্রবৃদ্ধি। তবে বিমানে করে ভ্রমণের হার এখনও নিম্নমুখী রয়েছে।
কিন্তু এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বেশ ধীর হতে পারে। টরন্টোর রে সিজারের মতো মানুষজন এখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন না।
সিএনএন-কে পাঠানো এক ইমেইলে সিজার লিখেছেন, "কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অধীনস্থ রাষ্ট্র বা অনুগত রাজ্য নয়। আমাদের অর্থনীতি 'ধ্বংস' করার বা আমাদের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করার যে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তা অনেক কানাডিয়ানের কাছে চরম অবমাননাকর বলে মনে হয়েছে—বিশেষ করে এমন একটি দেশের প্রতি, যা ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকার অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র, সবচেয়ে স্থিতিশীল প্রতিবেশী এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য অংশীদারদের একটি।"
নিউইয়র্ক ভ্রমণের পরিবর্তে সিজার এবং তাঁর স্ত্রী জেন নাগাই সম্প্রতি জাপানে একটি ট্রিপের পেছনে হাজার হাজার ডলার খরচ করেছেন। তিনি জানান, ভবিষ্যতে তাঁদের আবারও জাপানে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এবং খুব শিগগিরই তাঁরা ভিয়েনা ও ইতালিতেও যাবেন।
"বাস্তবতা হলো, পৃথিবীতে ভ্রমণের জন্য আরও অনেক অসাধারণ জায়গা রয়েছে এবং আমাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখন আর তেমন কোনো আকর্ষণীয় জায়গা নয়। আমরা মানসিকভাবে এই বিষয়টির সাথে মানিয়ে নিয়েছি যে, আমরা হয়তো আর কখনোই সেখানে ফিরে যাব না" –বলেন তিনি।
তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমেরিকানদের ওপর ক্ষুব্ধ নন—তবে তিনি সেইসব মানুষের ওপর হতাশ যারা এই রাজনৈতিক ধারাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন কিংবা এটি প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
কেবল কানাডিয়রাই এই ধরনের মনোভাব পোষণ করছেন না; অন্যান্য হবু বিদেশি পর্যটকও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক গ্রিনল্যান্ডকে দখল করার আলোচনা, ন্যাটো জোট নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং শুল্ক নীতি বা ইরান যুদ্ধ পরিচালনার মতো বিষয়গুলো দেখে সংকোচ বোধ করছেন।
কারিন উইলিয়ামসের জন্য চলতি মাস কেবলই এক গভীর দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ যে বিশাল যৌথ পরিবারের সাথে তাঁর ম্যাসাচুসেটস ভ্রমণের কথা ছিল, তাদের ছাড়াই এবার তাঁকে একা আসতে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং সুইডেনের দ্বৈত নাগরিক উইলিয়ামস তাঁর ছেলের কলেজ গ্র্যাজুয়েশন দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। কিন্তু এই সফরে কারিনের সাথে কেবল তাঁর স্বামীই রয়েছেন; স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আসা অন্য ছয়জন আত্মীয় নেই, যারা এই ভ্রমণের জন্য বছরজুড়ে টাকা জমিয়েছিলেন।
মিনিয়াপোলিসে অভিবাসী এবং মার্কিন নাগরিকদের সাথে ফেডারেল এজেন্টরা যেমন আচরণ করেছে—তা দেখার পর তাঁর পুরো পরিবার এই সফর বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়।
সুইডেনের স্কন অঞ্চলের 'ডেমোক্র্যাটস অ্যাব্রড' চ্যাপ্টারের চেয়ার উইলিয়ামস জানান, তিনি তাঁর আত্মীয়দের মত বদলানোর জন্য কোনো জোরাজুরিও করেননি।
ট্রাম্প প্রশাসনের একের পর এক বিভিন্ন নেতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "এত বিশাল সম্ভাবনাময় একটি দেশকে এভাবে ভুলের দিকে ধাবিত হতে দেখাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। 'বাঙ্কার বলরুম' থেকে শুরু করে সুইমিং পুল ভেঙে ফেলা এবং বহুতল ভবনগুলোতে নিজের প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তোলার মতো—ট্রাম্পের এসব কর্মকাণ্ড ইউরোপীয়দের জন্য বেশ অস্বস্তিকর, যারা এখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (স্বৈরশাসনের) স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন।"
