লোহিত সাগরে সৌদির ২ ট্যাঙ্কারে হামলার দাবি হুথিদের, হরমুজ ছাড়াও ইরান যুদ্ধে নতুন নৌপথ সংকটের শঙ্কা
লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেল ট্যাঙ্কারে হামলার দাবি করেছে ইরান-পন্থী হুথি বিদ্রোহীরা। সৌদি আরবের ওপর নৌ-অবরোধের অংশ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার জানায় গোষ্ঠীটি। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে টানা ১২তম রাতের মতো বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইয়েমেনভিত্তিক হুথি বিদ্রোহীরা বর্তমানে বাব এল-মান্দেব প্রণালি সংলগ্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। গত সোমবার তারা সৌদি আরবের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরেও অবরোধ তৈরির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া ইরানের একটি কৌশল।
মঙ্গলবার ভারত ও চীনগামী তিনটি সৌদি তেলের ট্যাঙ্কার মাঝপথ থেকে ফিরে গেছে এবং বুধবার পাঁচটি ট্যাঙ্কার তাদের পথ পরিবর্তন করেছে। হুথিরা জানিয়েছে, তারা 'এনসেলিয়া' এবং 'লায়লা' নামের দুটি ট্যাঙ্কারে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
একটি সমুদ্র নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের জিজান বন্দরের কাছে এনসেলিয়া হামলার শিকার হয়ে বিপদ সংকেত পাঠিয়েছে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্থা 'ভ্যানগার্ড' জানিয়েছে, আল-শুকাইক বন্দর থেকে ৭০ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি অজ্ঞাত বস্তু ট্যাঙ্কারটিতে আঘাত হানে। তবে লায়লা ট্যাঙ্কারে হামলার বিষয়টি এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, হুথিদের এই নৌ-অবরোধের হুমকি যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করতে পারে এবং এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ বাড়াবে। বর্তমানে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানির চেষ্টা করছে। যদি এই পথটিও বন্ধ হয়ে যায়, তবে তাদেরকে সুয়েজ খাল হয়ে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে জাহাজ চলাচলে বাধ্য হতে হবে।
অবকাঠামো ধ্বংসের পাল্টাপাল্টি হুমকি
লোহিত সাগরে উত্তেজনা বাড়ার আগে বুধবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে ইরান যদি হরমুজে কোনো জাহাজে হামলা চালায় তবে এর বিনিময়ে দেশটির একটি সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করা হবে। জবাবে ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, ট্রাম্পের হুমকি বাস্তবায়ন করা হলে তারা আশপাশের অঞ্চলের তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাবে। তারা 'এক ফোঁটা তেলও' রপ্তানি হতে দেবে না বলে সতর্ক করেছে।
পরে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে একটি মাইন বসানো পথে বিস্ফোরণে একটি তেলের ট্যাঙ্কারে আগুন ধরে গেছে। আইআরজিসি দাবি করেছে যে প্রণালিটি এখন তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এবং 'পুরোপুরি বন্ধ'। তেহরানের সাথে সমন্বয় ছাড়া কোনো জাহাজ সেখান দিয়ে চলাচল করতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও ক্ষয়ক্ষতি
গত জুন মাসে হওয়া যুদ্ধবিরতি সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণ থেকে শুরু করে পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে হামলার পরিধি বাড়িয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা কমিয়ে আনতে অভিযান অব্যাহত রাখবে। ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, গত দুই দিনে বুশেহর শহরের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে তিনবার হামলা হয়েছে। এছাড়া ইরাক সীমান্তবর্তী শালামচেহ ক্রসিংয়ে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২ জন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত ৫৩ জন ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৫৯২ জন আহত হয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
অন্যদিকে যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৪৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। গত বুধবার ডেলাওয়্যারের একটি বিমানঘাঁটিতে জর্ডান ও ইরাকে নিহত ৪ মার্কিন সেনার মরদেহ গ্রহণের অনুষ্ঠানে অংশ নেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি এই দায়িত্বকে একজন প্রেসিডেন্টের জন্য 'কঠিন কাজ' হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে পরে জর্জিয়ায় এক জনসভায় এই যুদ্ধকে তিনি 'ছোটখাটো সংঘাত' বলে অভিহিত করেন।
