ক্ষেপণাস্ত্রের গোপন নকশা ইউক্রেনকে দেয়ার ঘোষণা, রাশিয়া বলল যুক্তরাজ্য আগুনে ঘি ঢালছে
ইউক্রেন যাতে নিজস্ব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে পারে, সে লক্ষ্যে দেশটিকে যুক্তরাজ্যে তৈরি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ডিক্লাসিফাইড (গোপনীয়তামুক্ত) নকশা ও প্রযুক্তিগত তথ্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে লন্ডন। এতে সামরিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করেছে মস্কো। এই প্রেক্ষাপটে কিয়েভ সফরে গিয়ে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে 'আপত্তিকর ও নজিরবিহীন হুমকি' দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম।
কিয়েভে দেওয়া বক্তব্যে বার্নহাম ইউক্রেনের বর্তমান সংগ্রামকে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেনের ঐতিহাসিক লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করেন। ইউক্রেনের ৩৫তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী সেন্ট সোফিয়া ক্যাথেড্রালের সামনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, "বিংশ শতাব্দীতে আমার দেশ ইউরোপের স্বাধীনতার শিখা জ্বালিয়ে রেখেছিল, আর একাবিংশ শতাব্দীতে সেই শিখা পরম মমতায় ধরে রেখেছেন আপনারা।"
তিনি দৃঢ় কণ্ঠে আরও বলেন, "আমার দেশের বিরুদ্ধে রাশিয়ার এই তীব্র ও আপত্তিকর হুমকি সত্ত্বেও ইউক্রেনের প্রতি আমাদের সর্বাত্মক সমর্থন অব্যাহত থাকবে।"
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের প্রথম বিদেশ সফরেই ইউক্রেনকে যুক্তরাজ্যে তৈরি দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ সংক্রান্ত আগে গোপন রাখা গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত তথ্য হস্তান্তর করার ঘোষণা দেন বার্নহাম।
লন্ডনের এই পদক্ষেপের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, এই ধরনের নকশা বা ব্লুপ্রিন্ট বিনিময় চলমান সংঘাতের "আগুনে ঘি ঢালবে" দেবে এবং শান্তির অভিমুখে যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তি নস্যাৎ করে দেবে।
পেসকভের এই বক্তব্যের পরপরই এক সাক্ষাৎকারে পাল্টা জবাব দিয়ে বার্নহাম বলেন, "মূল আগুনটা কে জ্বালিয়েছিল? আসল প্রশ্ন তো সেটাই, তাই নয় কি?"
কিয়েভ সফরকালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য গঠিত 'কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং'-এর অন্তর্ভুক্ত ৩৪টি দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক যৌথ কনফারেন্স কলেও অংশ নেবেন। রাশিয়ার সঙ্গে কোনো যুদ্ধবিরতি হলেও—কীভাবে ইউক্রেনের নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত রাখা যায়, সেই প্রতিশ্রুতি দানকারী দেশগুলো নিয়ে গঠিত এই আন্তর্জাতিক জোট।
এদিকে মস্কো হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, তারা ইউক্রেনের এসব ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তা গুঁড়িয়ে দেবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পেসকভ বলেন, "কিয়েভ সরকারের পক্ষে এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে ব্রিটেন। তারা পরিকল্পিত ও নিয়মিতভাবে সংঘাতের আগুনে ইন্ধন জোগাচ্ছে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রক্রিয়ায় যাতে ন্যূনতম অগ্রগতিও না হয়, সে জন্য একের পর এক চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে।"
আজ সোমবারে ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবস পালন উপলক্ষে ইউরোপের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি বার্নহামের উপস্থিতির মধ্যেই রাশিয়ার সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থা জারি রয়েছে কিয়েভে।
যুক্তরাজ্যে তৈরি 'স্টর্ম শ্যাডো/স্ক্যাল্প' ক্ষেপণাস্ত্রের উপাদান সংক্রান্ত তথ্য গোপনীয়তামুক্ত করার এই সিদ্ধান্তের ফলে ইউক্রেন ভবিষ্যতে নিজেদের প্রযুক্তিতে নিজস্ব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সক্ষম হবে, যদিও এটি বাস্তবে রূপ দিতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
নিজ বক্তব্যে বার্নহাম উল্লেখ করেন যে ইউক্রেন "১২ বছরের নগ্ন আগ্রাসন, ক্রিমিয়া দখল এবং গত সাড়ে চার বছর ধরে চলা পূর্ণ মাত্রার রুশ আক্রমণের ধকল সয়ে যাচ্ছে—যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল সেই স্বাধীনতাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া, যা উদযাপনের জন্য আমরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি।"
তিনি বলেন, "রাশিয়ার এসব পদক্ষেপ এই জাতির চলার পথ বদলে দিতে পারেনি, বরং এটি তা আরও সুনির্দিষ্ট করেছে। রাশিয়া আপনাদের ওপর যা-ই চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তার বিপরীতে আপনারা বীরদর্পে দাঁড়িয়েছেন। আর এভাবেই আপনারা এক গর্বিত, সার্বভৌম ইউরোপীয় জাতি এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রাণবন্ত গণতন্ত্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে স্থান করে নিয়েছেন।"
বার্নহাম যোগ করেন, ইউক্রেনের এই অদম্য লড়াইয়ের জন্য গোটা ইউরোপ তাদের কাছে চিরঋণী। "আমি আপনাদের এমন কিছু বলতে চাই যা হয়তো আপনারা পর্যাপ্ত পরিমাণে শোনেন না: আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। এই অবিশ্বাস্য প্রতিরোধের জন্য আপনাদের ধন্যবাদ, কারণ আপনাদের এই সাহসিকতার কারণেই আজ আমরা সবাই অধিকতর শক্তিশালী।"
