‘ভেঙে যাবে’ যুক্তরাজ্য: স্বাধীনতা চুক্তিতে সই করলেন স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতারা
যুক্তরাজ্যের বিভক্তির দাবিতে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী ফার্স্ট মিনিস্টাররা আনুষ্ঠানিকভাবে একজোট হওয়ায় নিজের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন অ্যান্ডি বার্নহাম।
এই চরমপত্রটি (আলটিমেটাম) বার্নহাম এবং তার ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এজেন্ডার জন্য এক বড় ধাক্কা। তার এই নীতি তিনটি দেশে স্বশাসনের দাবিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে, যেখানে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশেই স্বাধীনতা-কামী ফার্স্ট মিনিস্টাররা নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সোমবার সকালে কার্ডিফে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টাররা—এসএনপি নেতা জন সুইনি, প্লেইড কাইম্রু নেতা রুন আপ ইওরওয়ার্থ এবং সিন ফেইন-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মিশেল ও'নিল—একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই তিন নেতা ঘোষণা দেন, জনাব বার্নহামই হবেন যুক্তরাজ্যে শেষ প্রধানমন্ত্রী। তিন ফার্স্ট মিনিস্টারের মধ্যকার এই যৌথ চুক্তিতে বলা হয়েছে, 'ওয়েস্টমিনস্টারের সময় ফুরিয়ে আসছে' এবং ঘোষণা করা হয়েছে, 'সাংবিধানিক পরিবর্তন আসছে'। এর মাধ্যমে স্বাধীনতার গণভোটের অনুমতি দেওয়ার জন্য ডাউনিং স্ট্রিটের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করা হলো।
স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জনাব সুইনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অবশ্যই একটি স্বাধীনতা গণভোট আয়োজন করতে হবে। তিনি দাবি করেন, আবারও ভোটগ্রহণ হলে স্কটল্যান্ডের জনগণ ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষেই রায় দেবে। তিনি ঘোষণা করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বার্নহামই হবেন সমগ্র যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বদানকারী চূড়ান্ত প্রধানমন্ত্রী। কারণ স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্য সরকারের কাছ থেকে কেবল "বাধার" মুখেই পড়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এসএনপি নেতা বলেন, 'স্কটল্যান্ডের মানুষকে যদি গণভোটে স্বাধীনতার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তারা সেই পথই বেছে নেবে। কারণ জনমত জরিপের সব তথ্য-উপাত্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এটিই স্কটল্যান্ডের মানুষের পছন্দ।' এই দলীয় নেতারা নিজ নিজ সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং স্ব-স্ব দলীয় প্রধান হিসেবে বৈঠকে মিলিত হয়ে অর্থনীতি, জ্বালানি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে যৌথ অংশীদারিত্বের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন।
আইরিশ আইরিশ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও সিন ফেইন প্রেসিডেন্ট মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডের সাথে একাত্ম হয়ে দলটি সরকারকে 'সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রস্তুতি নেওয়া, পরিকল্পনা করা এবং তা সহজতর করার' আহ্বান জানিয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, 'এই দ্বীপজুড়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরো অঞ্চলজুড়ে মানুষ এমন সব প্রথম মন্ত্রী পাচ্ছে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডে, যারা প্রত্যেকেই যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীনতার পক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।'
এতে আরও বলা হয়, 'পুরো অঞ্চল এবং বিশ্বজুড়ে যারা দেখছেন, তাদের জন্য এর চেয়ে স্পষ্ট সংকেত আর হতে পারে না যে ওয়েস্টমিনস্টারের সময় শেষ হয়ে আসছে। আমরা বিশ্বাস করি এর চেয়েও ভালো একটি পথ আছে: সমান মর্যাদায় জাতিগুলো একসাথে কাজ করবে, চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করবে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সাধারণ স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। আমাদের আন্দোলনের পেছনে জনসমর্থন রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি সাংবিধানিক পরিবর্তন আসছেই।'
'তাই আমরা আমাদের দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতে এবং বাস্তবিক ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে একসাথে কাজ করলে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।' নেতারা আরও বলেন, 'আমাদের জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। কোনো ওয়েস্টমিনস্টার সরকারের এই অধিকার নেই যে তারা গণতন্ত্রকে আটকে দেবে কিংবা জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করবে—এই মূলনীতিকে ক্ষুণ্ণ করবে।
তাদের মতে,'আমরা স্বীকার করি যে আমাদের দলগুলোর বিভিন্ন সাংবিধানিক অবস্থান রয়েছে এবং প্রতিটি জাতি তার নিজস্ব উপায়ে এবং নিজস্ব সময়ে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।' গ্রীষ্মের আগে স্যার কিয়ার স্টারমারের কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ওয়েস্টমিনস্টার থেকে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণকে জনাব বার্নহাম তার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার করে তুলেছিলেন, যার মধ্যে একটি পর্যটন কর চালু করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে ডাউনিং স্ট্রিট সোমবার এই চুক্তির তীব্র প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, জনাব বার্নহাম "সাংবিধানিক বিতর্কে" সময় নষ্ট করার চেয়ে সারা দেশের পরিবারগুলোর জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট কমানোর ওপর বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি মুখপাত্র বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্যের চারটি জাতিতেই পরিবর্তন আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তিনি এই ইউনিয়নে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। যুক্তরাজ্য তখনই সেরা অবস্থানে থাকে যখন মানুষ বিভাজনের পরিবর্তে আমাদের ভাগ করে নেওয়া মূল্যবোধ ও সমস্যা সমাধানের জন্য একসাথে এগিয়ে আসে। প্রধানমন্ত্রী সাংবিধানিক বিতর্ক বা নতুন গণভোটে জড়ানোর চেয়ে পারিবারিক অর্থায়নের ওপর চাপ কমানো এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ চালিয়ে যাবেন।'
এদিকে সিন ফেইনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মিস ও'নিল বলেছেন, 'আইরিশ ঐক্যের সমর্থনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য প্রমাণ করে যে এই বিতর্কটি বেশ জোরেশোরেই চালু রয়েছে এবং ব্রিটিশ সরকার জোয়ার থামিয়ে রাখতে পারবে না।' শনিবার ডাবলিন সফরের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করে রাজনৈতিক উদ্বেগ তৈরি করেন। এ বিষয়ে ও'নিল বলেন, 'আমি মনে করি এটি আমাদের স্পষ্ট করে দেয় যে আমাদের মানুষের জন্য এখানে আসল অর্জন কী হতে পারে তা নিয়ে ভাবনাগুলো কোন পর্যায়ে রয়েছে। আর এখানকার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো একত্রীকরণ। এটি বিভাজনের অবসান এবং একটি নতুন আয়ারল্যান্ডের নতুন সূচনা।'
এর এক সপ্তাহ আগে পার্লামেন্টে জনাব বার্নহাম ভুলবশত মন্তব্য করেছিলেন যে হলিরুডের স্কটিশ পার্লামেন্ট নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে কখন স্বাধীনতা গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
