যুক্তরাজ্য কি আবার ইইউতে ফিরতে চায়? জনমত জরিপে উঠে এল যে চিত্র
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার জরিপের তথ্য বলছে, যুক্তরাজ্য বা ব্রিটেনের অধিকাংশ নাগরিক বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে মনে করে আসছেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বা 'ব্রেক্সিট' ছিল একটি ঐতিহাসিক ভুল।
২০২৬ সালের জুনের শুরুতে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান– ইউগভ পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, এতে অংশ নেওয়া প্রাপ্তবয়স্ক উত্তরদাতাদের ৫৭ শতাংশই জানিয়েছেন—ইইউ ত্যাগের পক্ষে ভোট দেওয়াটা যুক্তরাজ্যবাসীর ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
২০২২ সালের গ্রীষ্মকাল থেকে ইউগভের পরিচালিত প্রতিটি জরিপেই ব্রেক্সিটকে ভুল মনে করা মানুষের হার ধারাবাহিকভাবে ৫০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। অবশ্য এই হার কখনো ৫৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়নি।
এর বিপরীতে, সাম্প্রতিক জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ এখনো বিশ্বাস করেন যে ইইউ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল।
এদিকে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম জানিয়েছেন, তিনি ব্রেক্সিটকে বাতিল বা উল্টে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে তিনি 'শেষ পর্যন্ত যেতে' প্রস্তুত।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী, যিনি গত এক দশকের রাজনৈতিক লক্ষ্যহীনতা ও বিভাজনের জন্য ব্রেক্সিটকে দায়ী করে এসেছেন, স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি কেবল এভাবে "ঝুলিয়ে রাখা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়"।
২০১৬ সালের জুনের ঐতিহাসিক গণভোটের পর পার হওয়া পুরো এক দশকে— ইউগভ-এর করা কোনো জরিপেই ব্রেক্সিটের পক্ষের জনসমর্থন ৫০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করতে পারেনি।
গণভোটের পরপরই ব্রেক্সিটের সমর্থনে সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ সমর্থন দেখা গিয়েছিল। তবে এরপর থেকে জনসমর্থন কেবলই তলানিতে নেমেছে। ২০২২ সালের শুরুর দিক থেকে ব্রেক্সিটের পক্ষের সমর্থন ৪০ শতাংশের নিচে অবস্থান করে, এবং চলতি ২০২৬ সালের মে মাসে তা সর্বনিম্ন ২৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকে।
২০১৬ সালের গণভোটের পর ব্রেক্সিট নিয়ে ব্রিটিশদের মনোভাব
ইউগভের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে ব্রেক্সিটের পক্ষে (ইইউ ছাড়ার পক্ষে) ভোট দেওয়া ৬৪ শতাংশ ভোটার এখনো তাদের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। তবে তাদের মধ্যকার প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৩ শতাংশ) ভোটার এখন মনে করেন যুক্তরাজ্য ইইউ ছেড়ে ভুল করেছে।
অন্যদিকে, ২০১৬ সালের গণভোটে ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেওয়া ৮৯ শতাংশ ভোটারই মনে করেন ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। আর তাদের ভোটের বিপরীতে যুক্তরাজ্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে এখন মনে করেন মাত্র ৬ শতাংশ উত্তরদাতা।
দলগত রাজনীতির নিরিখে, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ডানপন্থী- রিফর্ম ইউকে দলকে সমর্থন করা প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ মনে করেন যুক্তরাজ্য ইইউ ছেড়ে সঠিক কাজ করেছে। একইভাবে কনজারভেটিভ পার্টির সমর্থকদের ৫৬ শতাংশও ব্রেক্সিটের পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে বাম ও মধ্যপন্থী দলগুলোর সমর্থকদের মধ্যে ব্রেক্সিটের সমর্থক সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। লেবার পার্টির সমর্থকদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ, লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের ১৩ শতাংশ এবং গ্রিন পার্টির ১০ শতাংশ ব্রেক্সিটকে সমর্থন করেন।
মূলত এই তিনটি দলের সমর্থক গোষ্ঠীর সিংহভাগই ব্রেক্সিটকে ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করেন। লেবার সমর্থকদের ৭৯ শতাংশ, লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের ৮৩ শতাংশ এবং গ্রিন পার্টির ৮৫ শতাংশ অনুসারী মনে করেন– ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল।
ইইউতে ফেরার প্রশ্নে বিভক্ত জনমত
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগ দেওয়ার বিষয়ে ব্রিটিশ জনমত অতটা স্পষ্ট নয়। জরিপ পরিচালনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রশ্নটি যেভাবে উপস্থাপন করছে, তার ওপর ভিত্তি করে উত্তরদাতাদের মতামতে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে।
ইউগভের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৫৫ শতাংশ নীতিগতভাবে যুক্তরাজ্যের আবারো ইইউতে যোগ দেওয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছেন, আর এর বিপক্ষে রয়েছেন ৩৪ শতাংশ নাগরিক।
তবে যুক্তরাজ্য যখন ইইউ সদস্য ছিল, তখন যেসব বিষয়ে বিশেষ নীতিগত ছাড় বা স্বাতন্ত্র্য ভোগ করত, পুনরায় যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সেসব ছাড় না পাওয়ার শর্ত যুক্ত করা হলে—সমর্থনের হার কমে ৩৫ শতাংশে নামতে দেখা যায়। বিপরীতে এক্ষেত্রে ইউরোপীয় ব্লকে ফেরার বিরোধিতাকারীদের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ শতাংশে।
অন্যদিকে, গত মে মাসে অপিনিয়াম পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশটির মাত্র ৩৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে রাজি আছেন।
তবে সংস্থাটির জরিপে অংশ নেওয়া আরও ২১ শতাংশ নাগরিক মত প্রকাশ করেন যে, যুক্তরাজ্যের উচিত ইইউ-এর বাইরেই অবস্থান করা। তবে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থে, ইউরোপীয় ব্লকটির সাথে বর্তমানের চেয়ে আরও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিৎ বলে মনে করেন তাঁরা।
মে মাসে ইপসোস-এর পরিচালিত পৃথক আরেকটি জরিপে ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার আবেদনের বিষয়ে নতুন করে গণভোট আয়োজন করা হলে– তারা ইইউতে ফেরার পক্ষেই ভোট দেবেন। অন্যদিকে ৩৩ শতাংশ নাগরিক ইইউয়ের বাইরে থাকার পক্ষে ভোট দিতে চেয়েছেন।
তবে এই গণভোটে যারা নিশ্চিতভাবে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন, কেবল তাদের হিসাব কষলে দেখা যায়—ইইউতে যোগ দেওয়ার আবেদনের পক্ষে সমর্থন বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ শতাংশে। এর বিপরীতে ৩৭ শতাংশ বিপক্ষে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন এবং ৪ শতাংশ উত্তরদাতা কোনো মতামত দেননি।
ইপসোস তাদের জরিপের উত্তরদাতাদের বয়স ও রাজনৈতিক পছন্দের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইইউতে ফিরে যাওয়ার আবেদনের পক্ষে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা গেছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই সমর্থনের হার সর্বোচ্চ ৬৮ শতাংশ। এছাড়া ৩৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ এবং ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে ইইউতে ফেরার পক্ষে সমর্থনের হার ৩৭ শতাংশ।
রাজনৈতিক দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রিন পার্টি (৮৬ শতাংশ), লেবার পার্টি (৮৪ শতাংশ) এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের (৮০ শতাংশ) সমর্থকদের মধ্যে ইইউতে ফিরে যাওয়ার পক্ষে সবচেয়ে জোরালো সমর্থন রয়েছে। এর বিপরীতে কনজারভেটিভ পার্টি (৩৮ শতাংশ) এবং রিফর্ম ইউকে (১৭ শতাংশ) সমর্থকদের মধ্যে পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার পক্ষে সমর্থনের মাত্রা অত্যন্ত কম।
উল্লেখ্য, জরিপ পরিচালনায় ইপসোস ২০২৬ সালের ১৪ থেকে ২০ মে এর মধ্যে ১,১৩৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্রিটিশ নাগরিকের সাক্ষাৎকার নেয়; অপিনিয়াম ২০ থেকে ২২ মে এর মধ্যে ২,০৫০ জন নাগরিকের মতামত সংগ্রহ করে; এবং ইউগভ তাদের সর্বশেষ জরিপটি চলতি বছরের ২ ও ৩ জুন ২,১১৪ জন ব্রিটিশ নাগরিকের ওপর পরিচালনা করে।
