কয়লা ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গমন সীমা বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র
কয়লা ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে দূষণ সীমিত করার জন্য প্রণীত নিয়মগুলো বাতিল করা হচ্ছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার (ইপিএ) প্রধান। সংস্থাটি আরও জানায়, ভবিষ্যৎ প্রশাসন যাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ইপিএ জানিয়েছে, দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলের অধিকাংশ জলবায়ু সংক্রান্ত নিয়ম দূর করার মাধ্যমে ৩১০ বিলিয়ন ডলার বাঁচবে এবং শক্তির দাম কমবে।
তবে পরিবেশবাদী দলগুলো বলেছে, এর জন্য মার্কিন নাগরিকদের স্বাস্থ্য এবং পৃথিবীকে বিশাল মূল্য দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার এ পদক্ষেপটি অবিলম্বে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইপিএ প্রধান লি জেলডিন সোমবার বলেন, 'বাস্তবতা হলো আমেরিকা বিশ্বের যেকোনো স্থানের চেয়ে ভালো এবং পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদন করে, তাই আমাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে অন্যায়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়।'
জাতিসংঘের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি—যার মধ্যে কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাস অন্তর্ভুক্ত—বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ। ইপিএ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা দেখেছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্গমন সম্পর্কিত বাইডেন আমলের নিয়মগুলো "সংস্থাটির প্রাপ্ত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছিল"।
সংস্থাটি জানায়, 'ওই বিধিমালার জন্য এমন নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির প্রয়োজন ছিল যা পর্যাপ্তভাবে বাস্তবায়নে সক্ষম নয়, ফলে কেন্দ্রগুলোকে এমন কোনো মানদণ্ড দেওয়ার বদলে যা তারা বাস্তবে পূরণ করতে পারে, কার্যকরভাবে সেগুলোকে বন্ধ করে দিতে বাধ্য করা হচ্ছিল।' ইপিএ বিদ্যুৎ খাতের জন্য তৈরি অন্যান্য সমস্ত গ্রিনহাউস গ্যাস সংক্রান্ত নিয়মও বাতিল করতে চাইছে। এই পরিবর্তনগুলো, যা পরবর্তীতে জনসমক্ষে পর্যালোচনার মুখোমুখি হবে, তা গত বছর জেলডিনের মাধ্যমে প্রস্তাব করা হয়েছিল। তিনি বলেন, 'নতুন নিয়মগুলো সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে এবং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি পরিবহন, হিটিং, সেবা খাত, কৃষি এবং শিল্প উৎপাদনের খরচ কমিয়ে আনবে।'
বাইডেন আমলের নীতিমালায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যানবাহন এবং শিল্প কারখানা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কার্বন নির্গমন হ্রাসের আহ্বান জানানো হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল যে, এই পদক্ষেপগুলোর ফলে বছরে ৪ হাজার ৫০০ জন মানুষের অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। তবে সোমবার ইপিএ জানিয়েছ, 'যেকোনো সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্যজনিত ক্ষতি অত্যন্ত অনিশ্চিত, অনুমানভিত্তিক, সুদূরপ্রসারী এবং জটিল, যা নির্দিষ্টভাবে মার্কিন বিদ্যুৎ খাতের সাথে সরাসরি জোড়া দেওয়া যায় না।' জেলডিন সাংবাদিকদের বলেন, 'মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ক্ষতিকর বায়ু দূষণকারীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচগুলো বহাল থাকবে।'
একটি স্বাধীন পরিবেশবাদী সংস্থা—'সেন্টার ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড এনার্জি সলিউশনস'-এর প্রেসিডেন্ট নাথানিয়েল কেওহেন এই পদক্ষেপটিকে "একটি বিশাল পশ্চাদমুখী পদক্ষেপ" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কেওহেন আরও যোগ করেন, 'বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য নির্ধারিত কার্বন দূষণ সংক্রান্ত মানদণ্ড বাতিল করে ইপিএ সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞান ও অর্থনীতিকে উপেক্ষা করেছে এবং জনস্বাস্থ্য ও জনকল্যাণ সুরক্ষায় নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে।'
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে চীন পর গ্রহ উষ্ণায়নকারী গ্রিনহাউস গ্যাস, যেমন কার্বন ডাই অক্সাইডের দ্বিতীয় বৃহত্তম নিঃসরণকারী দেশ। সর্বশেষ উপলব্ধ অনুমান অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট গ্যাস নির্গমনের প্রায় চারভাগের একভাগ আসে বিদ্যুৎ খাত থেকে, যা বার্ষিক প্রায় ১৫০ কোটি (১.৫ বিলিয়ন) টন কার্বন ডাই অক্সাইডের সমতুল্য। এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কেবল বিদ্যুৎ খাতের নির্গমনই বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া বাকি সব দেশের মোট নির্গমনের চেয়েও বেশি। গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ খাতের নির্গমন সাধারণভাবেই হ্রাস পেয়েছে—যদিও কয়লার ব্যবহার কমে আসার সত্ত্বেও গত বছর এতে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল।
তবে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ শক্তির পুনরুত্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে আসছেন এবং বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির নিয়মিত সমালোচনা করে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস নির্গমন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর আজকের এই ঘোষণার ঠিক কী প্রভাব পড়বে, তা এখনো অনিশ্চিত। কিছু গবেষক অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প যেমনটি আশা করছেন কয়লা শক্তি আসলেই সেই স্তরে ফিরতে পারবে কি না। তারা বিগত দশকে সৌরবিদ্যুতের মতো অনেক পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির খরচ নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।
২০২২ সালে ইপিএ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন সীমিত করার কিছু ক্ষমতা হারায়, যখন সুপ্রিম কোর্ট ১৯টি অঙ্গরাজ্য এবং দেশের বেশ কয়েকটি বড় কয়লা কোম্পানির পক্ষে রায় দেয়। কোম্পানি ও অঙ্গরাজ্যগুলো নীতির অর্থনৈতিক ব্যয় নিয়ে চিন্তিত ছিল এবং দাবি করেছিল যে পুরো অঙ্গরাজ্যজুড়ে নির্গমন সীমিত করার আইনগত কর্তৃত্ব এই সংস্থার নেই। সোমবারের এ ঘোষণাটি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার নীতিগুলো থেকে সরে আসার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া সাম্প্রতিকতম পদক্ষেপ।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে, ইপিএ ওবামা আমলের একটি ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত বদলে দেয়, যেখানে গ্রিনহাউস গ্যাসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকার চ্যালেঞ্জ জানায়।
