নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনারের নিয়োগে এখনো আনুষ্ঠানিক সম্মতি দেয়নি ভারত: দ্য প্রিন্ট
ভারতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে আসাদ আলম সিয়ামকে নিয়োগের বিষয়ে দিল্লি এখনো আনুষ্ঠানিক সম্মতি বা অনুমোদন দেয়নি। এমন তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট।
বিভিন্ন বিদেশি মিশনে ঢাকার নতুন হাইকমিশনার ও রাষ্ট্রদূত নিয়োগের প্রক্রিয়া গত জুলাই মাসে শুরু হয়। আসাদ আলম সিয়ামকে পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের জন্য নয়াদিল্লির অনুমোদন চাওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। ভারতের সম্মতি ছাড়া সিয়ামের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি ঘোষণা দেওয়া সম্ভব নয়। ভারতে নিযুক্ত বর্তমান ক্ষমতাসীন হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারত অ্যগ্রিমো (আনুষ্ঠানিক সম্মতিপত্র) আটকে রাখায় বাংলাদেশ নতুন কাউকে নয়াদিল্লিতে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিতে পারছে না। ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস-এর অনুচ্ছেদ ৪-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, 'প্ররণকারী রাষ্ট্রকে নিশ্চিত হতে হবে যে তারা মিশনের প্রধান হিসেবে যাকে প্রস্তাব করছে, গ্রহণকারী রাষ্ট্র তার জন্য অনুমোদন দিয়েছে।'
ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো দেশের দেওয়া প্রস্তাবিত ব্যক্তিকে নামঞ্জুর করার পেছনে কোনো কারণ ব্যাখ্যা করতে বাধ্য নয় ভারত। এই প্রক্রিয়াটি গোপন রাখা হয় যাতে গ্রহণকারী দেশ কোনো কূটনৈতিক নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করলেও সেটি নিয়ে কোনো প্রকাশ্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
আসাদ আলম সিয়াম বর্তমানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম জ্যেষ্ঠ ক্যারিয়ার কূটনীতিক। গত বছর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে এই পদে নিয়োগ দেয়। পররাষ্ট্র সচিব হওয়ার আগে সিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এখনো শীতল থাকার প্রেক্ষাপটেই সিয়ামের নিয়োগ অনুমোদনের বিষয়টি থমকে গেছে। আগস্টে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শেষ মুহূর্তে নয়াদিল্লি সফর বাতিল হয়ে যায়। আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সাথে ভারতের যোগাযোগ জোরদার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে 'বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন' (বিমসটেক)-এর চেয়ারম্যান পদে থাকায় আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী গত সপ্তাহান্তে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেননি।
ঢাকা থেকে কোনো প্রতিনিধি পাঠানো হয়নি। ভারতে বর্তমান হাইকমিশনার পদে থাকা হামিদুল্লাহও এই সম্মেলনে অংশ নেননি। রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও, সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টায় নয়াদিল্লি ও ঢাকা বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চালু রেখেছে। গত সপ্তাহে ঢাকায় দুই দিনব্যাপী আন্তঃসরকার রেলওয়ে বৈঠক (আইজিআরএম) অনুষ্ঠিত হয়। সীমান্ত পারাপারের ট্রেন চলাচল পর্যালোচনার জন্য উভয় দেশের রেল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে এই বৈঠক গঠিত হয়।
ঢাকায় রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর গত সাত মাসে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দল এবং কারিগরি প্রক্রিয়া উভয় পক্ষ থেকে পুনরায় সক্রিয় করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক শীতলতা সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গত এক মাসে ভারতকে দুটি আমন্ত্রণ জানায় নয়াদিল্লি—একটি রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য এবং অন্যটি ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য। দুটি সফরের কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি।
গত ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি প্রেস ব্রিফিংয়ের কারণে এই রাষ্ট্রীয় সফরটি জটিল রূপ নেয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তিনি নয়াদিল্লিতে পালিয়ে যান এবং সেখানেই অবস্থান করছেন। আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে দুই দেশই কূটনৈতিক যোগাযোগের নানা উপায় খুঁজছে। ভারত চলতি বছরের শুরুর দিকে রাজনীতিবিদ ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে তাদের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। ত্রিবেদী জুনের শেষের দিকে তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ঢাকার সাথে সম্পর্ককে নয়াদিল্লি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে তা স্পষ্ট করতে ভারতীয় প্রশাসনিক কাঠামোয় তার পদটিকে 'ক্যাবিনেট পদমর্যাদায়' উন্নীত করা হয়। হাসিনার পতনের পর দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে ব্যাপক অবনতি হয়। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেন। তার মেয়াদে সম্পর্ক অত্যন্ত কঠিন সময় অতিক্রম করে, কারণ ঢাকা তখন চীন ও পাকিস্তানের দিকে তাদের কূটনীতি মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করেছিল।
তারেক রহমানের অধীনে সম্পর্কে কিছুটা ইতিবাচক গতি দেখা গেলেও গত মাসে তা আবার থমকে গেছে। নয়াদিল্লি আশা করেছিল বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী এতদিন ভারত সফর করবেন, তবে দুই দেশ কোনো সমঝোতার কাছাকাছি গেলেই বারবার নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
