ধানমন্ডি লেককে নতুন রূপ দিতে ৭৫ কোটি টাকার সংস্কার পরিকল্পনা
বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা, অবকাঠামোর অবনতি ও পরিবেশগত ক্ষতির প্রভাব পড়েছে রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র ধানমন্ডি লেকে। এবার লেকটি পুনরুদ্ধার, আশপাশের পরিবেশ উন্নয়ন এবং নতুন বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের স্থান তৈরিতে ৭৫ কোটি টাকার একটি সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
মোট বরাদ্দের মধ্যে ধানমন্ডি লেক সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হবে ৫০ কোটি টাকা। আর নতুন সাংস্কৃতিক স্থাপনা 'নজরুল সরোবর', যা 'বিদ্রোহী চত্বর' নামেও পরিচিত হবে, নির্মাণে ব্যয় হবে ২৫ কোটি টাকা।
ধানমন্ডি লেকের মোট আয়তন প্রায় ৮৬ একর, এর মধ্যে প্রায় ৫৫ একর জলাশয়। পুরোনো পাণ্ডু নদীর অবশিষ্ট জলাভূমিকে কেন্দ্র করে ১৯৬০-এর দশকে এটি গড়ে তোলা হয়। সময়ের সঙ্গে এটি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সবুজ এলাকা ও বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে লেক ও এর আশপাশে জলাবদ্ধতা এবং পুরোনো অবকাঠামোর সমস্যা রয়েছে। হালকা বৃষ্টিতেও লেকের কিছু অংশ ও পাশের রবীন্দ্র সরোবর এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বলছে, প্রস্তাবিত সংস্কার প্রকল্পের মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি লেকটিকে আরও নিরাপদ, সবুজ ও আকর্ষণীয় করে তোলা হবে।
সংস্কারকাজের আওতায় লেকের পাড় সুরক্ষা, ঢাল স্থিতিশীল করা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং হাঁটার পথ সংস্কার করা হবে। পাশাপাশি আলোকসজ্জা, সীমানাবেষ্টনী ও নিরাপত্তা রেলিং মেরামত ও উন্নয়ন করা হবে।
পরিকল্পনায় তিনটি ভাসমান ডেক, কিয়স্ক, আধুনিক জিম, লাইব্রেরি ও প্রদর্শনী গ্যালারি, ক্যাফেটেরিয়া, অ্যাম্ফিথিয়েটার, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, উন্মুক্ত ব্যায়ামের জায়গা এবং পার্কিং সুবিধা রাখার কথা রয়েছে।
লেকের আশপাশের গাছের পরিচর্যা ও চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত 'ট্রি হাসপাতাল' স্থাপনেরও পরিকল্পনা করেছে সিটি করপোরেশন। এছাড়া নিরাপদ খাবার পানির ব্যবস্থা, আধুনিক নির্দেশনামূলক সাইন ও পথনির্দেশ ব্যবস্থা, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং এনাউন্সমেন্ট সিস্টেম বা গণঘোষণা ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের অংশ হিসেবে আনুমানিক ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে 'নজরুল সরোবর' নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ধানমন্ডির ১৩/এ ও ৮/এ সড়কের পাশে, কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের ঠিক বিপরীতে ৫০ দশমিক ৯৬৭ কাঠা জমিতে এ সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলা হবে।
প্রস্তাবিত এ স্থাপনায় নজরুলসংগীত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা আয়োজনের জন্য উন্মুক্ত অ্যাম্ফিথিয়েটার থাকবে। শিল্পীদের জন্য থাকবে গ্রিনরুমও।
এ ছাড়া কবি কাজী নজরুল ইসলামের পছন্দের কিছু খাবার পরিবেশন করবে—এমন একটি রেস্তোরাঁ, জনসাধারণের জন্য শৌচাগার এবং তার জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে তথ্যফলক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব তথ্যফলকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও তুলে ধরা হবে।
নজরুলের সাহিত্য ও বিদ্রোহী চেতনাকে কেন্দ্র করে একটি বুক কর্নার, নগর বন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য একটি প্রধান প্লাজা গড়ে তোলা হবে। লেকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের জন্য থাকবে একটি ঘাট। পাশাপাশি পথচারীদের চলাচল সহজ করতে আলাদা হাঁটার পথ নির্মাণ করা হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এ স্থাপনার লক্ষ্য নজরুলের সাহিত্য নিয়ে জনসাধারণের আগ্রহ পুনরুজ্জীবিত করা এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য একটি উপযোগী পরিসর তৈরি করা। কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের কাছাকাছি হওয়ায় কবির সাহিত্যকর্ম প্রচারেও এটি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন তারা।
ঢাকা দক্ষিণের অঞ্চল-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) এবং প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জয় টিবিএসকে বলেন, লেকের তলদেশ পরিষ্কারের আগে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, পরীক্ষামূলক এ কার্যক্রম শেষ হতে প্রায় ৭০ দিন লাগতে পারে। লেকের তলদেশ পরিষ্কারের পর ধানমন্ডি লেক সংস্কার ও নজরুল সরোবর প্রকল্প একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিজস্ব অর্থায়নে ৭৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।
নতুন সাংস্কৃতিক ভেন্যুর প্রয়োজন নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞের
ধানমন্ডি লেক উন্নয়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান প্রশ্ন তুলেছেন, রবীন্দ্র সরোবরের এত কাছে আরেকটি সাংস্কৃতিক ভেন্যু নির্মাণের প্রয়োজন কতটা।
তিনি বলেন, রবীন্দ্র সরোবরে ইতোমধ্যে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় এবং উচ্চ শব্দের এসব অনুষ্ঠান ধানমন্ডির আবাসিক পরিবেশে প্রভাব ফেলছে। কাছাকাছি দুটি ভেন্যুতে অনুষ্ঠান হলে শব্দদূষণ আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, "নজরুল মঞ্চ নির্মাণ অপ্রয়োজনীয় এবং এটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়।"
তিনি আরও বলেন, উন্নয়নকাজে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহার এড়িয়ে গাছপালা, খোলা জায়গা এবং প্রকৃতিবান্ধব ল্যান্ডস্কেপিংকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্থানীয় বাসিন্দা, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা উচিত। তা না হলে অতীতের কিছু সংস্কার প্রকল্পের মতো এ উদ্যোগেও অপ্রয়োজনীয় কাজ ও সরকারি অর্থের অপচয় হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
