জরুরি মজুতের ডিজেল ছাড়ো, নইলে রপ্তানি বন্ধ: ফ্রান্স ও জার্মানিকে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি
বিশ্ববাজারে জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম কমাতে জার্মানি ও ফ্রান্সকে তাদের নিজস্ব জরুরি মজুত থেকে ডিজেল বাজারে ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তা না হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশ দুটিতে ডিজেল রপ্তানি বন্ধের মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। এই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত তিনটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম কমাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার কথা বিবেচনা করছেন, তখন ইউরোপের ওপর ওয়াশিংটনের এই চাপ আরও বাড়ল।
শুল্ক বিরোধ এবং সামরিক ব্যয় নিয়ে মতভেদের কারণে ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক আগে থেকেই তিক্ত হয়ে রয়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জন্য অতিরিক্ত মজুত জ্বালানি বাজারে ছাড়া একটি বড় উভয়সংকটের জন্ম দিয়েছে। কারণ ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি না হলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের চরম সংকটের জন্য পর্যাপ্ত মজুত ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে তাদের।
ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য কমিশন এবং ২৭টি সদস্য দেশের সমন্বয়ে গঠিত ইইউর এনার্জি টাস্কফোর্স শুক্রবার সকালে একটি বৈঠকে অংশ নেবে।
এর আগে ডিজেলের মজুত ছাড়ার সম্ভাব্য প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইউরোপীয় কমিশন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ড বৃহস্পতিবার একটি যৌথ ফোনালাপে আলোচনা করেছে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন দুই ইইউ কর্মকর্তা।
এদিকে জার্মানির অর্থনীতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পশ্চিমা জ্বালানি নজরদারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) এখনও জার্মানিকে তাদের মজুত ছাড়তে বলেনি। সংস্থাটির পরবর্তী বৈঠক কবে হতে পারে তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তবে জরুরি তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুত ছাড়ার পূর্বের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করায় বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানির ওপর ক্ষুব্ধ ট্রাম্প প্রশাসন।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, 'পরিশোধিত পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং ভোক্তাদের ব্যয় কমানোর জন্য আমরা যখন একাধিক পথের সন্ধান করছি, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করা ইউরোপেরই স্বার্থের পক্ষে যায়।'
ইউরোপের একটি দেশের রাজধানীতে থাকা দ্বিতীয় একটি সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ইইউকে আগামী ছয় মাসে তাদের জরুরি মজুত থেকে ১২ কোটি ব্যারেল ডিজেল ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে। ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে রুশ জ্বালানি আমদানি নিষিদ্ধ করার পর এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যাহত করার পর থেকে ইউরোপ মূলত মার্কিন জ্বালানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে বলেন, জরুরি মজুত থেকে ডিজেল বাজারে ছেড়ে ইউরোপ জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে বলে তিনি 'দৃঢ়ভাবে আশাবাদী'। তিনি বলেন, 'আমরা যখন ফসল তোলার মৌসুম এবং শীতকালীন হিটিং অয়েলের মৌসুমে প্রবেশ করছি, তখন এটি ডিজেলের মজুত সমন্বিতভাবে ছাড়ার সঠিক সময়। বাজারে এখন আরও বেশি ডিজেল নিয়ে আসার সময় এসেছে এবং সেই ডিজেল মজুত রয়েছে। আমি মনে করি শিগগিরই কোনো ইতিবাচক খবর আসছে।'
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানান, ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির সদস্যদের মধ্যে মার্চে হওয়া এক চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়ে দায়িত্ব পালন করেছে। সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বেসেন্ট লেখেন, 'আমেরিকা তার দায়িত্ব পালন করছে। আমরা আমাদের মিত্রদেরও কাজের মাধ্যমে তাদের প্রতিশ্রউতির প্রতিফলন দেখতে চাই।'
ইরান যুদ্ধ বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানির সরবরাহকে বিঘ্নিত করেছে। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার অনেক শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তারা ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যা বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ মজুত বাড়াতে চীনা শোধনাগারগুলোও অক্টোবরের জন্য জ্বালানি রপ্তানি স্থগিত করেছে বলে জানা গেছে।
এসব বিষয়ে ফ্রান্সের জ্বালানি মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে এলিসি প্রাসাদের এক কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং ট্রাম্পের সাক্ষাৎ হলেও সেখানে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিশোধিত পণ্যের বৈশ্বিক প্রাপ্যতা মোকাবিলার পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির সঙ্গে সমন্বয় করে মজুত ছাড়ার বিষয়ে আলোচনার জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ নেতাদের একটি ভিডিও সম্মেলন আহ্বান করবেন প্রেসিডেন্ট মাখোঁ।
