ঢাকার লেকের মাছে ও পানিতে আশঙ্কাজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নগরবাসী
রাজধানীর 'ফুসফুস' ও বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ধানমণ্ডি, গুলশান ও হাতিরঝিল লেকের পানিতে উচ্চমাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক তথ্য।
গবেষণায় দেখা গেছে, এসব লেকের পানি ও তলানি তো বটেই, এমনকি সেখানে থাকা মাছের শরীরেও মিশে গেছে মারাত্মক এই দূষণ, যা সরাসরি মানবদেহে প্রবেশ করে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক জার্নাল 'হেলিয়ন'-এ প্রকাশিত 'অ্যাবানডেন্স অ্যান্ড ক্যারেক্টারিস্টিকস অব মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন মেজর আরবান লেকস অব ঢাকা, বাংলাদেশ' শীর্ষক এই গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, এই দূষণ জলজ খাদ্যশৃঙ্খল এবং শেষ পর্যন্ত জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষক ফারিহা তাহসিন মার্সি, অধ্যাপক এ.কে.এম রাশিদুল আলম এবং মো. আহিদুল আকবরের যৌথ পরিচালনায় এই গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর তিনটি প্রধান লেকের মধ্যে গুলশান লেক প্লাস্টিক বর্জ্য দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
গুলশান লেকে দূষণ সবচেয়ে বেশি
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গুলশান লেকের উপরিভাগের পানিতে প্রতি লিটারে ৩৬টি এবং তলানির কাদার প্রতি কেজিতে ৬৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষকরা এর প্রধান কারণ হিসেবে লেকটিতে মাত্রাতিরিক্ত শিল্পবর্জ্য এবং পয়োনিষ্কাশন লাইনের সরাসরি সংযোগকে দায়ী করেছেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, গুলশান ও হাতিরঝিল লেক মূলত মাইক্রোপ্লাস্টিকের 'সিঙ্ক' বা আধার হিসেবে কাজ করছে। কারণ বিপুল পরিমাণ নগর-বর্জ্য এখানে এসে জমা হলেও পানি বের হওয়ার পর্যাপ্ত পথ নেই। অন্যদিকে, আবাসিক এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় ধানমণ্ডি লেকের পানি ও তলানিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক: ধানমণ্ডি লেক সবচেয়ে ভয়াবহ
গবেষণার সবচেয়ে আতঙ্কের দিক হলো লেকের মাছের নমুনা পরীক্ষা। তেলাপিয়া, কাতলা ও শোলসহ সাতটি প্রজাতির মোট ৯০টি মাছ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ৯৩ শতাংশ মাছের শরীরেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে।
তবে, পানির তুলনায় মাছের শরীরে দূষণের ক্ষেত্রে ধানমণ্ডি লেক শীর্ষে রয়েছে। এই লেকের একটি তেলাপিয়া মাছের ভেতরে সর্বোচ্চ ১৭টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গড়ে ধানমণ্ডি লেকের প্রতিটি মাছে ৮.২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিলেছে।
বিশেষজ্ঞের সতর্কতা: 'বিনামূল্যে দিলেও এই মাছ খাবেন না'
দেশের প্রখ্যাত পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে টিবিএস-কে বলেন, 'মানুষের উচিত ঢাকার এই দূষিত লেক ও নদীর মাছ খাওয়া বন্ধ করা। কেউ যদি আপনাকে ধানমণ্ডি, গুলশান বা বুড়িগঙ্গার মাছ বিনামূল্যেও দেয়, দয়া করে তা খাবেন না। এসব জলাশয় চরম দূষিত ও বিষাক্ত।'
তিনি আরও বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ইতিমধ্যে একটি বড় পরিবেশগত বিপর্যয়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে। পলিথিন এখন সবখানে। পানির নিচে স্তরে স্তরে পলিথিন জমে আছে। এমনকি উপকূলীয় এলাকাগুলোতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
ভয়াবহতার উৎস ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
উন্নত রাসায়নিক বিশ্লেষণ (এফটিআইআর) পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষকরা মাছ ও পানিতে উচ্চ ঘনত্বের পলিথিন (এইচডিপিই), পিভিসি, পলিকার্বোনেট এবং পলিপ্রোপিলিনের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন, যা সাধারণত দুধের প্যাকেট, ডিটারজেন্ট বোতল ও গৃহস্থালি প্লাস্টিক পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, গুলশান লেকের পানির গুণমান জলজ প্রাণীর বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে এবং পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার নিচে নেমে গেছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, মাইক্রোপ্লাস্টিক যখন মাছের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে, তখন এটি মারাত্মক প্রদাহ এবং কোষের ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের কারণ হতে পারে।
প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা
গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দৈন্যদশা ফুটে উঠেছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করলেও এর অপব্যবহার থামেনি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতি মাসে ঢাকার পরিবেশে প্রায় ৮ হাজার বিলিয়ন মাইক্রো-বিডস নির্গত হচ্ছে।
ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের এই লেকগুলোকে বাঁচাতে এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে এখনই কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
