ব্যবসায়ীকে মামলার ভয় দেখিয়ে ১৮ লাখ টাকা ও ক্রিপ্টো আদায়ের অভিযোগ: এসি প্রত্যাহার, ২ এএসআই ক্লোজড
চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ী ও তার বন্ধুকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে জুয়া মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ১৮ লাখ টাকা ও বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) দুই সহকারী উপপরিদর্শককে (এএসআই) ক্লোজড করা হয়েছে। একই ঘটনায় পুলিশের এক সহকারী কমিশনারকে (এসি) প্রত্যাহার করে দামপাড়া পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ক্লোজড হওয়া দুই এএসআই হলেন সিএমপির ল'ফুল ইন্টারসেপ্টেড সেলের (এলআইসি) বাছির উদ্দিন ও সিএমপি রেশন স্টোরের সুফিয়ান। আর প্রত্যাহার করা হয়েছে এলআইসির সহকারী কমিশনার শরিফুল আলম সুজনকে।
আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, 'এক যুবকের কাছ থেকে টাকা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগে দুই এএসআইকে ক্লোজড করে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। আর এসিকে দামপাড়া পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।'
কমিশনার বলেন, বিষয়টি তদন্ত করছেন উপকমিশনার (ডিসি) মো. বদিউজ্জামান। তাকে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। যেই জড়িত থাকুক, তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের সূত্রে জানা যায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর সকালে এসি শরিফুল আলমের নেতৃত্বে সাদা পোশাকের একদল পুলিশ নগরীর হালিশহরের কে ব্লকের একটি বাসা থেকে ব্যবসায়ী আখতারুজ্জামান শাকিল (২৭) ও তার বন্ধু মনসুর আলীকে তুলে নেয়। পরে তাঁদের একটি টয়োটা করোলা গাড়িসহ এলআইসি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
শাকিল খাতুনগঞ্জে পলিপ্রোপিলিন (পিপি দানা) ব্যবসা করেন। পাশাপাশি পটিয়ায় তার একটি কৃষি খামার রয়েছে। তার বন্ধু মনসুর গাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের মোবাইল ফোন জব্দ করে তল্লাশি চালানো হয়। ফোনে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি অন্য একটি ডিভাইসে স্থানান্তর করা হয়।
শাকিল ও মনসুরের তথ্যমতে, শাকিলের ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ করে দেওয়ার এবং তাদের জুয়া মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। এ সময় এসি শরিফুল ও এএসআই বাছিরের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেন তারা।
শাকিলের অভিযোগ, তার বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট থেকে তিন দফায় ১০ হাজার ৮৬৪ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা, বিভিন্ন মাধ্যমে স্থানান্তর করতে বাধ্য করা হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে তিন কনস্টেবল তাকে সিএমপির কাছে একটি ব্যাংকের বুথে নিয়ে যান। সেখানে পাঁচ দফায় তার কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা তোলা হয়।
এ ছাড়া এলআইসি কার্যালয়ে অবস্থানের সময় একটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অ্যাকাউন্ট থেকেও ৮০ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয় বলে অভিযোগ করেন শাকিল।
দুই ভুক্তভোগীর দাবি, পুলিশ সদস্যরা একটি সাদা কাগজে তাদের নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর লিখে নেন এবং তাতে তাদের স্বাক্ষর করান। পরে তাদের ভিডিও ধারণ করা হয়। রাত ১২টার দিকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হলেও পরদিন ৫ সেপ্টেম্বর রাতে প্রাইভেট কার ফেরত দিয়ে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সিএমপি কমিশনার বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেন। শাকিল জানান, পরে তিনি তদন্ত কমিটির কাছে মৌখিকভাবে তার বক্তব্য দেন।
আগেও উঠেছিল ক্রিপ্টো আদায়ের অভিযোগ
এর আগে ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে ফ্রিল্যান্সার আবু বকরকে ডিবির কর্মকর্তারা তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে মামলা ও 'ক্রসফায়ারে' হত্যার ভয় দেখিয়ে তার মোবাইল ফোন থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের বিটকয়েন স্থানান্তর করে নেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনায় আবু বকরের স্ত্রী আট পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্যদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। পরে সিএমপির অভ্যন্তরীণ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। এরপর একজন পরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন অনুমোদিত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭ অনুযায়ী ভার্চুয়াল মুদ্রা কোনো ধরনের বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন নিষ্পত্তি বা বিনিয়োগের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত নয়।
