‘এক প্রজন্মে একবার’: স্পেনে পূর্ণগ্রাস, যুক্তরাজ্যে আংশিক; বিরল সূর্যগ্রহণের সাক্ষী ইউরোপ
প্রায় ৩০ বছর পর ইউরোপের আকাশে দেখা গেল এক বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য। লাখো মানুষের চোখের সামনে ধীরে ধীরে সূর্যের মুখ ঢেকে দিল চাঁদ, যুক্তরাজ্যের মতো কোথাও দেখা দিল আংশিক গ্রহণ। আবার গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও স্পেনের কিছু অঞ্চলে নেমে এলো পূর্ণ অন্ধকার। এক প্রজন্মে একবার দেখা মেলে এমন এই সূর্যগ্রহণ ঘিরে তৈরি হয় বিস্ময় ও উচ্ছ্বাসের আবহ।
যুক্তরাজ্য থেকে যারা এই বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য দেখেছেন, তারা পেয়েছেন আংশিক সূর্যগ্রহণের অভিজ্ঞতা। ব্রিটিশ গ্রীষ্মকালীন সময় (বিএসটি) সন্ধ্যা ৭টার কিছু পর গ্রহণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তখন বেশির ভাগ মানুষ দেখেছেন, চাঁদের আড়ালে সূর্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি ঢাকা পড়ে গেছে।
মধ্য ও দক্ষিণ ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের আকাশ ছিল একেবারে পরিষ্কার। ফলে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চাঁদ যখন ধীরে ধীরে সূর্যের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন দর্শকেরা পেয়েছেন বিরল এই দৃশ্য দেখার অসাধারণ সুযোগ।
উত্তর ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে আকাশ ছিল তুলনামূলক মেঘলা। তবু দেশের বিভিন্ন বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানে ভিড় জমাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি মেঘ।
অনেকে সৌরগ্রহণ দেখার বিশেষ চশমা জোগাড় করতে পেরেছিলেন। তবে গ্রহণের আগে থেকেই এসব চোখ-সুরক্ষাকারী চশমার ব্যাপক সংকট দেখা দেয়। চশমার দোকান থেকে হার্ডওয়্যারের দোকান, এমনকি বেকারিতেও সেগুলো বিক্রি হয়ে যায়।
ইউরোপের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণস্থলে জড়ো হওয়া অসংখ্য মানুষ বিস্ময়ে কখনো হাঁ করে তাকিয়ে থেকেছেন, কখনো উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে উঠেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহীদের অনেকেই বলেছেন, এই সূর্যগ্রহণ আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে মহাবিশ্ব কতটা 'অসাধারণ'।
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের পথ শুরু হয়েছিল রাশিয়ার সাইবেরিয়ার একেবারে উত্তরের প্রান্ত থেকে, লোকালয় ও দূরবীনধারী মানুষের ভিড় থেকে বহু দূরে। এরপর সেটি ধীরে ধীরে বাঁক নিয়ে পাড়ি দেয় আর্কটিক মহাসাগর।
সন্ধ্যার শুরুতে গ্রহণটি পৌঁছায় আইসল্যান্ডে। সেখান থেকে আরও দক্ষিণে এগিয়ে এসে যুক্তরাজ্যবাসীকেও উপহার দেয় এই মহাজাগতিক বিস্ময়ের এক ঝলক। যুক্তরাজ্যে আংশিক সূর্যগ্রহণ শুরু হয় উত্তর স্কটল্যান্ডে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে তা শুরু হয় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের ঠিক আগে।
শুরুতে অবশ্য তা প্রায় বোঝাই যাচ্ছিল না। কিন্তু যাদের আকাশ ছিল মেঘমুক্ত, তারা ধীরে ধীরে দেখতে পান—চাঁদ যেন একটু একটু করে সূর্যকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে এসে সূর্যের আলো আংশিক বা পুরোপুরি আটকে দেয় এবং পৃথিবীর ওপর ছায়া ফেলে। সময়ের সঙ্গে চাঁদ ধীরে ধীরে সূর্যের আরও বেশি অংশ ঢেকে ফেলে, যেন আকাশের আলো কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে যুক্তরাজ্য থেকে দেখা এই গ্রহণে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী পুরোপুরি সরলরেখায় ছিল না।
ফলে এটি ছিল আংশিক সূর্যগ্রহণ। যুক্তরাজ্যের বেশির ভাগ এলাকায় চাঁদ সূর্যের প্রায় ৯০ শতাংশ ঢেকে ফেলেছিল—১৯৯৯ সালের পর দেশটির সবচেয়ে নাটকীয় সূর্যগ্রহণ। কর্নওয়ালে সূর্য ঢেকে যাওয়ার হার পৌঁছেছিল ৯৫ শতাংশে।
তবে স্পেনের কিছু অঞ্চলের মানুষ দেখেছেন আরও জাদুকরী এক দৃশ্য, সন্ধ্যায় দেখা মিলে বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের। দেশটির উত্তরাঞ্চল অতিক্রম করে যাওয়া এই মহাজাগতিক দৃশ্যের সময় মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবে যায় চারপাশ। বিস্ময়ে অভিভূত দর্শকদের কেউ কেউ চোখের সুরক্ষাচশমা খুলে ফেলেন, আবার কেউ একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকেন আকাশের দিকে।
এই বিরল দৃশ্য নির্বিঘ্নে দেখার জন্য স্পেনজুড়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। গ্রামীণ যেসব এলাকায় সূর্যগ্রহণ সবচেয়ে ভালো দেখা যাবে, সেখানেও তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ পর্যবেক্ষণস্থল।
মাদ্রিদের উত্তরে গ্রামীণ এলাকা বুইত্রাগো দে লোসোয়িয়ার দর্শকেরা আকাশ অন্ধকার হয়ে আসতেই হাততালি ও উল্লাসে ফেটে পড়েন। রাত সাড়ে ৮টার কিছু পর দিগন্তে ঝলমল করতে দেখা যায় 'বেইলির বিডস'—পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদের কিনারা ঘেঁষে দেখা দেওয়া সূর্যের আলোর ছোট ছোট উজ্জ্বল বিন্দু। তবে সেই দৃশ্য স্থায়ী হয়েছিল এক মিনিটেরও কম সময়।
চিলির বিজ্ঞানী ইয়াসমিন ক্যাট্রিকেও এই বিরল দৃশ্য দেখতে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে উত্তর-পশ্চিম স্পেনের আ কো'রুনিয়ায় গিয়েছিলেন। পূর্ণগ্রাসের সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, 'পূর্ণগ্রাসের সময় সবাই উচ্ছ্বাসে চিৎকার করছিল এবং আমরা যা দেখছিলাম, তার আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছিল। সেই অনুভূতি প্রকাশ করার মতো কোনো শব্দ নেই।' তিনি আরও বলেন, 'মহাবিশ্ব অসাধারণ।'
পৃথিবীর কোথাও না কোথাও প্রায় প্রতি ১৮ মাসে একবার পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হলেও একই জায়গা থেকে এমন দৃশ্য দেখা যায় প্রায় ৪০০ বছরে একবার। স্পেনে তাই মানুষ পেয়েছিল এক বিরল অভিজ্ঞতা। চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেললে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়, আর তার আড়াল থেকে সূর্যের উত্তপ্ত 'করোনা' ও গোলাপি রঙের গ্যাসের ছোট ছোট 'প্রমিনেন্স' দেখা যায়। দুই মিনিটেরও কম সময়ের এই দৃশ্য অনেকের কাছেই হয়ে ওঠে আজীবন মনে রাখার মতো মুহূর্ত।
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ সম্ভব হওয়াটাও এক বিস্ময়কর মহাজাগতিক কাকতাল। পৃথিবী থেকে সূর্য চাঁদের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ দূরে, আবার সূর্যের ব্যাসও চাঁদের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ বড়। ফলে আকাশে দুটিকে প্রায় একই আকারের দেখায়। চাঁদ সামান্য ছোট হলে বা পৃথিবী থেকে তার কক্ষপথ একটু দূরে হলে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা সম্ভব হতো না।
২০২৬ থেকে ২০২৮ সালকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের 'সোনালি যুগ' বলা হচ্ছে। এই সময়ে বিশ্বজুড়ে তিনটি পূর্ণগ্রাস গ্রহণ দেখা যাবে, যদিও যুক্তরাজ্য থেকে কোনোটিই দেখা যাবে না। সেখানে ২০২৭ সালে আংশিক গ্রহণে কিছু অঞ্চলে সূর্যের প্রায় ৪৫ শতাংশ ঢেকে যাবে। যদিও যুক্তরাজ্য থেকে কোনোটিই দেখা যাবে না। সেখানে ২০২৭ সালে আংশিক গ্রহণে কিছু অঞ্চলে সূর্যের প্রায় ৪৫ শতাংশ ঢেকে যাবে।
