জাপানের জমজমাট ‘রেজিগনেশন’ ব্যবসা: বসের মুখোমুখি না হয়ে চাকরি ছাড়ার সেবা দেয় যারা
কর্মক্ষেত্রে বসের মুখোমুখি হয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার মানসিক চাপ এড়াতে জাপানে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তৃতীয় পক্ষের সহায়তায় চাকরি ছাড়ার বিশেষ সেবা। কোনো ধরনের সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার এই প্রবণতা দেশটিতে এখন একটি দ্রুত বর্ধনশীল ব্যবসায় রূপ নিয়েছে।
২০ বছরের বেশি বয়সী ওয়াই. এম. নামের এক জাপানি তরুণের কথাই ধরা যাক। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর একটি আবাসন বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। তবে তার এই প্রথম চাকরিটি দ্রুতই প্রতিদিনের এক কঠিন মানসিক সহনশীলতার পরীক্ষায় পরিণত হয়। অফিসে সহকর্মীদের মধ্যে কেবল তাকেই নিয়মিত বসের চিৎকার আর ধমকের শিকার হতে হতো।
টোকিওভিত্তিক শ্রম ও মানবসম্পদ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'লিডব্রেন'-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওয়াই. এম.-এর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে সহকর্মীরা কী ভাববেন—তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত ছিলেন। ফলে তিনি নীরবে কাজ ছেড়ে দেওয়ার একটি পথ খুঁজছিলেন। একই সঙ্গে তিনি তার বাবা-মাকে কোনো ধরনের মানসিক বোঝার মধ্যে ফেলতে চাননি এবং কর্মক্ষেত্রে অপ্রীতিকর সংঘাত এড়িয়ে চলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। মূলত জাপানি চাকুরিজীবীদের মধ্যে এটি অত্যন্ত সাধারণ একটি মানসিকতা।
তাই সরাসরি উপস্থিত হয়ে বসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বদলে তিনি মুঠোফোনে একটি 'রেজিগনেশন প্রক্সি সার্ভিস' বা পদত্যাগ সহায়ক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সন্ধান শুরু করেন। এটি এমন এক তৃতীয় পক্ষ প্রতিষ্ঠান, যা নিয়োগকর্তার সঙ্গে কোনো ধরনের সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াই কর্মীকে চাকরি ছেড়ে দিতে সহায়তা করে।
জাপানে কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ না দিয়ে কর্মস্থল থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে বলা হয় 'বাক্কুরে'। আধুনিক প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্কের ক্ষেত্রে হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার যে পরিচিত ধারণা বা 'গোস্টিং', তার সঙ্গে এর বেশ মিল রয়েছে।
বহির্বিশ্বের বহু মানুষের কাছে আগাম নোটিশ না দিয়ে এভাবে কাজ ছেড়ে যাওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ক্ষতিকর কাজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে জাপানের সামাজিক শিষ্টাচারের নিজস্ব বাস্তবতায় কর্মক্ষেত্র থেকে নীরবে উধাও হয়ে যাওয়া মূলত সরাসরি সংঘাত এড়ানো এবং অন্তত বাহ্যিকভাবে হলেও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখারই একটি কৌশল।
কর্মস্থল ছাড়তে অর্থ ব্যয়
জাপানে এ ধরনের পদত্যাগ সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর চাহিদা এখন রমরমা। দেশটির এ খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি 'অ্যালবাট্রস'। প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের অপ্রীতিকর সংঘাত ছাড়াই প্রতি মাসে প্রায় ৪৫০ জন কর্মীকে চাকরি ছাড়তে সহায়তা করে থাকে।
পূর্ণকালীন চাকরিতে থাকা প্রতিটি গ্রাহকের কাছ থেকে তারা ফি হিসেবে নেয় প্রায় ১২০ ইউরো (১৩৮ দশমিক ৫ মার্কিন ডলার)। সেবাগ্রহীতাদের বেশিরভাগই সেবা ও উৎপাদন খাতের তরুণ পেশাজীবী। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই শেষ করা যায়।
অ্যালবাট্রসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইউকা হামাদা বলেন, 'শারীরিক নির্যাতন থেকে শুরু করে যৌন হয়রানি—নানা অপ্রীতিকর কারণে মানুষ তাদের হয়ে পদত্যাগের জন্য আমাদের কাছে অনুরোধ জানায়। এমন পরিস্থিতিতে কর্মীরা ভীষণ অসহায় থাকেন এবং নিজে থেকে চাকরি ছাড়ার সাহস তাদের থাকে না।'
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'শিকিগাকু'র এক জরিপ অনুযায়ী, দেশটিতে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী চাকরিজীবীদের প্রতি তিনজনের একজন কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
সব কিছুর ওপরে সম্প্রীতি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সময়েই জাপানের ঐতিহ্যবাহী করপোরেট সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল, যা মূলত 'আজীবন কর্মসংস্থান' (লাইফটাইম এমপ্লয়মেন্ট) ব্যবস্থার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। এই সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যকেই সর্বোচ্চ গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে নিয়োগকর্তা বা বসেরা পদত্যাগকে প্রায়ই ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন। আর এ কারণেই অনেক তরুণ কর্মী সরাসরি গিয়ে পদত্যাগপত্র দিতে ভয় পান।
রিকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব সোশ্যাল ডিজাইন স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক হিরোকি নাকামোরি বলেন, 'সেখানে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানোকে কেবল একটি চুক্তি শেষ করা হিসেবে দেখা হয় না। বরং মনে করা হয়, এর মাধ্যমে অন্যদের হতাশ করা হলো অথবা যে প্রত্যাশা এতদিন পূরণ করা হচ্ছিল, তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হলো।'
জাপানি সংস্কৃতি মূলত মুখোমুখি সংঘাত এড়িয়ে চলার পক্ষপাতী। তাই কোম্পানি ও তার নিজস্ব নিয়মনীতির প্রতি কর্মীরা সবসময় আনুগত্য বজায় রাখবে—এমনটাই প্রত্যাশা করা হয়।
হিতোতসুবাশি ইউনিভার্সিটি বিজনেস স্কুলের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক হিরোশি ওনো বলেন, 'যারা কর্মক্ষেত্রের সম্প্রীতি বা শৃঙ্খলা নষ্ট করে, তাদের সুনজরে দেখা হয় না। ফলে চাকরি ছাড়ার সময় কারও কারও মনে হতে পারে যে, কোনো রকম অপ্রীতিকর ঝামেলা তৈরি না করে নীরবে উধাও হয়ে যাওয়াই শ্রেয়।' তিনি আরও বলেন, 'দলবদ্ধভাবে কাজ করা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি রক্ষা করাই সেখানে শক্তির পরিচায়ক।'
সংঘাত এড়িয়ে চলার এই সাংস্কৃতিক প্রবণতা জাপানিদের মধ্যে বহু প্রাচীন ও গভীর। এমনকি সপ্তম শতাব্দীতে প্রণীত জাপানের আধুনিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে পরিচিত '১৭ দফার সংবিধান'-এও সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: 'সম্প্রীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং বিবাদ পরিহার করতে হবে।'
সৌজন্য বজায় রেখে 'গোস্টিং'
তবে কর্মক্ষেত্র থেকে কাউকে না জানিয়ে এভাবে উধাও হওয়ার কাজটিও ভদ্র ও মার্জিতভাবে করা সম্ভব। অ্যালবাট্রসের সিইও হামাদা বলেন, 'গ্রাহকরা হয়তো সরাসরি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিদায় জানাতে পারেন না কিংবা কোনো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে আমাদের সংস্থাই তাদের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানে এসব বার্তা পৌঁছে দেয়।'
এটি জাপানের কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতির চরম এক স্ববিরোধিতা। কারণ এভাবে প্রতিষ্ঠানের অগোচরে চাকরি ছাড়ার সময়ও একজন কর্মী 'মেইওয়াকু' নীতি মেনে চলতে বাধ্যবাধকতা বোধ করেন। 'মেইওয়াকু' হলো জাপানের একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা, যার মূল কথা হলো: নিজের কারণে অন্যের সমস্যা যথাসম্ভব কম করা এবং সব কিছুর ওপরে সামষ্টিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা। এমনকি কর্মস্থল থেকে নিজের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য।
হামাদা আরও বলেন, 'কোনো গ্রাহক যদি কর্মস্থল থেকে সম্পূর্ণভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নেন, তবুও আমরা তাদের অফিস ত্যাগ করার আগে নিজের ডেস্ক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রেখে আসার পরামর্শ দিই।'
