ইরান যুদ্ধে প্রথম পাঁচ মাসে প্রতিদিন গড়ে ২৪৬ মিলিয়ন ডলার করে খরচ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে পেন্টাগনের ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের বাজেট অফিসের নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট পর্যন্ত এই যুদ্ধে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮.১ বিলিয়ন ডলার। যুদ্ধ চলমান থাকলে প্রতি মাসে বাড়তি ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে যুদ্ধে ব্যবহৃত মিসাইল ও অন্যান্য গোলাবারুদ পুনর্স্থাপনের পেছনে। এছাড়া বিমান চলাচলের সময় বৃদ্ধি পাওয়ায় ১০.৪ বিলিয়ন ডলার এবং জ্বালানির দাম বাড়ায় ২.৭ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংঘাত শুরু করার পর থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে।
বাজেট অফিস সতর্ক করেছে যে, গত জুন মাস থেকে মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে গেছে। ইসরায়েলকে ইরানি হামলা থেকে রক্ষা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এসব গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। সিবিও জানিয়েছে, 'উৎপাদন বাড়ালেও পেন্টাগনের এই মজুত পূর্ণ করতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।'
প্রতিনিধি পরিষদের বাজেট কমিটির ডেমোক্র্যাট নেতা ব্রেন্ডন বয়েল এই প্রতিবেদনটি তৈরির অনুরোধ জানিয়েছিলেন। পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেলের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সিবিও-র হিসাবের বেশ মিল রয়েছে। এই নতুন হিসাব প্রকাশ পাওয়ায় ট্রাম্পের যুদ্ধ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে; কারণ শুরুর দিকে তিনি দাবি করেছিলেন যুদ্ধটি কেবল কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।
সিবিও জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রের এই ঘাটতি চীন বা অন্য কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে 'অত্যন্ত সমস্যাজনক' হয়ে দাঁড়াতে পারে, বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোক্তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক নাগাদ এই যুদ্ধ মার্কিন মূল্যস্ফীতিকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে বলে সিবিও প্রাক্কলন করেছে।
পেন্টাগনের হিসাবে, ২৯ জুন পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার। এর মধ্যে যুদ্ধ পরিচালনার অতিরিক্ত ব্যয় ৭৪০ কোটি ডলার, ব্যবহৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ পুনরায় মজুত করতে ২ হাজার ২৩০ কোটি ডলার এবং ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনে ৩৭০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে।
অস্ত্র ব্যবহারের উচ্চহারে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অস্ত্রভান্ডারে 'ঘাটতি' তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা বিভাগের নজরদারি সংস্থা। কঠিন রকেট মোটর, বিস্ফোরক, প্রপেল্যান্ট ও দক্ষ কর্মীর সংকটের কারণে অস্ত্রভান্ডার পুনরায় পূরণ করার কাজও জটিল হয়ে পড়েছে।
সোমবার প্রকাশিত প্রতিরক্ষা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেলের (ডিওডি আইজি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
এ ছাড়া কয়েক ডজন উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চারটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান, একটি এফ-৩৫এ, সাতটি কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, সাতটি হেলিকপ্টার এবং ৩০টির বেশি ড্রোন।
মার্কিন বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমানের দাম সর্বোচ্চ ৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। আর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের ১৯৯৮ সালের দাম ছিল ৩ কোটি ১১ লাখ ডলার।
পেন্টাগনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর সময় অঞ্চলটি থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ৭ কোটি ৯২ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে।
এ ছাড়া ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার বলে হিসাব করা হয়েছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক ঘাঁটিগুলো পুনর্নির্মাণে কত খরচ হবে এবং সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে কোনো হিসাব দেয়নি প্রতিরক্ষা বিভাগ।
