গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক দূষণমুক্ত রাখতে কঠোর হচ্ছে সরকার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী রাজধানীর গুলশান-বনানী-বারিধারা লেককে বর্জ্য ও দূষণমুক্ত রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে লেকটিকে পরিবেশবান্ধব, দৃষ্টিনন্দন ও নাগরিকবান্ধব স্থানে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ মে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবালয় সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে মঙ্গলবার (১৯ মে) বিএনপি মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লেকটিকে পরিবেশবান্ধব, নান্দনিক ও নাগরিকবান্ধব নগর এলাকায় উন্নীত করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই সভায় লেকের পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত ভারসাম্য সংরক্ষণ, সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রম জোরদার এবং লেককেন্দ্রিক আধুনিক নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা লেকের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন এবং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা, উদ্যোগ ও করণীয় বিষয়ে মতামত দেন।
গত ১০ মে অনুষ্ঠিত সভায় লেক থেকে ভাসমান বর্জ্য অপসারণ, তলদেশের পলি পরিষ্কার, পয়োনিষ্কাশনের পানি প্রবেশ বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নতুন সেতু নির্মাণ এবং আশপাশের বস্তি এলাকার পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।
এর আগে ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আরেকটি সভায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় লেকটিকে আরও পরিচ্ছন্ন ও জনবান্ধব উন্মুক্ত স্থানে রূপান্তরের লক্ষ্যে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে।
লেক সুরক্ষায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), গণপূর্ত অধিদপ্তর, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা ওয়াসা ও পুলিশকে বিভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বছরে দুইবার গুলশান লেকের পানির উপরিভাগের ভাসমান আবর্জনা পরিষ্কার, তলদেশে জমে থাকা স্লাজ ও দূষিত পলি অপসারণ এবং পয়ঃবর্জ্য প্রবাহ বন্ধে আগামী এক মাসের মধ্যে গুলশান, বনানী ও বারিধারা সোসাইটি, রাজউক, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা ওয়াসার মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রতি মাসের ১৫ ও ৩০ তারিখে কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া গুলশানে ভারতীয় হাইকমিশন অফিসসংলগ্ন মরিয়ম টাওয়ার অপসারণের বিষয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২০-তলাবিশিষ্ট ভবনটি গুলশান লেকের কোলঘেঁষে বাড্ডা-বারিধারা সংযোগ সড়ক ও বাঁশতলা এলাকায় অবস্থিত। ভবনটি ১৯৯৪ সালে নির্মিত হয়। নির্মাণের সময় থেকেই লেকের জায়গা ও জলাশয় দখলের অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গুলশান, বনানী ও বারিধারার প্রতিটি ভবনের নিচে ছয় মাসের মধ্যে সোক পিট স্থাপন নিশ্চিত করতে আগামী এক মাসের মধ্যে ভবন মালিকদের নির্দেশনা দেবে রাজউক। নির্দেশনা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
এ কার্যক্রমের অগ্রগতিও প্রতি মাসে দুই দফায় মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে।
সোক পিট (Soak Pit) হলো একটি ভূগর্ভস্থ শোষণ কূপ, যা বাড়ির ব্যবহৃত বর্জ্য পানি বা সেপটিক ট্যাংকের পরিশোধিত তরল ধীরে ধীরে মাটিতে শোষিত হতে সহায়তা করে।
গুলশান লেক এলাকায় যান চলাচল সহজ করতে নতুন বাজার থেকে গুলশান-২ লিংক রোড (ফেলানী অ্যাভিনিউ) ব্রিজ এবং গুলশান-১ থেকে বাড্ডা লিংক রোড ব্রিজ নির্মাণের জন্য আগামী তিন মাসের মধ্যে প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে রাজউককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে কড়াইল, ভাসানটেক, সাততলা ও ক্যান্টনমেন্ট বস্তি এলাকায় আধুনিক আবাসন নির্মাণে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকল্প গ্রহণের বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়। এ বিষয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
সভা শেষে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম।
দীর্ঘদিনের পয়ঃনিষ্কাশন সংকট
২০২৩ সালে বনানী, বারিধারা, নিকেতন এবং গুলশান পূর্ব ও পশ্চিম এলাকার বাসাবাড়ির পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা নিয়ে জরিপ চালায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। জরিপে ৩ হাজার ৮৩০টি বাড়ি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, এসব বাড়ির মধ্যে ২ হাজার ২৬৫টির পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ সরাসরি লেক বা ড্রেনের সঙ্গে যুক্ত, যা মোট বাড়ির প্রায় ৮৫ শতাংশ। এর ফলে লেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মশার উপদ্রবও বাড়ছে।
সে সময় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বাড়ির মালিকদের এ ধরনের সংযোগ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে জানিয়েছিলেন তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলাম।
গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, গুলশান-বনানী ও বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার অধিকাংশ পয়োবর্জ্য গুলশান লেকে ফেলা হচ্ছে। ওয়াসাকে পানি ও পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনের জন্য বিল পরিশোধ করা হলেও বর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধন করা হচ্ছে না। দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারে বর্জ্য পরিশোধনের কথা থাকলেও তা সরাসরি গুলশান লেকে গিয়ে পড়ছে।
ডিএনসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য ঢাকা ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন নালায় সংযুক্ত করার কথা। আর যেখানে এ ধরনের নালা নেই, সেখানে বাড়ির মালিকদের সেপটিক ট্যাংক স্থাপনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তবে বাস্তবে এসব নিয়ম মানা হচ্ছে না। অনেক ভবনের পয়ঃসংযোগ সরাসরি সিটি করপোরেশনের খোলা ড্রেন বা স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইনে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে বিষাক্ত তরল বর্জ্য খাল ও লেকে গিয়ে পড়ছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনে ঢাকা ওয়াসার বিদ্যমান পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক অনেক পুরোনো হওয়ায় অধিকাংশ স্থানে বর্জ্য সঠিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে না। একই সঙ্গে এসব এলাকার অনেক ভবনে সোক পিটও নেই। ফলে ভবন মালিকরা বিকল্প হিসেবে পয়ঃসংযোগ ড্রেন বা স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইনে দিয়েছেন। এর ফলে বর্জ্য সরাসরি লেক ও খালে গিয়ে পড়ছে।
