কয়েক হাজার যৌন অপরাধীকে যৌনাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দেওয়ার পরিকল্পনা ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের
যৌন অপরাধে দণ্ডিত কয়েক হাজার পুরুষ বন্দির অতিরিক্ত যৌনাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ওষুধ প্রয়োগের পরিকল্পনা করছে ইংল্যান্ড ও ওয়েলস। ২০২৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এটি পুরোদমে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন এক বিশেষজ্ঞ।
কারাগারে যৌনাকাঙ্ক্ষা নিবারক ওষুধের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করেছেন অধ্যাপক বেলিন্ডা উইন্ডার। তিনি জানান, প্রতি চারজন যৌন অপরাধীর মধ্যে প্রায় একজনকে এই চিকিৎসার আওতায় আনা হতে পারে—বর্তমান মোট বন্দির হিসাবে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫০ জন।
দ্য গার্ডিয়ানকে সরকারি সূত্র জানিয়েছে, কারাগারের তীব্র স্থানসংকট সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহামের প্রশাসন স্বেচ্ছায় যৌনাকাঙ্ক্ষা দমনকারী ওষুধের ব্যবহার বাড়াতে আগ্রহী।
তবে শিশু যৌন নিপীড়ক (পেডোফাইল) ও ধর্ষকদের মতো গুরুতর অপরাধীদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক রাসায়নিক খোজা করার (কেমিক্যাল ক্যাস্ট্রেশন) যে প্রতিশ্রুতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ দিয়েছিলেন, তা নিয়ে মন্ত্রীরা নতুন করে ভাবছেন।
বর্তমানে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ১৫ হাজার কয়েদি যৌন অপরাধের দায়ে সাজা খাটছেন। এছাড়া অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতনের সন্দেহে প্রতি মাসে ৮৫০ জনেরও বেশি পুরুষ গ্রেপ্তার হচ্ছেন।
মেডিকেশন টু ম্যানেজ প্রবলেমেটিক সেক্সুয়াল অ্যারাউজাল (এমএমপিএসএ) শীর্ষক পাইলট কর্মসূচি আগামী নভেম্বরে ১০টি থেকে বাড়িয়ে মোট ২০টি কারাগারে সম্প্রসারিত করা হবে।
এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো: যেসব অপরাধী অনাকাঙ্ক্ষিত, অবিরত ও তীব্র যৌন চিন্তা, অবিরত কামোত্তেজনা এবং অস্বাস্থ্যকর যৌন তাড়না ও যৌন আচরণে ভোগেন, তাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া। এ পরীক্ষায় বন্দিদের সারট্রালিন সিলেক্টিভ সেরোটোনিন রিউপটেক ইনহিবিটরস (এসএসআরআই) জাতীয় ওষুধ দেওয়া হতে পারে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন চিন্তা কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া দেওয়া হতে পারে অ্যান্টি-অ্যান্ড্রোজেন জাতীয় ওষুধ, যা টেস্টোস্টেরন হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে যৌনাকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দেয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি টেস্টোস্টেরনের মাত্রাকে বয়ঃসন্ধিপূর্ব শৈশবকালীন পর্যায়ে নামিয়ে আনে।
উইন্ডার জানান, পাইলট প্রকল্পটি ইতিবাচকভাবে এগোতে থাকলে আগামী ২৮ মাসের মধ্যে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের সব কারাগার এবং প্রবেশন সেবায় এই ওষুধ প্রয়োগের জন্য কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত হতে পারবে।
তিনি বলেন, 'মধ্যবর্তী ফলাফল যদি কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই আইন মন্ত্রণালয় কর্মসূচিটি সার্বিকভাবে চালুর জন্য প্রস্তুত হতে পারবে।'
উইন্ডার বলেন, যারা এই কর্মসূচির আওতায় আসবেন, ওষুধ সেবন ও পুনরায় অপরাধ না করার প্রতিশ্রুতি দিলে তাদের অবশ্যই যথাযথ চিকিৎসাগত সহায়তা দিতে হবে।
গত বছর তৎকালীন আইনমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ পার্লামেন্ট সদস্যদের (এমপি) জানিয়েছিলেন, তিনি যৌন অপরাধীদের জন্য স্বেচ্ছায় রাসায়নিক খোজাকরণ কর্মসূচি জাতীয়ভাবে চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছেন। পাশাপাশি এটি বাধ্যতামূলক করা যায় কি না, সেটিও যাচাই-বাছাই করছেন।
তবে দুজন বিশেষজ্ঞ গার্ডিয়ানকে বলেন, এই পরিকল্পনা কাজে আসবে না। যৌন অপরাধীদের ওপর প্রোজ্যাক নামক ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অন্যতম প্রধান গবেষক উইন্ডার জানান, এ বিষয়ে তার গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি বলেন, 'বাধ্যতামূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে গেলে বিশালসংখ্যক কারাবন্দির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে, যাতে বোঝা যায় কাদের এই চিকিৎসা প্রয়োজন। সেই সংখ্যাটা কিন্তু বেশ ছোট। অথচ এর জন্য যে বিপুল চিকিৎসা অবকাঠামো ও সম্পদের প্রয়োজন হবে, তার প্রভাব হবে ব্যাপক।'
তিনি আরও বলেন, এটি বাধ্যতামূলক করা হলে অপরাধীদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে এবং এর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
এই ওষুধগুলোকে তিনি 'রাসায়নিক খোজাকরণ' হিসেবে আখ্যায়িত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, 'মানুষ এ কথা বলে কারণ, যারা যৌন অপরাধ করে তাদের খোজা করে দেওয়ার ধারণাটা অনেকেরই বেশ পছন্দ। কিন্তু খোজাকরণের মতো এই ওষুধের প্রভাব স্থায়ী নয়। এটি কার্যকর রাখতে হলে ধারাবাহিকভাবে সেবন করতে হবে।'
চলতি মাসের শুরুতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ঘোষণা দেন, ধর্ষণ, গ্রুমিং (শিশু বা দুর্বল কাউকে যৌন নির্যাতনের উদ্দেশ্যে প্রলুব্ধ করা) ও শিশুদের ওপর গুরুতর যৌন নির্যাতনের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের আগাম মুক্তির কর্মসূচির বাইরে রাখা হবে। তবে চার বছরের কম সাজা ভোগ করা অন্যান্য যৌন অপরাধীরা এখনও আগাম কারামুক্তির সুযোগ পাবেন।
অন্যান্য অপরাধীদের তুলনায় যৌন অপরাধীদের মধ্যে পুনরায় অপরাধ করার হার তুলনামূলকভাবে কম। সরকারি তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ১১.৭ শতাংশ যৌন অপরাধী ফের অপরাধে জড়িয়েছেন, আর চুরির মতো অপরাধে দণ্ডিতদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৫৩.৯ শতাংশ।
কারাবন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা অধিকারকর্মীরা জাতীয়ভাবে এই কর্মসূচি চালুর আগে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। সমালোচকরা এর আগে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে টেস্টোস্টেরন হরমোন দমন করার ফলে অস্টিওপরোসিস ও হৃদ্রোগ দেখা দিতে পারে। এ বিষয়ে দৈবচয়নভিত্তিক নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা তেমন একটা না হওয়ায় পর্যাপ্ত তথ্যেরও ঘাটতি রয়েছে।
