বায়ুদূষণে দেশের ছয় শহরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৪২ জনের অকালমৃত্যু হচ্ছে: গবেষণা
বাংলাদেশের ছয়টি প্রধান শহরে সূক্ষ্ম ধূলিকণা (পিএম২.৫) দূষণের কারণে বছরে আনুমানিক ৮৮ হাজার ২৪০ জনের অকালমৃত্যু হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৪২ জন প্রাণ হারাচ্ছেন।
একই সঙ্গে এ দূষণের কারণে বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিভাগটির চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত 'মর্টালিটি অ্যান্ড ইকোনমিক কস্টস অব অ্যাম্বিয়েন্ট এয়ার পলিউশন ইন সিক্স মেজর সিটিজ অব বাংলাদেশ' শীর্ষক গবেষণায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশালে বায়ুদূষণের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সাময়িকী Pollution-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার হিসাবে, ২০২১ সালে ছয় শহরে পিএম২.৫ দূষণের কারণে প্রতি লাখ জনসংখ্যায় প্রায় ২৬০ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে।
বায়ুদূষণজনিত মোট অকালমৃত্যুর মধ্যে হৃদরোগে ৩৭ হাজার ৫১৯ জন, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৮ হাজার ৩৪৪ জন এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে ৮১১ জন মারা গেছেন।
ঢাকায় অকালমৃত্যু সবচেয়ে বেশি
শহরভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি অকালমৃত্যু হয়েছে ঢাকায়। রাজধানীতে পিএম২.৫ দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৬৮ হাজার ৭০৩।
এরপর চট্টগ্রামে ১১ হাজার ২০২, রাজশাহীতে ২ হাজার ৮২৭, খুলনায় ২ হাজার ৬২৫, সিলেটে ১ হাজার ৪৮৮ এবং বরিশালে ১ হাজার ৩৯৫ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ছয় শহরেই বায়ুদূষণজনিত অকালমৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
ঢাকায় পিএম২.৫-জনিত অকালমৃত্যু প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৪৮৪ জন করে বেড়েছে। গবেষকদের মতে, এ প্রবণতা নগরাঞ্চলে বায়ুদূষণ পরিস্থিতির ক্রমাবনতি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
গবেষক দলের প্রধান ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, "আমরা প্রায়ই বায়ুদূষণকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু আমাদের গবেষণা বলছে, এর কারণে বছরে প্রায় ৮৮ হাজার অকালমৃত্যু হচ্ছে এবং দেশের জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।"
তিনি বলেন, "গবেষণার ফলাফল নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়বে।"
গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুর মানসংক্রান্ত নির্দেশিকা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বায়ুদূষণজনিত অকালমৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় একটি অংশ এড়ানো সম্ভব।
গবেষকেরা পিএম২.৫ নির্গমন কমাতে প্রমাণভিত্তিক নীতি গ্রহণ, নগরাঞ্চলে সমন্বিত বায়ুমান ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন।
পরিবেষ্টিত বায়ুদূষণ বিশ্বজুড়ে অকালমৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতির অন্যতম প্রধান পরিবেশগত ঝুঁকি। দ্রুত নগরায়ণের ফলে বাংলাদেশেও এ ঝুঁকি বাড়ছে। তবে শহরভিত্তিক স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো সীমিত।
এ প্রেক্ষাপটে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের ক্লাইমেট চেঞ্জ, এয়ার কোয়ালিটি অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছে।
