ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রের শত শত সামরিক অবকাঠামো, কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান
ইরানের সামরিক হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর পেন্টাগনের মহাপরিদর্শকের দপ্তর (অফিস অব দ্য ইনস্পেক্টর জেনারেল) -এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) পেন্টাগনের তদন্তকারীদের জানিয়েছে, চলতি সংঘাতের মধ্যে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান এবং জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে— ইরানের হামলায় শত শত ভবন ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়েছে।
প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক স্থাপনাগুলোর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করা হলেও, মার্কিন কূটনৈতিক কেন্দ্রগুলোর ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর পরিদর্শকদের জানিয়েছে, চারটি দেশে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলো ইরানি হামলায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব স্থাপনার মোট ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
ইরাকে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক কেন্দ্রগুলো ৬০০টিরও বেশি হামলার মুখোমুখি হয়েছে। এ ছাড়া কুয়েত সিটি এবং রিয়াদের মার্কিন দূতাবাসেও আঘাত হেনেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন।
পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৯ জুন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে পরিচালিত 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-তে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ৩ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার। এই বিপুল ব্যয়ের মধ্যে ২,২৩০ কোটি ডলারের ব্যবহৃত গোলাবারুদ, ৩৭০ কোটি ডলারের সরঞ্জাম ক্ষতি এবং সেন্টকমের সাধারণ পরিচালন ব্যয়ের বাইরে অতিরিক্ত ৭৪০ কোটি ডলার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে এই হিসাবের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক অবকাঠামো মেরামতের খরচ যুক্ত করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগন তাদের খরচের প্রাক্কলনে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর সামরিক পুনর্নির্মাণ ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করেনি। কারণ পেন্টাগন এখনো অঞ্চলটিতে তাদের ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশল বা অবস্থান কী হবে, কীভাবে নতুন করে ঘাঁটিগুলো পুনর্নির্মাণ করা হবে এবং এই ব্যয়ের কত শতাংশ মিত্র বা অংশীদার দেশগুলো বহন করবে—তা এখনও নির্ধারণ করে উঠতে পারেনি।
মার্কিন কংগ্রেস এই যুদ্ধের জন্য আলাদা কোনো বাজেট বা অর্থ অনুমোদন না করায়, সাধারণ পরিচালন বাজেট—যেমন প্রশিক্ষণ ও সামরিক বাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণের নির্ধারিত তহবিল থেকেই যুদ্ধের যাবতীয় খরচ মেটানো হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অপারেশন এপিক ফিউরির এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক সরকারি মূল্যায়ন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, "এই অভিযানের জন্য আলাদা কোনো আর্থিক বরাদ্দ না থাকায়, যুদ্ধ পরিচালনার প্রকৃত মোট খরচ হিসাব করা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে।"
এই অভিযানে সামরিক সহায়তায় ১,৫০০টিরও বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করা মার্কিন ট্র্যান্সপোর্টেশন কমান্ডের (ইউএসট্রান্সকম) জন্যও তহবিল এক বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, "অপারেশন এপিক ফিউরি'র শীর্ষ মুহূর্তে দৈনিক ৩০ থেকে ৪০টি মিশন সরাসরি সেন্টকমের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় পাঠানো হতো। পাশাপাশি মালামাল স্থানান্তরের জন্য প্রতিদিন আরও ২০ থেকে ৩০টি বিমান পাঠানো হতো ইউএসইউকম বা ইউরোপীয় কম্যান্ডের আওতাধীন এলাকায়।"
গত ৩০ জুন পর্যন্ত কেবল এই পরিবহন খাতেই খরচ হয়েছে প্রায় ২৪০ কোটি ডলার।
পেন্টাগনের মহাপরিদর্শকের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত সামরিক শাখাগুলো ইউএসট্রান্সকমকে অধিকাংশ খরচ পরিশোধ করলেও, অতিরিক্ত জরুরি বরাদ্দ না পাওয়ায় নিজস্ব তহবিল ফুরিয়ে আসছে। ফলে ভবিষ্যতে অর্থ পরিশোধে বিলম্বের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত মে মাসে প্রকাশিত 'কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস (সিআরএস)'-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে (যা গত ২৪ আগস্ট সেন্টকম কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়েছে) পেন্টাগনের এই প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন মানবচালিত ও চালকহীন (ড্রোন) যুদ্ধবিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ধ্বংসপ্রাপ্ত যুদ্ধবিমানের তালিকায় রয়েছে—চারটি এফ-১৫ই, একটি এ-১০ অ্যাটাক এয়ারক্রাফট, চারটি এএইচ-৬ হেলিকপ্টার, একটি এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টার, একটি এমএইচ-৬০ হেলিকপ্টার, একটি এমকিউ-৪সি ড্রোন এবং অন্তত ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন।
প্রতিবেদনে গত ২৭ আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সামরিক সদস্য নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। পেন্টাগন ৩০ জুন পর্যন্ত ৪১৭ জন সেনা আহত হওয়ার দাবি করলেও, আগস্টের শেষের দিকে প্রকাশিত নতুন তথ্যে হতাহতের মোট সংখ্যা বেড়ে ৭৭৪ জনে পৌঁছেছে।
